Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Acharjya Jagadish Prasanga Ed. 1st"

See other formats


আছচ্গাম্খ্য জগ্কীম্প ওভ্নঙে 


শ্ীহরিদাস মজুমদার সম্পাদিত 


১ব্ন আহ্রল্রপ 
ভাত, ১৩৪* 


প্রকাশক-স্" 
শ্রঅনস্তকুমার সেন 
অমৃত সমাজ 
নং যুরলীধর সেন লেন, 
কলিকাত। 


কলিকাত। ২*মং, ভ্রিটিশ ইত্থিয়ান দ্ীট, 
জার্ট প্রেস হইতে ীনরেজনাথ 
মুখাজ্জা! বি-এ কর্তৃক মুক্তিত । 


মৌনব্যাখ্যা-প্রকটিত-পরত্রক্মতত্বং যুবানং 
বিষ্ঠান্তেবসদৃষিগপৈরাবৃতং ব্রহ্মনিষ্টেঃ। 
আচার্যেন্্রং করকলিতচিন্ুদ্রমানন্দবূপং 
স্বাত্মারামং মুদিতবদনং দক্ষিণামুত্তিমীড়ে ॥ 


লেখকগণ--- 


শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীহরিমোহন গোস্বামী, 
৬ললিতমোহন দাস, শ্রীনরেজ্জনাথ দাস, শ্রীঅক্ষয়- 
কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীমতী মণিকুস্তল! 
সেনগুপ্তা, শ্রীঅননদাচরণ রায়, 
শ্রীহরিদাস মজুমদার 


পরিচয় 


সৌভাগ্যক্রমে বরিশালের আচার্য জগদীশের সঙ্গে আমার পরিচয় 
ঘটেছিল। তিনি আজ অমৃতলোকের অধিবাসী । তাঁর ভক্তের 
তার জীবনকথা সাধারণ্যে প্রচার কর্তে প্রয়্াপী হয়েছেন। সাধু 
মহাপুরুষদের জীবন-কথ! লোকসমাজে যত প্রচারিত হ্য়, সমাজের 
কল্যাণ-সম্ভাবনা ততই বেশী। আচাধ্যদেবের ভক্তদের এই সাধু 
প্রচেষ্টা সফলতায় ভরিয়া উঠুক । 

কুটীরাশ্রমবাসী আচার্ধ্যদেবকে দেখে পুরাণ-ভারতের খষি- 
চরিত্রের একটা মধুর স্পর্শ যেন আমার মনে পেয়েছিলাম । তবু 
আজ বারবার মনে সন্দেহ জাগচে--আমার দেখা ঠিক হয়নি__ 
আমি যা দেখেছি, তার পরে হয়ত আরও অনেক কিছুই না-দেখ 
রয়ে গেছে । 

আমাদের এক চোখের দেখা যেমন সম্পূর্ণ নয়, অভ্রাস্ত নয়, 
একার দেখাও তেমনি ভ্রান্ত ও অসম্পূর্ণ। আমার দৃষ্টি তখনই 
সম্পূর্ণ ও সত্য হয়ে ওঠে, যখন বিশ্বের সকলের দৃষ্টির সঙ্গে আমার 
দৃষ্টি মিলিত করে দেখতে পাই। চোখ আছে, দৃষ্টিশক্তিও তার 
বিলক্ষণ, তথাপি দর্শনীয্ম অনেক কিছুই যে না-দেখা রয়ে যায়, 
এ সত্য বহুবার আমি আমার রসায়নাগারে প্রত্যক্ষ করেছি। 
দেখ! এবং না-দেখ। এই ছুইকে মিলিয়ে অরূপের যে-বপ চোখের 
কাছে ধরা দেয় তারি নাম সত্যদৃষ্টি ব| দর্শন। এই দর্শন বলে 

- যাকে আমর! ন| দেখি, তাকে সত্য করে দেখা হয় না। 


(৮০ ) 


আচাধ্যদেবের যে চরিত-কথা আজ লোক শসমাজে প্রচার 
হতে চলেছে এর বিশেষত্ব--এ কোন এক ব্যক্তির লেখা নয়। 
তার ভক্তেরা তার মধুর বাণী শুনে, তার নিত্যকার জীবনের 
স্পর্শে এসে, তার সেবা করে, স্বেহ ভালবাসা পেয়ে, 
শাসন পেয়ে, তার কাছে শিক্ষা দীক্ষা লাভ করে, যিনি যে ভাবে 
দেখেছেন তিনি সেইভাবে তাঁর জীবন কথাকে একে দিয়েছেন । 
এই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টির সংযোজনায় ষে জীবন ব্যক্ত হয়ে উঠেছে 
সে জীবনে তাকে সম্পূর্ণ করে হয়ত পাওয়া যাবেনা তবু 
সেই হবে সম্পূর্ণের কাছাকাছি। মহাসাগরকে কেউ দেখেছেন, 
কেউ তার নাম শুনেছেন-_-কেউ জানেন তার জল লোন1, কেউ 
জানেন তার পারাপার নেই, কেউ জানেন তার দৃশ্ঠ মহান্‌, কেউ 
জানেন ভার বুকে রুদ্রের প্রগয়ঙ্কর নৃত্য, আবার কেউ জানেন 
তার বুকে কত মাণিক লুকো'ন রয়্েছে-এই সবার জানাজানিকে 
নিয়ে যে জানা না-জানার স্বরূপ ব্যক্ত হয়, সেই হ'ল মহাসাগর । 

আচারধ্যদেবের যে অনাড়ম্বর যোগযুক্ত জীবন সহ সহম্র 
লোকের হিত সাধন করেছে, তার জীবন-কথাও সেই হিতকেই 
অবিনশ্বর করে তুলবে । 


সায়েন্স কলেজ, কলিকাত! শ্ীপ্রফুল্পচন্দ্র রায় 
১১ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ 


ক 


সম্পাদকের নিবেদন 


হিমালয়ের নিভৃত কন্দরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করিরা সাধু 
সন্গ্যাসীর! জগতের কি উপকার করিতেছেন ?--এই প্রশ্নের উত্তরে 
স্বমী বিবেকানন্দ বলিয়াছিলেন, “মানুষ দেখে না, কি 0১091)0 
হইতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন ও বিচ্ছুরিত হইয়া জগতের কত উপকার 
করিতেছে, তেমনি এই সাধু মন্ন্যানীদের উচ্চ চিন্তাধারা জগতকে 
আলোড়িত করিতেছে, লক্ষ লক্ষ মানবের জীবন উন্নতির পথে 
অগরসর করিয়া দিতেছে ।” 


পূজাপাদ আচাধ্যদেবের জীবন নিভূতে লোকচক্ষুর অন্তরালে 
অতিবাহিত হইয়াছে, কিন্তু সহশ্র সহ নরনারী এই জীবনের 
প্রভাবে প্রভাবিত হইয়াছে, এই জীবনের আলোকে সংসার-গহনে 
পথের রেখা দেখিতে পাইয়াছে। 


যাহারা তাহার সংস্পর্শে আসিবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছেন, 
তাহার! আচাধ্যদেবকে যেমন দেখিয়াছেন, বুঝিয়াছেন ও উপলব্ধি 
করিয়াছেন তাহা লিপিবদ্ধ হইলে এই ছুরবগাহ জীবনের কিঞ্চিৎ 
আভাস পাওয়৷ যাইতে পারে। তাহার অন্তরঙ্গ ভক্তগণের মধ্যে 
অন্যন পঞ্চাশ জনের লেখ আমাদের হস্তগত হইয়াছে । সেই 
লেখার কতকগুলি “অমৃত” পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে । যাহ! 
অবশিষ্ট ছিল তাহার কয়েকটি মাত্র এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হইল । 
জীবনালেখা চিত্রিত করিবার এই অভিনব পদ্ধতি যদি পাঠককে 


( 1৭ ) 

আনন্দ দান করিতে সমর্গ হয, তাহা হইলে বাকী লেখাপ্ুলিও 
্র্থাকারে প্রকাশিত করিবার ইচ্ছা আছে। 

এই গ্রস্থ আচারধ্যদেবের জীবনচরিত নহে, জীবন চরিতের সুচী 
মান্র। বাতীয়নের মধ্য দিরা যেমন আমর! অনস্ত আকাশের আভা 
পাই, সমগ্র আকাশ দেখিতে পাই না, এই গ্রন্থে তেমনি আচ র্য- 
ধেবের মহৎ, উদ্ধার, অভ্ুলনীঘ চণিঘ়ের আভাস মাহ পাও্য। 
বাইবে | 

এই পুণ্তকের উপন্বত্ব বরিশালের “দগদীশ আশ্রমের সেবায় 
নিবেধিত্ ইইল। 


নিবেদক 
শ্রীহরিদাস মজুমদার 





আচার্য জগদীশ 





আচার্য জগদীশ প্রসঙ্গ 
জীবন প্রভাতে 


পূঙ্পাদ আচাধ্য জগদীশ মুখোপাধ্যায় ১২৬৮ সাঁলেব ১৮ই 
ভাদ্র তারিখে, খুলন। জেলার অন্তর্গত বারুইখাঁলি গ্রামে এক 
সনম্তান্ত মধ্যবিত্ত ব্রা্গণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বুহৎ একান্নবত্তী 
পবিবার, এক এক বেলার পঞ্চাশ ষাট খানির উপরে পাতা পড়িত। 
তাহার পিত। একমাত্র কত্ত ছিলেন। তাহার পিতামাতা ও 
খুল্লতাত সকলেই অত্যন্ত ভগবতভক্ত এ হিন্দুধশ্মান্থরাগী ছিলেন । 
তাহারা সকলে গ্রকৃত আদর্শ হিন্দু ব্রাহ্মণের জীবন যাপন করিতেন । 
সেকালের তুলনায় তাহার] অত্যন্ত উদার ছিলেন । তাহাদের আদরশে, 
সংপর্গে ও তত্বাবধানে, বিশেবতঃ তাহার মাতার আদর্শে, জগদীশের 
বালাজীবন গঠিত হয়। শিশুকাঁল হইতেই জগদীশের গুরুজনে ভক্তি, 
বিশেষতঃ মাতৃভাক্ত অসাধারণ ছিল। তিনি জীবনে কখনও মাতৃবাক্য 
লঙ্ঘন করেন নাই। ধশ্মান্গরক্তি লইয়াই যেন তিনি জন্মগ্রহণ 
করিয়াছিলেন । 

তিনি গ্রাস্ক্য বাঙ্গীল। বিদ্যালয়ে প্রথমে অধ্যয়ন করেন। সে সময় 
সাহিত্যেই তিনি খুব উৎকৃষ্ট ছিলেন, অঙ্কে কাচা ছিলেন। কিন্তু 
প্রবল অধ্যবসায় গুণে তিনি এই ক্রটা সংশোধন করিয়। লইতে 
পারিয়াছিলেন। এই বয়সেই তাহাতে অসাধারণ ধীশক্তি দেখা 


(২ ) 


গিয়াছিল। শিক্ষ(বিভাগের কোন উচ্চপদস্থ সাহেব পরিদর্শক বিদ্যালয়ের 
ছাঁত্রদিগকে ধান্তের নাম লিখিতে আদেশ করেন। যখন অন্যান্য 
ছাত্রবৃন্দ ছুই একটা ধান্যের নাম লিখিয়া আরও নূতন নাম স্মরণে 
আনিবার জন্য চিন্ত। করিতে ছিল, তখন জগদীশ শতাদিক ধান্ের 
নাম লিখিয়া পরিদর্শক মহোদয়কে যারপর্নাই সন্ত করিয়া কতকগুলি 
মূলাবান্‌ পুস্তক ও অন্তান্য করেকটী জিনিষ পুরস্কার লাভ করিয়া 
ছিলেন। অথচ নে সময় তিনি বাস্তবিকই ধান্তের নাম এবং 
তাহার জাতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ছিলেন । 

সেই বাঙ্গাল! বিদ্যালঘ হইতে তিনি বৃত্তি লাভ করিয়। যশোহ্‌র 
জেল! স্কুলে ভপ্তি হইয়াছিলেন। তিনি সেই সময় তাহার খুল্লতাত- 
পুত্র ৬্রীশচন্দ্রের সঙ্গে কনবায় এক বিধবা মহিলার গৃহে থাকিতেন 
ও মাসিক টাকা দিরা খাইতেন। শ্রণচন্দ্র তাহীর দুই বৎসরের 
বড় হিলেন। আজন্ম হ্ম্ধদ্‌,। নিত্যসহচর ও সহপাঠী শ্রীশচন্ত্ 
জগদীশের একসঙ্গে খাওয়া দাওয়! করিতেন ও একত্র শয়ন 
করিতেন । শ্রীশচন্রর ছোট ভাইকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। 
জগদীশ অত্যন্ত দুর্বল ও রুগ্ন ছিলেন। তাহাকে ঘন ঘন 
পাইখানায় যাইতে হইত, এইসময় শ্রীশচ্্র ভাহার জল দেওয়া, 
কাঁপড় কাচা সমস্তই করিতেন। ধাদের ঘরে ছু'ভাই থাকিতেন, 
তাহারা এত মিতব্যয়ী ছিলেন যে শ্রীশ ও জগদীশের আহারের 
অন্ন কখনও কম বই সমান বাঁ বেশী হয় নাই। শ্রীশচন্দ্র নিজে 
কম খাইয়।ও ছোট ভাইয়ের যাহাতে কম না পড়ে *্তৎবিষয়ে দুটি 
রাখিতেন। জগদীশ কিন্তু উত্তরনকালে যখন উপাজ্জনক্ষম হইয়াছিলেন 
তখন সেই বিধবা পরিবারকে যথাসাধ্য সাহাধ্য পাঁঠাইতেন। ইহা 
দেখা গিয়াছে যে জীবনে তিনি ফি কখনও কাহারও নিকট সামান্ত 


(৮ ৩ ) 


আত্র উপকার পাইয়াছেন তবে তাহাকে বহুগুণ প্রত্যর্পণ করিয়াও 
তাহার নিকট কৃতজ্ঞ থাকিতেন। 

জগদীশকে বুঝিতে হইলে তাহ।র মাতার জীবনী জান! 
অত্যাবশ্যক। তাহার মাতার আদর্শেই যেন তাহার জীবনটা 
প্রথম হইতে শেষ পধ্যন্ত চালিত হইয়াছিল! তীহার দৃঢ়সংকল্প, 
ভগবদ্ভক্তি, প্রতুাৎপন্নমতিত্ব ও সংযম লোৌকের বিস্ময় উৎপাদন 
করিত; স্বাস্থ্যের অভাবে কম্মযোগী হইতে পারেন নাই । 

যশোহর হইতে প্রবেশিক। পরীক্ষায় সম্মানসহকারে উত্তীর্ণ হইয়| 
বৃত্তি লাভকবতঃ কলিকাতায় মেট্রাপলিটান কলেজে তিনি ও শ্রীশচন্দ্র 
ভষ্তি হন। ছুই ভাই একসঙ্গে এফ,এ, পাঁশ করেন । জগদীশ বুন্তি 
লা করেন ও দুই ভাই একসঙ্গে এ কলেজে বি,এ, ক্লাশে ভগ্তি হন। 
জগদীশ সংস্কৃতি অনাস” সহ বি-এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্ত 
শ্রীচন্্র অকুতকাধ্য হ্ইয়াছিলেন। পরে তিনিও পাশ করিয়া 
জগদীশের হ্যায় বরিশালে শিক্ষকত। কায্যে নিযুক্ত হন। 
শ্রীশচন্ত্র 'ল' পাশ করিষা ব্যবসায়ে নিযুক্ত হইলে দুই ভাইকে পৃথক্‌ 
স্কানে থাকিতে হইয়াছিল। কিন্তু ছেলেবেলাকার ভালবাসার দৃঢ় 
বন্ধন শেষকাল পধ্যন্তও শিথিল হওয়ার অবসর পায় নাই। গত 
বার শেষে তিনি ইহধাম তাগ করিয়াছেন । হায়। বোধ হয় 
নিত্যসহচর জগদীশকে ছাড়িয়। থাকিতে পারিতেছিলেননা, তাই 
তাহাকে ডাকিয়া সঙ্গী করিয়া লইলেন। 

জগদীশের মাতৃ ও পিতৃবংশ উনবিংশ শতাব্দীর গ্রাম্য সামাজিক 
জীবনের তুলনায় অত্যন্ত উদার ও অনেকটা আধুনিক ভাবাপন্ 
ছিলেন। তাহার মাতা সমস্ত অতিথির, সে যতই নিম্নতরজাতি 
হউক না কেন, উচ্ছিষ্ট নিজ হাতে পরিষ্কার করিতেন এবং 


(৪ ) 


আতুর ও রুগ্ন যে কোন ব্যক্তির মলমুত্র মুক্ত করিতেন। রোগীর 
সেবা শুশ্ষা, ওষধ পথা দান, অতিথি সেবা! ও পূজার সময় দরিত্র 
প্রতিবেশীদের বস্র্দান তীহার পিতৃবংশের শ্বভাবসিদ্ধ ছিল। পিতু 
মাতৃ উভর বংশই ধশ্মান্ুরক্ত, সন্ধাআহ্িকপূৃত ছিলেন। ছেলে বয়সে 
জগদীশ ছুধ চিনি ভালবাসিতেন! একদিন অতিথিদের খাওয়াই বাব 
কালে (অন্ততঃ চারি পাচ জন অতিথি ন| হইত এমন দিনই যাইত ন) 
ঘরে বেশী চিনি না থাকায় তাহাদের গুড দেওয়। হয়। অতিথির! 
উঠিয়া! গেলে জগদীশ তাহাদিগকে চিনি না দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা 
কবিয়। জানিতে পারেন, যে তিনি চিনি ভালবাসেন ও ঘবে বেশী চিনি 
নাই বলিয়া দেওয়। হয় নাই। তখন তিনি ঘর হইতে চিনির পাত্র 
লইঘা আলিয়া এটে। পাতা ফেলিবার জায়গার “থ।, জগা, চান খা” 
“থ, জগা, চিনি খা” বলিয়। সমস্ত চিনি ঢালিয়! ফেলিয়া দিয়াছিলেন । 
এ অল্প বয়সেই তাভার নির্লোভিতা ও অতিথিমৎকীরপ্রিয়ত। 
দেখিয়া তীহার মাতা ও খল্পতাতরা আনন্দাশ্র বিসজ্জন করিতে 
লাগিলেন। 

পূর্বেই বলা হইয়াছে তাহাদের একানতুত্ত বৃহৎ পরিবার 
ছিল। তছুপরি একজন বৈদ্য কবিরাজ, একজন শিক্ষক, একজন 
গোমস্তা, সাত আট জন চাকর ও প্রত্যহ অনেকগুলি অতিথি 
খাইতেন। পাছে অকুলান হয় এজন্য পঠদ্দশ। হইতেই গ্রীক্মাবকাশে 
কিন্ব! ৬পুজার বন্ধে বাটী আঁদিলেই গোলায় কত ধান চাউল 
মক্ুত আছে তাহার খোজ করা একটা অভ্যাসে ঢীড়াইয়াছিল। 
প্রত অভাবগ্রস্ত বুঝিলে নিজেকে রিক্ত করিয়া যথাশক্তি কোন 
ব্যক্তির অভাব পরিপূরণের অভ্যাস তাহার শিশ্তকাল হুইতে মৃত্যু- 
কাল পর্যন্ত সমান ছিল। ঘরের লোক হইতে বাহিরের লোকের 


পা 
| 


0009৮094058 


পাপ 





(৫ ) 


জন্য তাহার প্রাণ যেন আরও বেশী কাদিত। গত ছুইবারের 
ভীষণ ঝড়ে তাহার দেশের বহুলোক গৃহ্শূন্য হইয়। তাহার নিকট 
প্রচর অর্থ সাহাধা লাভ করিয়াছিলেন। 

কেধল মিথ্যাকেই তিনি জগতে সবচেয়ে বেশী স্বণা করিতেন । 
অত্যন্ত দোষ করিয়াও তাহার নিকট দোষ স্বীকার করিলে মাপ পাওয়া 
যাইত। কিন্তু মিথ্যাবাদীর মাপ ছিল না। 

ছেলেখেলা হইতেই তিনি বিবাহ না করিবার সংকল্প 
কৰরির।ছিলেন। পাছে মা তাহাকে বিবাহ করিতে অন্গরোধ 
উপরোধ করেন এই ভয়ে, তিনি যে বিবাহে বীতস্পৃহ, এইভাব 
কথায় বাত্ায় দৃষ্টান্তে মাতাকে প্রায়ই জ।নাইতেন। একদিন 
বাঞ্চইখালি খাটার প্রতিবেশী কারস্থ পরিবাবে পুত্রবধূ ও শাশুড়ী 
মধ্ো ভীষণ ঝগড়া হইতেছিল। যুবক জগদীশ মাতাকে একান্তে 
ঢাকিয়। তাহ! দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, “মা, বিবাহের এই ফল” । 
খাতা এই ইঙ্গিত বুঝিয়াছিলেন এবং ভবিনাতে পুত্রের অশান্তি 
উত্পাদন ভয়ে তাহাকে কখনও বিবাহ করিতে আজ্ঞা করেন 
নাই। কারণ তিনি জানিতেন যে জগদীশ কখনও মাতৃআজ্ঞা 
লঙ্ঘন করেন না। 

জগদীশের মাতা লেখাপড়৷ জানিতেন না। কিন্তু তাহার 
নিকট এই প্রকাণ্ড পরিবারের ও অন্ত ছয় সাতটী তহবিল 
থাকিত। পৃথকৃ পৃথক্‌ সময়ে, পৃথক্‌ পৃথক্‌ ভাবে, পৃথক্‌ পৃথক্‌ 
পরিমাণ টাকা, আনা, পয়স। নেওয়া দেওয়। সত্বেও কোনবূপ তুলত্রান্তি 
হইতে দেখা যায় নাই। বেল! প্রায় দুইটার সময় যখন হবিষ্যান্ন 
গ্রহণ করিয়৷ তিনি পৈতার স্থতা কাটা বা কাথা সেলাই প্রভৃতি 
'কুধ্যে রত থাকিতেন, তখন তাহাকে মহাভারত, রামায়ণ বা পুরাণাদি 


( ৬ ) 


শুনাইতে হইত। যদি কেহ পড়িতে পড়িতে তাহার পূর্বশ্রুত 
কোন স্থানের পদ ভূল করিত বা ভাষা বদলাইয়! পড়িত তৎক্ষণাৎ 
তাহা সংশোধন করিয়া দিতেন। জগদীশ মাতার এরূপ অসাধারণ 
স্মরণশক্তির প্রত উত্তরাধিকারী হ্ইয়াছিলেন। ভগবদন্তরক্তি বাতীত 
কোন পাথিব বিষয়ে আসক্তি ন| হয়, তঙ্ঞন্ত সতত সতর্ক 
ছিলেন। দৃষ্ান্তস্বরূপ তীহার প্রিয় সেতারটাকে চিরতরে পরিত্যাগের 
কথা বলা ফাইতে পারে । 

লেখাপড়া, বৈষয়িক ও গাহন্থা কাজ কর্শ, সঙ্গীত বিছ্যা। গ্রভৃতি 
বিষয়ে তাহাব এবপ জ্ঞান ছিল যাহা! অতি অল্প লোকেরই 
থাকে। কিন্তু কখনও নিজেকে জাহির কর! দূরের কথা বরং 
যথাসাধ্য আত্মগে'পন করিয়। থাকিতেন। যতদিন তীহাব মাত| 
কাশীবাঁসিনী হন নাই, তিমি কলেজ ও স্কুলের কতক গুলি ছাত্রসহ 
রীতিমত গ্রীষ্ম ও পূজার বন্ধে বাটা আমিতেন ও দিনগুলি নিদ্দোষ 
আমোদ প্রমোদ ও ধন্মালোচনায় কাটাইয়া দিতেন। সে কয়দিন 
যেন গ্রামখানি নবজীবন লাভ করিত! হায়! সে দিন আর 
ফিরিয়। আসিবে না! প্রতিবেশীর দুঃখে সেরপ আর কাহারও 
চক্ষে জল ঝরিবেন]|। 


বন্ধ আমার 


যাহকে ৫২ বৎসর জ্বদ্য়ে ধারণ করিয়া আছি, তাহাকে বিশেষণে 
স্থশোভিত করিবার আবশ্যক নাই। ১৮৮১ সালে জগদীশ ও আমি 
11০00190116) 11756056014 17156 5০৪1 0155এ ভর্তি হই। 
ক্লাশে ১৫০ জন ছাত্র, নানাস্থান হইতে অসিয়াছে, সকলেই অপরিচিত । 
আমি মদন মিত্রের লেনে মাতুলালরে থাকি এবং এ গলিতেই এক- 
বাসায় জগদীশ এবং কতিপয় যশোরের ছাত্র থাকে । জগদীশের 
ভগ্রীপতি শীতলের সহিত আমার প্রথম আলাপ হয় এবং সেই স্থত্রে 
জগদীশের সহিত পরিচয় হয়। প্রথম পরিচযেই বুঝিতে পারি ইনি 
একটি রত্ববিশেষ । চেহারা যেরূপ সুন্দর, কথাবার্তা সেইরূপ মিষ্ট । 
অল্পদিনের মধ্যেই তাহার প্রতি এত আকুষ্ট হইলাম যে প্রতিদিন 
বৈকালে তাহার বাস।য় যাইতাম্, ন। গিষা থাকিতে পারিতাম ন1। 
ক্ুসে উভয়ে পাশাপাশি বপিতাম, কাহারও বাবধান সহা করিতে 
পারিতাম না। প্রথমে “আপনি” বলিয়া সম্বোধন হইত, শীঘ্রই 
তাহ। “তুমি'তে আসিয়! দাঁড়ায় 

7)10015 001057:£, আমাদের পাঠ্য পুস্তক চিল । তাহাতে 
1)955৮011 ও 101. 7101)11902এর অনেক কথা লেখা ছিল । আমার 
ইচ্ছা হইল *আমি জগদ্দীশের 73০09ঘ০]] হইব। একখানি ক্ষুদ্র 
01875 লিখিতে আরম্ভ করিলাম। পেন্সিলে লেখা, পড়া কঠিন, 
লেখা'ও অতি ক্ষুদ্র । হঠাৎ একদিন তাহা জগদীশের সামনে পড়ে। 
জগদীশ তাহ] কাড়িয়া লইলেন এবং সমস্ত পড়িয়া ফেরৎ দিলেন। 


(৮) 


বহুদিন হইল সেখানি হারাইয়াছি এবং তজ্জন্ত কত আক্ষেপ 
করিয়াছি। গত ৩১শে জানুয়ারী, যখন জগদীশের সহিত 
আমার শেষ সাক্ষাৎ, সেদিনও জগদীশ 701%:গর কথা উতাপন 
করিয়াছিলেন । 

জগদীশের পিতামাতার পরিচয় লই নাই, কিন্ত তাহার কনিষ্ঠ 
ইন্দুর সংবাদ লই। সে কেমন ছেলে জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন-__ 
কথাগুলি আমার স্বৃতিপটে জলন্ত অক্ষরে অঙ্কিত আছে-_“লেখাপড়ায় 
আমার চাইতেও খারাপ, স্বভাব চরিত্রে আমার অপেক্ষ। ঢের ভাল” । 
আমি শুনিয়া অবাক! যে প্রবেশিক] পরীক্ষীয় ১৫২ টাক1 মাসিক বৃত্তি 
পাইয়াছে এবং যাহাব চরিত দ্রেবোপম বলিয়। আমার ধারণ। 
হইয়াছে, মে আপনাকে এইরূপে খাটো। করিয়া বর্ণনা দ্বার। “বড় 
হবি ত ছোট হ* এই প্রবাদবাক্যের সত্যত। দেখাইয়া “দিল। 
“তৃণাদপি স্থনীচেন” এই মহাবাকোর এরূপ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আর 
দেখি নাই । 

১৮৮২ সালের গ্রীগ্মাবকাশেব সময় জগদীশ ও শ্রীশদা আমার 
বাড়ীতে কয়েক দিন অবস্থান করেন__তাহাদের নৃতন বাস! ঠিক 
না হওয়া পর্যন্ত। এ কর্দিন আমার মনে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে । 
২৪ ঘণ্ট| জগনীশের সহিত একত্রে বান! যেন হাতে স্বর্গ পাইয়া- 
ছিলাম । 

আমার কুগ্তবিহারী নামক এক সহোদর ছিল। সে তখন কলিকাতা 
নন্ম্যাল স্কুলে পড়িত। জগদীশ ১৫২ টাক। বৃত্তি পাইত,» তাহা হুইতে 
এক টাকা প্রতিমাসে কুগ্তকে জলখাবারের জন্য দিত। ২ বখ্সর পরে 
কুঞ্জ নৃশ্ম্যাল স্কুল হইতে পাশ করিয়া ৫২ টাকা মাস্ক বৃত্তি পাইয়! 
[7916 5011০01এ ভত্তি হয় এবং ২ বৎসরে 17500009 পরীক্ষা দিয় 


(৯ ) 


২০২ টাকা বৃত্তি পায়। সুতরাং এই ৪ বৎসর কুগুকে মাসিক 
সাহায্য করিবার আর আবশ্ঠক হয় নাই। তবে আদার দৃঢ় 
বিশ্বাস হইয়াছিল, জগদীশের মাসিক দাঁন হেতুই কুপ্তর এরূপ উন্নতি 
হইয়াছিল । 

সেবার ৮.4. পরীক্ষায় অনেক ফেল হয়। সেনেট হাউসে 
পরীক্ষার ফল টাঙ্গাইয়া দিয়াছে । গিষা দেখি আমাদের কলেজের 
[754 অধিকাংশই বু পেশ্িলে কাটা নীম। খুব নিকটে গিয়। 
দেখিলাম কতিপয় অখণ্ড নাম আছে এবং তাহার মধ্যে জগদীশের ও 
আমার নাম। তখনি পোষ্ট কারে বরিশালে খবর পাঠাইলাম। 
জগদীশ পাশের খবর প্রথম আমার নিকট হইতেই পায়। পরে যখন 
গেজেটে ফল বাহির হইল এবং অশ্বিনীবাবুর হাতে পড়িল, তিনি 
জগদীশের উচ্চগ্থান দেখিয়। “কেয়াবাৎ !” বলিয়াছিলেন। ইহ! 
জগদীশের মুখে শুনিয়াছি। 

১৮৮৩ সালের ফাল্ন মাসে আমার বিবাহ হয়-_চাতর। গ্রামে । 
জগদীশ ও আর কয়েকজন সহপাঠী বরধষাত্রী হইয়াছিলেন। বিবাহের 
পর আমি মামার বাড়ী ত্যাগ করি এবং জগদীশদের বাসায় প্রবেশ 
করি। ২ বৎসর একসঙ্গে থাকি । ১ম বত্সর ভিন্ন ঘরে ছিলাম, 
কারণ জগদীশের ঘরে থাকিলে তাস, পাশা, সতরঞ্চ খেলায় ব্যাঘাত 
হইত। জগদীশ এনব খেলায় যোগ দিত নাঁ। আমি কিন্তু ইহাতে 
ডুবিয়া থাকিতাম । আমাদের বাসা ছিল 73০8০ ১৮:০০এ। 
দনিকটেই 13৫11201 [1০8৮০ এবং তৎকালীন ১০০: 717680015০৪ 
'গিরীশবাবুর চৈতন্ত-লীলা! এবং প্রভাস-যজ্ঞ নৃতন অভিনয় হয়। 
বাসার সকলেই অভিনয় দেখিতে যাইতেন--জগদীশ ও আমি বাদে। 
জগদীশ যাইতেন না 00 1)20011)091 আমি যাইতামন] অর্থাভাবে। 


( ১০ ) 


যে টাকা দর্শন এবং শ্রবণ ইন্জিিয়ের তৃপ্তির জন্য ব্যয় কর! হয়, তাহা 
উদর-সেবায় ব্যয় করিলে বেশী সার্থক হয়, ইহাই আমার মত বা 
[01110011)10. 

আমাদের বাসায় এক রাধুনী ছিল, আকৃতি, প্ররুতি, বর্ণ” 
কথাবার্তা ভদ্র ব্রাহ্মণ-কন্তার মত । কাহারও কোন সন্দেহ হয় নাই । 
হঠাৎ একদিন প্রাতে সকলেই শুনিল, সে ছৃতার বংশীয়া। সেইদিন 
হইতেই নিরুদ্দেশ । সকলেই গালে হাত দিয়া বসিল। তখন গান্ধী-যুগ 
হয় নাই, আমাদের জাত গিয়াছে, কি করা যায়! মধুক্দন স্বৃতিরতু 
তখন সংস্কত কলেজের অধ্যাপক এবং আমার স্বশ্রেণী। তাঁহাকে 
আমার মামার বাড়ীতে নীলমণিবাবুর নিকট মধ্যে মধো আসিতে 
দেখিরাছিলাম এবং তাহার নিকট পরিচিত ছিলাম । জগদীশ, আমি 
এবং আরও কয়জন ছাত্র তাহার নিকট গিয়া প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা 
প্রার্থনা করি । তিনি ১০০২ টাকার ফর্দ দিলেন। আমর! অপারগ 
জানাইলে ৫০২ এবং তাহাতেও অক্ষম শুনিয়া ১০২ টাকায় নামিলেন। 
আমরা বলিলাম, টাকা কোথা পাইৰ? তখন তিনি বলিলেন-- 
১০,০০০ বার গায়ত্রী জপ ও গঙ্গান্গান। আমরা আঃ বলিয়! বাচিলাম 
এবং তাহাকে প্রণাম করিয়। আনন্দে ফিরিলাম। অতি সহজে নষ্ট- 
জাত পুনরুদ্ধত হইল, হেট মাথা আবার উঁচু হইল । 

আর এক দিনের কথা মনে পড়িতেছে। আমাদের বাসায় ৪ জন্‌ 
বর্ধমান জেলার ছাত্র, ২ জন হুগলী জেলার এবং ১৯ জন “বাঙ্গাল?” | 
একজন বর্দমেনে অন্য একজন বাঙ্গীলকে গরু উপলক্ষ করিয়া! হ্লীল তা- 
বিরুদ্ধ এক কথা বলে । তখনি "বাঙ্গাল" মহলে হৈ চৈ পড়িয়া যায়। 
এ ঘটনার কিছু পূর্বে নরিস সাহেব স্বরেন্দ্রবাবুর নামে 2016 15500 
করেন £01 00116910810? 0০0৮, বাঙ্গাল ভায়ারাও বর্ধমান 


(১১) 


জেলার ছাত্রের নামে [২1110 1550০ করিয়া বিচারের দিন স্থির 
করিয়া দেন। তেতালায় বিচার-বৈঠক বসিল। আসামী ও ফরিয়াদির 
জবানবন্দী হইল। সমস্ত শুনিয়া, জগদীশ একখানা কাগজে পেশ্সিলে 
লিখিলেন--আমার বেশ ম্মরণ আছে--76 5 20 0519 089৩ 
[770] [১1৮ 69 21001095150 2100 10000511% 00 101£156১১, এই 
লিখিয়া তিনি উঠিয়। গেলেন, উভয় পক্ষ তাহার রায় শিরোধার্্য 
করিয়া লইল। কাহারও মনে মালিন্য রহিল না। ইহাকেই বলে 
পুরুষকার এবং তাহা এত অল্প বয়সেই ব্যক্ত হইয়াছিল। 

পূর্বেই বলিয়াছি, "খান ৮৬৫এ আমি ভিন্ন ঘরে ছিলাম। 
[90/0) €০৭:এর প্রথমেই জগদীশ আমাকে বলিলেন, “এক বৎসর ত 
খেলায় কাটালে, এখন আমার ঘরে এস” । আমি দ্বিরুক্তি না করিয়া 
তখনি তাহার ঘরে আসিলাম এবং পরশমণির সংসর্গে অনেক ময়ল। 
থেন ধুইরা ফেলিলাম। বি-এ পরীক্ষায় যে উত্তীর্ণ হই তাহা কেবল 
জগদীশের সঙ্গে এক ঘরে থাকিয়া। আর এক কথা, আমাদের বাসায় 
যত বি-এ ছাত্র ছিল--১৫।১৬ জনের কম নয়__কেহই ফেল হয় নাই । 
হয় ত ইহাঁও জগদীশের প্রভাবে । 

একদিন অশ্বিনীবাবু হঠাৎ জগদীশের ঘরে উপস্থিত। পূর্বে 
তাহাকে দেখি নাই, কেবল নাম শুনিয়াছিলাম। দেবদর্শন হইয়া 
গেল। অল্পক্ষণ দেখা, কিন্তু ৪ বখসর পরে অশ্বিনীবাবু শ্রীরামপুর 
আসিলে আমকে দেখিবামাত্র বলেন “এ যে জগদীশবাবুর তিনি” | 
এই এক কথায় আমার যেরূপ আনন্দে বুক ফুলিয়াছিল, তাহা কথায় 
বলা যায় না। 

পাঠ সমাপ্তির অব্যবহিত পরেই আমরা শিক্ষকতা আরম্ভ করি-_ 
জগদীশ বরিশালে এবং আমি জন্মস্থান শ্রীরামপুরে | মধ্যে মধ্যে 


( ১২) 


জগদীশ শ্রীরামপুরে আমিতেন এবং আমাদের মিলনের স্থুযোগ হইত। 
পঙ্গা্সানের সময় আমি তাহার শুকৃনো কাপড় লইয়। যাইতাম, 
ভিজ কাপড় লইয়া আমিতাম এবং ইহাতে শ্লীাঘা বোধ করিতাম। 
এরূপ ভক্তি, শ্রদ্ধার ও ভালবাসার পাত্র আর পাই নাই। 

একবার তাহাকে আমার কন্মহুলে [00190 5০0110091এ লইয়। যাঁই। 
প্রথম শ্রেণীতে ১ ঘণ্টা পড়াইতে বলি, উদ্দেশ্ট--বালকগণ তাহার 
সংসর্গে আসিয়া উপকৃত হউক, এমন স্থবযোগ আর হবে না। ছুটীর 
পব আমাকে জিজ্ঞাসা করেন “এখানে স্বথে আছ ত?” আমি 
কহিলাম, খুব স্থখে আছি এইজন্য যে রাখালবাবু আমাব দক্ষিণ হস্ত 
এবং অকুত্রিম সুহৃৎ | বস্ততঃ জগদীশ ও রাখাল এই দুই জনকে 
বন্ধুভাবে পাইয়। নিজের জীবনকে ধন্য বলিয়া মনে করি। 

ছাত্রজীবনে জগদীশকে ০11605এ উৎসাহিত দেখি নাই। 
€,1005:01০এরৰ নাম আমি প্রথমে তাহাকে শুনাই। তিনি তখন 
প্রধান মন্ত্রী এবং ভারত-বন্ধু বলির! তাহার স্থুনাম ছিল। 92115১015 
তখন 0075০1:৮80৮০দের নেতা, তাহাকে ভারত-শক্র বলিয়। 
জগদীশের নিকট বর্ণন! করিয়/ছিলাম। এ কথ! আমার ১৮৮১ সালের 
1)1215তে লিখিয়াছিলাম। তাহার পার্খে জগদীশের মন্তব্য ছিল, 
আমার ঠিক স্মরণ আছে --:05180560170 15 01100110170), ১৭115 
10015 15 ০0712170105: 0৮০৫ 01015 1:0099/5 ৮৮119 19 10০ 8100 
110 15 1610.” ইহার অর্থ-বাহ্‌ দৃশ্যে ভূলনারে মন” অথবা 
24]1017129 215006 51)86 0705 5০0101+7, কিন্তু যদিও অগদীশকে 
প্রকাশে রাজনীতি-ক্ষেত্রে নামিতে দেখি নাই, তত্কালীন 0০7£1055এ 
তাহার খুব আগ্থ। ও শ্রদ্ধা ছিল। আমি ১৮৯২ সালে শ্রীরামপুরের 
প্রতিনিধি হ্হ্য়া 4১119107790 001215554 যাই ॥ একথা জগদীশকে ৪ 


( ১৩ ) 
লিখিলে তিনি প্রতুযত্তরে লিখেন, 4] 017) 10911% 2190 0196 


50172119000 15 191):05017600 10. 0000 09281955 ৪110 105 ড090.25 
আমার বোধ হয় ইহার কিছু পূর্বে জগদীশ বরিশালের প্রতিনিধি 
হইয়া! নাগপুর 0০08799৪এ গমন করেন। বৎসরের কথ! ঠিক মনে 
নাই। 

অনেক বৎসর পরে ১৯০৮ সালে হঠাৎ একদিন জগদীশ আসেন । 
সঙ্গে ভাগিনেয় ছিল। বোধ হয় অশ্বিনীবাবুকে ধানবাদে দেখিতে 
যাইতেছেন। আমাকে সঙ্গে লইয়া! যাইতে চাহিলেন। আমার 
পিতৃদেব তখন অত্যন্ত অন্ুস্থ থাকায় যাইতে পারিলাম না। ফিরিবার 
সময় জগদীশ আবার দেখা করিতে আমিলেন। সেইদিন আমার 
পিতৃদেবের শ্রাদ্ধ উপলক্ষে ত্রান্ষণ-ভোৌজন। জগদীশকে পাইয়। যেন 
হাতে স্বর্গ পাইলাম। এক্ূপ যোগাযোগ আশ] করি নাই এবং 
বুঝিলাম আমার ক্রিয়া সফল এবং জীবন সার্থক | 

তারপর অনেক বৎসর গত হয়, আর দেখা হয় না। কিন্তু 
উভয়ের মধ্যে পত্র লেখালেখি হইত। গত ২১শে ডিসেম্বর 
১৯৩১ সালে বেলগেছিয়। পান্নালাল বিগ্যামন্দিরের একজন শিক্ষক 
কার্যোপলক্ষে আমার বাটাীতে অসেন। কথায় কথায় জানিলাম 
তিনি জগদীশের ভূতপূর্বব ছাত্র এবং তাহার নিকট শুনিলাম জগদীশ 
স্বাস্থ্যের জন্য মধুপুরে গিয়াছেন এবং মধুপুরের নবীন-আরামে 
অবস্থান করিতেছেন। তখনি জগদীশকে পত্র লিখিলাম, এ সংবাদ 
আমাকে তিনি পূর্ধে দেন নাই কেন? সে জন্য আমি ছুঃখিত। 
উত্তর আঙিল, তিনি শীদ্রই কলিকাতা ফিরিবেন এবং বালীগঞ্জে 
্রযুক্ত হরিদাস মজুমদারের বাঁটাতে কিছুকাল অবস্থান করিবেন 
এবং আমাকে তথায় দেখ। করিতে বলিলেন । অক্পদিন পরেই তিনি 


(১৪ ) 


কলিকাতায় প্রত্যাগমন করেন এবং আমাকে সে সংবাদ দেন। 
আমি আজ যাব, কাল যাব এইব্প মনে করিতেছি, ইতিমধ্যে 
একদিন গত ৩১শে জানুয়ারী গ্রাতে জগদীশ, হরিদাসবাবু, পূর্বোক্ত 
শিক্ষক অনস্তবাবু এবং আর কয়েকজন এ অধমের বাটাতে 
মোটর-যানে উপস্থিত। আমি আহ্লাদে কাদিয়া ফেলিলাম এবং 
জগদীশকে জড়াইয়া ধরিলাম। হরিদাসবাঁবু একটু পরে চলিয়। 
গেলেন এবং বলিয়া গেলেন বৈকালে আসিবেন। জগদীশ 
আহারাদি করিয়া বিশ্রাম করেন এবং আমি ক্ষণেককাল তাহার 
পদসেবা করি । বলিলাম, আমি এ পধ্যস্ত মন্ত্র লই নাই। গৃহিণী 
এ জন্য অনেকবার আমাকে অন্থরোধ করিয়াছেন এবং তভীহাঁকে 
প্রতিবার বলিয়াছি, যদি মন্ত্র লইতে হ্য়, জগদীশের নিকট লইব | 
জগদীশকে বলিলাম, আমাকে মন্ত্র দাও। তাহাতে জগদীশ বলিলেন, 
“আমি কাহাঁকেও মন্ত্র দিই নাই, তুমি গায়ত্রী জপ কর, তাহাতেই মঙ্ত্রে 
কাধ হবে ।” ইন্দুর কথ! জিজ্ঞাস করায় শুনিলাম সে বহুপূর্বেব ইহলোক 
ত্যাগ করিয়াছে । শীতলবাবু পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, তাহাও 
শুনিলাম। বৈকালে হরিদ।সবাবু আসিয়৷ বলিলেন আমাদের ছুজনার 
একত্রে ফটো লইবেন । তখনি 12119692181)1707 ডাকা হইল এবং 
জগদীশ ও আমার একত্রে ছবি তোল। হইল। সেই ছবি প্রত্যহ 
দেখিতেছি, যেন একটা দেবমৃত্তি আমার ঘরে বিরাজমান । যতক্ষণ 
আনরা একত্রে ছিলাম, অতীতের আলোচন1 ও পুরাতন বন্ধু ও 
সমপাঠীদের সম্বন্ধে কথাবার্তী কহিতে লাগিলাম। আমার পুত্রকন্তা, 
পুত্রবধূ, গৃহিণী সকলে তাহার পদধূলি লইয়া আশীর্বাদ পাইল। আমি 
তাহার নিকট প্রতিশ্রত হইলাম, বড়দিনের সময় বরিশালে গিয়। 
তাহার আশ্রমে ১ সপ্তাহ থাকিব। এ কথা শুনিয়া হাসিয়। বলিলেন, 


আচাধ্যদেব ও শ্রীহরিমোহন গোস্বামী 





(১৫) 


“তুমি বালীগঞ্জে যাইতে পারিলে ন।, বরিশালে যাইবে?” তখন কি 
ভাবিয়ছিলাম এই আমাদের শেষ দেখ! ! 

১*ই নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকীয় তাহার পরলোকগমন 
ঘোধিত হ্য়। পরে জানিলাম এ দ্রিনই তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ 
করিয়| দিব্যধামে গমন করেন। কাগজে এ সংবাদ এত শীঘ্র কিরূপে 
ছাপা হইল, আজিও বুঝিতে পারি নাই। তিনি ত মায়া কাটাইয়া 
গিয়াছেন, কিন্ত আমার বুকের তার ছিড়য়া গিয়াছে। তাহার মতন 
লোক আর দেখিলাম ন।। এক কথায়, তান অজাতশক্র, ন্যায় 
নিষ্ঠ, সত্যবাদী এবং জিতেন্তরিয় ছিলেন। কলিতে যুধিষ্টিরের এবং 
ভীম্মের একাধারে অবিস্থিতি তাহাতেই হইয়াছিল । 


শিক্ষা-ব্রতে 


বরিশালে দুইজন সর্ধজনপূজিত মহাপুরুষ ছিলেন। একজন 
অশ্বিনীকুমীর দর্ত, অপর জন জগদীশ মুখোপাধ্যায়। ভক্তিভাজন 
অশ্বিনী বাবু নয় বৎসর পূর্ধবে ইহধাম পরিত্যাগ করিয়। চলিয়। 
গিপ়াছেন। তীহাব কর্মক্ষেত্র বহু বিস্তৃত ছিল, নানাদিকে তিনি কাজ 
করিতেন। তাহার নাম ও খ্যাতি কেবল ভারতবর্ষের সকল প্রদেশে 
নয়, সাগর পারে ইংলও প্রভৃতি দেশেও পৌছিয়াছিল। ভক্তিভাজন 
জগদীশ বাবুর কম্মক্ষেত্র সঙ্কীর্ণ, বরিশাল সহরেই একবপ আবদ্ধ ছিল। 
তিনি শিক্ষক ছিলেন এবং আদর্শ শিক্ষকরূপে সহশ্র সহস্র বালক, বৃদ্ধ, 
যুবকের ভক্তি-অর্থা প্রাঞ্ধ হইয়াছেন এবং তাহাদের হৃদয়-মন্দিরে 
প্রতিষ্ঠিত আছেন। আমীর সৌভাগ্য, তাই জীবনের উযাকাল হইতে 
উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ঘোগে যুক্ত ছিলাম, উভয়ের চরণতলে বণিয়। 
জীবনের শিক্ষা ও দীক্ষ। লাভ করিবার স্থযৌগ পাইয়াছিপাম। আর 
দুঃখ এই যে, তাহাদের মত খধিকল্প পুরুষের নিকট সাক্ষাৎ ভাবে 
জীবনের অনুপ্রাণনা পাইয়াও জীবনকে সেরূপ উন্নত করিতে পারি 
নাই। আজ এই বুদ্ধ বয়সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়, রোগ- 
শয্যায় শায়িভ থাকিয়া, এক একটি করিয়া জীবনের অপরাধ ও 
প্রত্যকায়ের কথা মনে করিতেছি এবং অশ্রপূর্ণনয়নে অনুতপ্ত 
হুদয়ে ভগবানের চরণে ক্ষমা প্রার্থন। করিতেছি । বৰিশালের স্তস্ত- 
স্বরূপ, বরিশালের গৌরব__অশ্বিনীকুমার ও জগদীশ উভয়েই 
আজ সকলকে কাদাইয়া পরলোকে চলিয়া গেলেন। বরিশাল আজ 
শৌকাচ্ছন্ন; ভগবানের বিচিত্র লীলা ! 


(& ১৭ ) 


অশ্বিনীকুমীরের বাড়ী বরিশীলেই ছিল, বাটাজোড়ে। ভক্তিভাজ্বন 
জগদীশ বাবুর বাঁড়ী খুলনা জিলার অন্তঃপাতী বাগেরহাট মহকুমার 
অন্তর্গত বারুইখালি গ্রামে। কিন্তু বরিশালে বাড়ী না হইলেও 
চিরকুমার থাকিয়। জগদীশ বাবু বরিশালকেই কর্মক্ষেত্র করিয়াছিলেন 
এবং বরিশালই তার বাড়ী ঘর ছিল। তিনি চিরকুমার, পুত্র কন্ত। 
তাহার নাই। কিন্তু শত সহশ্র পুত্র কন্তা তাহার নিকট শিক্ষা দ 
লাভ করিয়। তাহার জন্য শোক-অশ্রপাত করিতেছে । 

সে ১৮৮৫ সালের কথা । জগদীশ বাবু কলিকাতা মেট্রোপলিটান 
কলেজ হইতে বি, এ, পরীক্ষা দিয়াছেন। গেজেট আসিল, অশ্বিনী 
বাবু গেজেটে জগদীশ বাবুর নাম খুঁজিতে লাগিলেন । সেই বৎসরই 
বিশ্ববিষ্ালয়ের নৃতন নিয়ম অনুসারে পরীক্ষা হইয়াছে। তৎপূর্বে 
বি, এ, অনার্স ছিল না । এম, এ, তে অনার্স ছিল। অশ্বিনী বাবু 
পাশ লিষ্টিতে এক জগদীশ মুখোপাধ্যায় নাম দেখিলেন। তাহাতে 
প্রণান্সারে নাম দেওয়া নাউ, বর্ণমালা অন্থসারে। অশ্বিনী বাবু 
প্রথমে খুব ছুঃখিত হইলেন। তারপর অনার্স লিষ্টিতে সংস্কৃতের 
মধ্যে জগদীশ মুখোপাধ্যায় নাম দেখিয়া বলিয়! উঠ্ঠিলেন-410715 70096 
1১০ ০01 ]88015--এই আমাদের জগদীশ। বাস্তবিকও তাহাই 
হইল। জগদীশ বাবু সংস্কৃতি অনার্স প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি 
অশ্বিনী বাবুর ভূতপূর্ব ছাত্র ছিলেন। অশ্বিনী বাবু তাহাকে 
খুব স্ষেহ করিতেন। ১৮৮৪ সনের ২৭শে জুন শুক্রবার বেলা ছুই 
ঘটিকার সময় শুরিঘোষের টিনের ঘরে ( লোকে বলিত হরি ঘোষের 
গোয়াল ঘর) ব্রজমোহন বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। তখন স্বর্গীয় 
কালীগ্রসন্ন ঘোষ হেড মাষ্টার ছিলেন; তৎপূর্বের শ্রীযুক্ত বিষুচরণ 


উষ্টাচাধ্য কয়েক মাস হেড মাষ্টার হইয়াছিলেন। আমি স্কুল প্রতিষ্ঠার 
২ 


(১৮) 
দিনই গভর্ণমেণ্ট স্কুল হইতে আসিয়া ব্রজমোহন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে 
ভর্তি হই। এই সময় স্কুলের দুইজন শিক্ষক চলিয়া! যান। অশ্বিনী 
বাবুর মধ্যম ভ্রাতা কামিনী বাবু ভাল ইংরেজী পড়াইতেন, তিনি 
শিক্ষকতা ত্যাগ করেন। আর স্বর্গীয় রাখালচন্দ্র চট্টোপাধ্য।য় বি, এ, 
পরীক্ষা দিবার জন্য কলিকাতা যান। স্কুলে উচ্চ শ্রেণীর শিশ্মকের 
অভাব হইল। জগদীশ বাবু ভাল পাশ করিয়াছেন। ইচ্ছা করিলে 
এম, এ, পাশ করিয়া উচ্চ কন্মে নিধুক্ত হইয়া আথিক উন্নতি করিতে 
পারিতেন। কিন্তু তাহার অন্যরূপ উচ্চ আদর্শ ছিল। অশ্বিনী 
বাবুর সন্েহ আহ্বানে তিনি ১৮৮৫ সালে বরিশাল ব্রজমোহন 
বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হইয়। আসেন এবং আজীবন বরিশালেই 
অবস্থান করেন। পরে তিনি হেডমাষ্টার হইয়াছিলেন এবং 
কিছুদিন কলেজে তর্কশান্ত্র ও জ্যোতিষশান্্ও পড়াইয়াছিলেন। 
বরিশালে কলেজে পড়িবার আমার স্থযোগ হয় নাই । এ স্থানে কলেজ 
বসিবার পূর্বে আমি ১৮৮৮ সালে এণ্টণান্স পাশ করিয়া কলিকাতার 
আসি। জগদীশবাবু যখন বরিশালে আমিলেন, তখন আমি 
বাড়ীতে ছিলাম। বরিশালে তখন খুব কলেরার প্রকোপ। সেই 
জন্য বাবা আমার অনিচ্ছাসত্বেও আমাকে বাড়ী পাগাইলেন। বাড়ী 
ব্সিয়াই জগদীশ বাবুর কথ শুনিলাম। বরিশাল আসিয়াই স্কুলে 
যাইয়। তাহাকে দেখিলাম, অতি সাদাসিদে লোক, পোষাকের 
পারিপাট্য নাই, ধৃতি চাদর পরিয়। অনেক সময়ে স্কুলে আসিতেন। 
মধ্যে মধ্যে প্যাণ্টালুন পরিতেন, হযূত কাল প্যান্ট তাঁর উপর সাদা 
চাপকান, অন্তত দেখাইত। মধ্যে মধ্যে একটা কাল চোগাও 
থাকিত। তিনি আমাদের তৃতীয় শ্রেণীতে ইতিহাস পড়াইতে 
আরম্ভ করিলেন। প্রথমেই তাহার অধ্যাপনাতে একটু নৃতনত্ব 


[1 [1 


1111010 


1. 1] 
[4 1.1 | 
11 





(১৯ ) 


দেখিলাম। এ পর্্যস্ত জানিতাম শিক্ষকগণ পরবর্তী দিনের পড়া 
নির্দেশ করিয়া দেন, আর তদ্দিনের পাঠ জিজ্ঞাসা করেন মাত্র, তাহাতে 
আমাদের খুব অস্থবিধা হইত। আমাদের ত গৃহ শিক্ষক থাকিত না, 
পড় বুঝাইয়া দিতে পারে এমন ইংরেজী জানা লোকও সব সময়ে 
কাছে পাইতাম ন।। জগদীশ বাবু পরবর্তী দিনের জন্য যে পাঠ 
নির্দেশ করিতেন, তাহা বুঝাইয়া দিতেন, ইহাতে আমাদের সুবিধা 
হইল। কামিনী বাবু আমাঁদের ইংরেজী সাহিত্য পড়াইতেন; 
তিনি শিক্ষকতা পরিত্যাগ করিলে জগদীশ বাবুই ইংরেজী পড়াইতে 
আরম্ভ করেন। পরে স্বর্গীয় ত্রেলোক্যনাথ ভট্রাচাধ্য এম, এ, হেড 
মাষ্টার হইয়া আসিলেন। তখনও জগদীশ বাবুই আমাদের ইংরেজী 
সাহিত্য পড়াইতেন, আর কালীপ্রসন্ন বাবু গণিত পড়াইতেন। 
এ পর্য্যন্ত স্বয়ং অশ্বিনীবাবু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ইংরেজী সাহিত্য 
পড়াইতেন। ন্ব্গীয় ত্রিগুণাচরণ সেনের হেডমাষ্টার হইয়া আসার 
কথা ছিল। নানা কারণে তাহার আসা সম্ভব হইল না। ভ্রেলোক্য 
বাবুও মাত্র এক বর থাকিয়া চলিয়া গেলেন। কালীপ্রসন্নবাবু 
ইতিহাস ও গণিত প্রথম শ্রেণীতে পড়াইতেন। অশ্বিনী বাবুর 
কণ্মক্ষেত্র বহুবিস্তত। তাহাকে অধ্যাপনা লইয়া সর্বক্ষণ আবদ্ধ 
থাকিতে হয়। ইহাতে কাজ কশ্মের ক্ষতি হয়। প্রশ্ন উঠিল প্রথম ও 
দ্বিতীয় শ্রেণীতে ইংরেজী সাহিত্য কে পড়াইবেন? দৃষ্টি পড়িল 
জগদীশ বাবুর উপর। তিনি বি, এ, পাশ, সংস্কৃতি অনার্স 
তৎকালে অগ্নেকে অশ্বিনী বাবুকে বরিশাল ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় 
প্রশন্ততর ক্ষেত্রে দেশসেবা করিবীর জন্য যাইতে অন্গুরোধ করিতে 
লাগিলেন। অশ্বিনী বাবু জগদীশ বাবুকে বলিলেন, আমীর কলিকীত। 
যাওয়া উচিত কিনা তৎসন্বন্ধে পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি পরামর্শ দিয়! 


(২০ ) 
তুমি ইংরেজীতে আমাকে একখান। চিঠি লিখ । জগদীশ বাবু চিঠি 
দিলেন, তিনি বরিশাল ত্যাগের বিরুদ্ধে লিখিলেন। অশ্বিনী বাবুর 
বরিশাল ত্যাগের মত হইল না। আর এই স্থযোগে তিনি জগদীশ 
বাবুর ইংরেজী লেখা পরীক্ষা! করিয়া দেখিতে সমর্থ হইলেন এবং 
তাহাকেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ইংরেজী পড়াইবার উপযুক্ত 
লোক বলিয়া সিদ্ধান্ত করিলেন। স্থতরাং আমরা যখন দ্বিতীয় 
শ্রেণীতে ও পরে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হইলাম, জগদীশ বাবুও 
এ ছুই শ্রেণীতে ইংরেজী পড়াইবার ভার প্রাপ্ত হইলেন। স্কুলের 
মধ্যে আমাদের শ্রেণীর উপরেই কত্তৃপক্ষগণের খুব আশা ছিল। 
উচ্চ কয়েক শ্রেণীর মধ্যে আমাদের শ্রেণীতে ছাত্র সংখা বেশী 
ছিল ও ভাল ছাত্র ছিল। আমর স্কুলটিকে খুব ভাঁলবাসিতাম 
এবং কর্তৃপক্ষের নিকট খুব আবদার করিতাম, তাহারাও আমাদের 
আবদার রক্ষা করিতেন। কোন ছাত্র এই স্কুল ত্যাগ করিতে 
চাহিলে আমরা তাহাকে স্কুল ত্যাগ না করিবার জন্য অন্ররোধ 
করিতাম। একবার অশ্বিনী বাবু বরিশালে নাই, ভ্রিলোক্য বাবু 
প্রথম শ্রেণীতে ইংরেজী পড়াইতেছেন। কয়েকটি ছাত্র তার 
অধ্যাপনাতে সন্থষ্ট না হইয়া! গভর্ণমেপ্ট স্কুলে যাইতে ইচ্ছা করিল । 
আমরা বলিলাম, অশ্বিনী বাঁবু ফিরিয়া আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন| 
অনেকে আমাদের কথা শুনিলেন। অশ্বিনী বাবু আঁদিলেন। 
ব্রেলোক্যবাবুর ইংরেজী জ্ঞানে ও অধ্যাপনাতে তিনি সন্তষ্টই ছিলেন; 
তবুও তিনি আবার গ্য সাহিত্য পড়াইবার ভার গ্রহণ করিলেন । 
আমরা স্কুলের গৌরব রক্ষা করার জন্য খুব চেষ্টা করিতাম। 
আমাদের নেতিক চেষ্টা দেখিয়া লোকে ঠাট্টা করিয়া বলিত 
'ব্রজমোহনী মোরালিটি'। আমরা যাত্রা শুনিতে, থিয়েটার 


৬ ২১ ) 


দেখিতে যাইতামনা। তাস প্রতৃতি অলস ক্রীড়া পছন্দ 
করিতাম না। 

উৎসব উপলক্ষে & স্কুলগৃহ আলোকমালায় স্থসজ্জিত ন। করিয়৷ 
গরীবদের পয়সা ও বস্ত্র দান করিতাম। ইহাই বিদ্দপের প্রধান 
কারণ ছিল। আমাদের উপর কর্তৃপক্ষের যে আশা ছিল তাহা 
পূর্ণ করিতে আমর! সক্ষম হইয়াছিলাম। আমরা এ পর্য্যন্ত পরীক্ষায় 
পাশের সংখ্যায় গভর্ণমেণ্ট স্কুলকে পরাজিত করিতে পারি নাই, 
কারণ সংখ্যায় আমর! অল্প ছিলাম। কিন্তু ছাত্রবৃত্তিতে আমরা 
গভর্ণমেন্ট স্কুলকে পরাজিত করিলাম । আমাদের স্কুল হইতে একজন 
১৫২ টাকার ও দুইজন ১০২ টাঁকার বৃত্তি পাইল। গভর্ণমেন্ট স্কুল 
হইতে মাত্র একজন ১০২ টাকার বৃত্তি পাইল। পরবর্তীকালে 
ব্রজমোহন স্কুল হইতে অনেকে ২০২ টাকার বৃত্তি পাইয়াছে। এবং 
একজন একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছিল । 
ব্রজমোহন স্কুলের প্রতি রোষবশতঃ গভর্ণমেন্ট সে ছাত্রকে বৃত্তি 
দিলেন না। তবুও সে ব্রজমোহন কলেজেই আই, এ, পাঠ করিল 
ও প্রথম স্থান অধিকার করিল। সে বৎসর গভর্ণমেণ্ট তাহাকে 
বৃত্তি হইতে বঞ্চিত করিলেন। আরও অনেক ছাত্র ব্রজমোহন 
স্কুল ও কলেজ হইতে পাস করার অপরাধে বৃত্বিও পায় নাই, 
চাকুরী পায় নাই। 

জগদীশ বাবু আমাদের পড়াইতেন, আবার সঙ্গে বিশেষ 
আলাপ হইর্ল না। কোনও শিক্ষকের সঙ্গেই কোনও একটা পরীক্ষা 
দেওয়ার পূর্বে আমার আলাপ হইত না। এক দিন স্কুলে আসিয়াই 
কি কারণে যেন অশ্বিনীবাবুর ঘরে গিয়াছি, তখন পাকা বাড়ী 
হয় নাই; খড়ের আটচালা ঘর, সেখানে একখানা তক্তপোষের উপর 


(২২ ) 


জগদীশ বাবু একখানা পুস্তক হস্তে বসিয়। আছেন। তখন বোধ 
হয় তিনি অশ্থিনীবাবুর বাড়ীতে থাকিতেন। পুস্তকখানা পরে 
জানিলাম লেথত্রিজের ইজি সিলেক্সন্স। এ পুস্তকের কতকটা 
পূর্বে আমরা পড়িয়াছি। তিনি আমাকে ডাকিয়া দুইটি সত্তরের 
অর্থ করিতে দিলেন । 
[11017 0010 1070501071111100 8110. 10021) 
4, ৮1171001005 101110 0810 1100121 51001. 

ছত্র ছুটি কবি গ্রে লিখিত কোনও কবিতাতে ছিল। আমি 
উহার ব্যাখ্য। করিলাম । তদবধি তাহার সঙ্গে আমার আলাপ হইল, 
তিনি আমাকে খুব স্বেহ করিতে লাগিলেন । 

এক সময়ে আমরা একটা পুক্রিণীর তীরে বাঁস করিতাম। 
একই ঘাটে স্নান করিতাম। তাহার সঙ্গে স্বর্গীয় পণ্ডিত কামিনী- 
কান্ত বিগ্যারত্ব, স্বর্গীয় কালীপ্রসন্ন ঘোষ ও পরলোকগত গোপালচন্দ্র 
রায় থাকিতেন। জগদীশ বাবুর এক ভাই ছিল, তাঁর নাম ইন্দু। 
সেও সেখানে থাকিত, অনেক দিন হইল সে পরলোকে গিয়াছে। 
জগদীশ বাবু একদিন রাত্রিতে আমাকে নিমন্ত্রণ করেন। আমি 
রান্না হইবার একটু পূর্বেই গিয়াছিলাম। তিনি আমাকে লইয়। 
পুফষরিণীর তীরে আসিলেন। নানা কথা বলিতে লাগিলেন ॥ 
অবশেষে আমার হাত ছু*খানি ধরিয়া বলিলেন, “ললিত, এই হাতি 
হু'খানি যেন চিরদিন ঈশ্বরের দিকে থাকে ।” তর্দবধি আমার নৃতন 
অন্প্রাণনা আদিল । আমার মন. গাস্ভীর্যের ভাব ধারণ করিল । 
ধন্মলাভের আকাজ্ষ। জাগিল। 

তারপর জগদীশ বাবু আমাকে ন্মেহ করিতেন, আমিও আমার 
সকল গুপ্ত কথা, পাপের কথা তাহাকে খুলিয়া বলিতাম। তিনি 


৬ ২৩) 


সহান্থভূতির সহিত সকল শুনিতেন ও উপদেশ দিতেন। কত 
রাত্রি তাহারই সঙ্গে এক বিছানায় তাহারই শ্সেহে আলিঙ্গন পাশে 
বদ্ধ হইয়। কাটাইয়াছি। অপর দিকে সময় সময় রাগ করিতেও 
ছাড়িতেন না! প্রথম শ্রেণীতে তিনি 7২০3 [3170 পড়াইতেন। 
তাহাতে ক্রিয়ার সহিত বিভিন্ন উপসর্গ যোগে যে বিভিন্ন অর্থ হয় 
তাহা আমাদিগকে শিখিতে হইত ও তাহার দৃষ্টান্ত দিতে হইত। 
ইহা ওয়েবষ্টার ভিক্সনারী ব্যতীত অন্ত কিছুতে পাওয়৷ যাইত না। 
কাজেই আমি এবং অন্ত অনেকে উহা শিখিতে পারিতামনা। 
তজ্জন্ত ক্লাসে কত তিরস্কার করিতেন । একদিন বলিলেন, তুমি 
কথা বলিও না। আমি খুব কষ্ট পাইলাম। একদিন সন্ধ্যার পর 
অশ্বিনী বাবুর কাছে বসিয়! কি বিষয় আলোচনা করিতেছি, তখন 
হঠাৎ জগদীশ বাবু সেখানে আপদিলেন। তিনি আমাকে দেখিয়া 
বলিলেন, ললিত বুঝি রোজ এইরূপ গল্প করিতে এখানে আসে? 
অশ্বিনী বাবু বলিলেন, ললিত ত এখানে বেশী আমে না। বাস্তবিক 
আমি তার নিকট বেশী যাইতাম না। আমি চিরদিনই একটু 
উচ্চৈংস্বরে কথা বলি। একদিন এক বাসায় গিয়া ছেলেদের সঙ্গে 
কথা৷ বলিতেছি, জগদীশ বাবু সেই বাসার অপর পার্থে আপিয়াছেন, 
আমার কথ। শুনিতে পাইয়াছেন। অমনি বলিয়া উঠিলেন এ 
বুঝি 'গঞ্জে' এখানে এসেছে? 

আমি দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন ত্রাক্ধ 
সমাজের অন্তর্গত ছাত্রসমাজের সভাতে প্রতি রবিবার সকালবেলা 
যাইতাম। কীর্তনে খুব মাতিয়। উঠিতাম। এবং সময় সময় দশায় 
পড়িতাম। ইহা দেখিয়া আমার শিক্ষকগণ আমার মাথা খারাপ 
হইয়াছে মনে করিলেন এবং আমি ভাল পাশ করিয়! 


(॥ ২৪ ) 


স্কুলের গৌরব বুদ্ধি করিতে পারিব এ আশা পরিত্যাগ 
করিলেন। একদিন আমি কালীপ্রসন্ন বাবুর বাসায় যাইয়া তার 
ভাইদের সঙ্গে কথা বলিতেছি, কালীপ্রসন্ন বাবু তাহা বুঝিতে 
পারিয়াছেন। অক্পদিন পূর্বেই আমাদের একটি জ্যামিতির পরীক্ষা 
হইয়াছিন। তিনি আস্তে আস্তে কাগজখানা দেখিলেন, আমাকে 
৫০এর মধ্যে ৪৭ দ্বিলেন। তারপর আমাকে ডাকিয়া! বলিলেন, 
ভাবিয়াছিলাম তোমার মাথা খারাপ হইয়াছে, এখন তোমার 
কাগজ পরীক্ষা করিয়া! বুঝিলাম তাহা! নহে। তবে এখন কীর্তনে 
অত মাতামাতি না করিয়া ভালরূপ পড়াশুনা কর। দ্বিতীয় শ্রেণী 
হইতে যে বাধিক পরীক্ষা হইল, তাহাতে প্রত্যেক বিষয়েই বেশী 
মার্ক পাইয়া আমি প্রথম হইলাম । গ্রীম্মের ছুটিতে বাড়ী যাইবার পূর্বে 
জগদীশ বাবু ডাকিয়া বলিলেন, পরীক্ষায় ভালই করিয়াছ। কিন্তু 
এখন একটু স্থির হইয়া পড়াশুনা কর। জগদীশ বাবু যেমন খুব 
ন্সেহ করিতেন, তেমন প্রয়োজন হইলে ভ্সনাও করিতেন । 

অশ্থিনী বাবু, জগদীশ বাবু, ইহার! ছাত্রদের কেবল পড়াশুনা 
দেখিতেন তাহা নহে, ছেলেদের চরিত্র সম্দ্ধেও অনুসন্ধান করিতেন । 
আমাদের যাত্রা থিয়েটারে যাইতে নিষেধ করিতেন । টেরি কাটিতে, 
তাস খেলিতে বারণ করিতেন । সময় সময় অন্য ছাত্রগণকে সৎপথে 
আনিবার উপদেশ দ্রিতে আমাদিগকেও পাঠাইতেন। এক দিন 
নীচের শ্রেণীর একটী ছাত্র বিপথে যাইতেছে শুনিতে পাইলেন । 
তার সঙ্গে কথা বলিবার জন্ত আমাকে পাঠাইলেন। আমি তার 
বাড়ীতে গেলাম । তার পিতা আমাকে সন্দেহ করিয় প্রথমে ছেলের 
সঙ্গে দেখা করিতে দিতে সম্মত হইলেন না। পরে যখন শুনিলেন, 
তাহাকে স্থপথে আনিবার পরামর্শ দিতে জগদীশ বাবু আমাকে 


(২৫ ) 


পাঠাইয়্াছেন তখন ছেলেকে ডাকাইলেন। তার সঙ্গে আমার অনেক 
কথা হইল। পরবর্তী কালে ছেলেটা কি ভাবে চলিল তাহ! বলিতে 
পারি না। 

তৎকালে ব্রজমোহন বি্ভালয়কে লোকে ব্রাঙ্ষস্কুল বলিত। অশ্বিনী 
বাবুও ব্রাহ্ম বলিঘ়্াই পরিচিত ছিলেন। এস্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক 
ও অনেক ছাত্রও ব্রাহ্মলমাজের উপাসনা ও বক্ততাতে যাইতেন। 
তখন স্বর্গায় কালীকুমার বন্থ কালেক্টরীর হেড ক্লার্ক হইয়া বরিশাল 
আসেন। তিনি পুজ্গণ সহ খোল করতাল একতার! বাজাইয়া বাসায় 
বাসায় উষা! কীর্তন করিতেন। প্রায়ই জগদীশ বাবুকে এ উষাকীর্তনের 
দলে দেখিতে পাইতাম। কালীকুমার বাবু বরিশালে একটা 
'নববিধান সমাজ' প্রতিষ্ঠিত করেন। জগদীশ বাবু এই নব প্রতিষ্ঠিত 
নববিধান সমাজের অন্ততম আচাধ্য ছিলেন । 

আমি ১৮৮৮ সালে ব্রজমোহন স্কুল হইতে এণ্টান্স পাশ করিয়াই 
কলিকাত। পড়িতে আসি । তখনও ব্রজমোহন কলেজ হয় নাই। 
কাজেই কলেজে পড়িয়া অশ্বিনী বাবু ও জগদীশ বাবুর নিকটে দীর্ঘকাল 
অবস্থান করিবার স্যোগ আমার ঘটে নাই। তবে যখনই আমার 
কর্মস্থল নলধ| ও কলিকাতা! হইতে বাড়ী যাইতাম, তখনই অশ্বিনী বাবু 
ও জগদীশ বাবুর সঙ্গে দেখা করিয়া প্রণাম করিতাম ও তাহাদের 
চরণতলে বসিয়। ধশ্ম ও কর্মজীবনের শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণ করিতাম । 

যখন বঙ্গ বিভাগের বিরুদ্ধে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন খুব প্রবল, 
তখন “সন্ধয”নামে একটি পত্রিকা কলিকাতা হইতে প্রকাশিত হয়। 
তখন রাজনৈতিক জগতে দুই দল ছিল--নরম পন্থী ও চরম পন্থী । 
রাজনৈতিক কারণেই আমাকে কর্ম পরিত্যাগ করিতে হয় বটে, কিন্ত 
আমি তখন নরম পন্থী দলে ছিলাম । “সন্ধ্যা, কাগজ চরমপন্থী ছিল। 


€ ২৬ ) 


এ কাগজে নানারূপ ব্যঙ্গচ্ছলে একদিকে গভর্ণমেণ্টকে, অপর দিকে 
নরমপন্থীদিগকে উপহাস করা হইত। আমি এঁ কাগজের স্থর ও 
লেখার ভঙ্গী পছন্দ করিতাম না এবং এঁ কাগজ পাঠ করিতাম না) 
এক দিন বরিশালে ব্রজমোহন স্কুলের হলে বসিয়া আছি। অশ্বিনীবাবু৯ 
জগদীশ বাবু ও অন্যান্য অনেকে সেখানে আছেন। এই সময়ে 
“সন্ধ্যা” কাগজ আসিল। অশ্বিনী বাবু উচ্চৈংস্বরে “সন্ধ্যা পড়িতে 
লাগিলেন। তিনি ও অনেকে উহা শুনিয়া খুব উল্লাস প্রকাশ 
করিতে লাগিলেন। আমি কিন্তু গম্ভীর মৃত্তি ধারণ করিয়া আছি। 
অশ্বিনী বাবু বলিলেন “ললিত যে গম্ভীর হয়ে আছ, হাঁস্ছ না ?” 
আমি বলিলাম “আপনাদেরই উপদেশে অনেক কাল হইতে 
11891 190 ( অশিষ্ট কাগজ ) পড়া পরিত্যাগ করিয়াছি ।» 
জগদীশ বাবু বলিলেন 40116 15 1£1৮-_'ললিত ঠিক বলিয়াছে 1, 

অগদীশ বাবু, পূর্বেই বলিয়াছি, ত্রাঙ্গসমাজের অন্থুরক্ত ছিলেন | 
কবে কি প্রকারে তিনি অন্য ভাবাপন্ন হইলেন তাহা! আমি জানি না। 
তবে আমি যখন ব্রাহ্মধশ্মে দীক্ষিত হইতে চাই, তখন অশ্বিনী 
বাবু আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন এবং অনেক বুঝাইয়াছিলেন । 
জগদীশ বাবুরও আমার ত্রান্ধ হওয়ায় মত ছিল না। তবে তিনি 
কি কথ! বলিতে আমাকে ডাকিম়াছিলেন। আমি তাঁর নিকটে 
গেলাম। তিনি বলিলেন, আর বলিবার প্রয়োজন নাই, ০৫ 
119৬5 £০0179 ০০ 91--তুমি অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছ। আমি 
যে ত্রাঙ্গধর্শে দীক্ষিত হইলাম তাহাতে অশ্বিনী বাবু ও জগদীশ 
বাবু উভয়েরই অমত ছিল বটে, কিন্ত আমার উপর তাহাদের 
নেহ একটুও হ্রাস হয় নাই। তীহারা অতিশয় স্েহ ও আদরের 
সহিত আমাকে গ্রহণ করিয়াছেন । 


€( ২৭ ) 


জগদীশ বাবু শেষে তাহার বরিশালস্থ বাঁসভবনেই দেবমৃক্তি 
স্থাপন করিলেন । সেখানে প্রতি রবিবার সকাল বেলা অনেকে 
আমিতেন। তাহার শান্ত্রপাঠ ও ব্যাখ্যা শুনিয়া সকলেই মোহিত 
ও উপরূত হইতেন। তাহার মুখনিঃস্থত শান্ত্পাঠ ও ব্যাখ্য। 
শুনিবার স্থযোগ আমার কখনও হয় নাই। অশ্বিনী বাবু অনেক 
সময়ে ব্রাহ্মদমাজে শান্ত্রপাঠ ও নানা দৃ্ঠীস্ত ও সদর্থবোধক 
অন্য শাস্ত্রের বাক্য উচ্চারণ করিয়া যে ব্যাখ্যা করিয়াছেন তাহ। 
শ্রবণ করিয়। মুগ্ধ ও উপরুত হইয়াছি। স্বর্গীয় ভক্তিভাজন 
শিবনাথ শাস্ত্রীও এ প্রণালীতে শীস্ত্রপাঠ ও ব্যাখ্যা করিতেন। 
একট। শ্লোক ব্যাখ্যা করিতেই হয়ত এক ঘণ্টা কাটিত। আমিও 
আমার ক্ষুদ্র শক্তি দ্বারা এ প্রণালীতে শান্ত্রপাঠ ও ব্যাখ্যা করিতে 
চেষ্টা করিতাম ৷ 

জগদীশ বাবু রাজনৈতিক আন্দৌলনে সাক্ষাংভাবে যোগ দিতেন 
না। কিন্তু তিনি যে খুব স্বদদেশভক্ত জাতীয়তাবাদী ছিলেন 
তাহার যথেষ্ট প্রমাণ পাইয়াছি। 

সমাজ সংস্কারেও তিনি খুব অগ্রসর ছিলেন। আমি যখন 
নূলধাতে হেড্মাষ্টারের কাধ্য করি তখন আমার কলিকাতার বন্ধু- 
গণ “সমাজ সংস্কার সমিতি” নামে একটি সমিতি গঠন করিয়া আমাকে 
তাহার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। সেই সমিতি হইতে অনেক 
লোককে প্রতিজ্ঞাপত্র স্বাক্ষর করান হইয়াছিল। সেই সমিতির 
উদ্যোগে কল্লিকাতায় ত্রাহ্মমতে এক বিধবা বিবাহ হয়। সমিতি 
হইতেই কন্তা পক্ষের ব্যয়ভার বহন করা হয়। অবশ্য বরকে 
পণ দেওয়া হয় নাই। সমিতি বরপণ তিরোহিত করিবার চেষ্টা 
করেন। সেই সমিতি হইতে আমার লিখিত “বিবাহে পণ গ্রহণ, 


(২৮ ) 


নামক পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ন্সেহলতার অগ্নি সংযোগে মৃত্যু 
সময়ে যখন দেশে বরপণের বিরুদ্ধে ঘোরতর আন্দোলন আরম্ত 
হয় তখন সেই পুস্তিকার বিক্রয়াবশিষ্ট খণ্ডগুলি বিনামূল্যে 
বিতরণ কর! হয়। সেই সমিতি হইতে বরিশালের একটি বাল- 
বিধবার পুনধিবাহের চেষ্টা করা হয়। তখন জগদীশ বাবু 
বলিয়াছিলেন, “প্রয়োজন হইলে আমি এই বিবাহে পুরোহিতের 
কাধ্য করিব 1, কিন্তু বিবাহের বন্দোবস্ত করিতে পারা গেল না। 

জগদীশবাবু অস্পৃশ্যতা নিবারণের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাহার 
নিকট ব্রাঙ্ষণ, শৃদ্রঃ মুসলমান সকলেই সমান আদর প্রাপ্ত হইত। 
শুনিয়াছি তিনি বলিয়! গিয়াছেন, “আমার মৃত্যু হইলে আমার দেহ 
যেন সকল বর্ণের ও সকল জাতির লোকে স্পর্শ করিতে পারে ।; 
তাহার মৃত্যুর পর দুইটা মুসলমান ছাত্র নাকি তাহার পা ধরিয়। 
ক্রন্দন করিয়াছিল । 

আমি নলধা হইতে একবার পুজার বদ্ধে বরিশাল আসিবার 
পথে বাগেরহাট ট্টীমার হইতে নামিয়া পদত্রজে তাহার গ্রামে যাই । 
তিনি আমাকে পাইগ্লা খুব আনন্দ প্রকাশ করিলেন ও খুব 
স্নেহের সহিত আমাকে গ্রহণ করিলেন । কিন্তু তৎকালে তিনি 
আমার সঙ্গে একস্থানে বসিয়া আহার করিলেন না। আমার 
আহারের সময় কাছে বপিয়। খাওয়াইতেন, পরে অন্যত্র যাইয়া 
আহার করিতেন। কিন্তু এই ভাব তাহার পরিবপ্তিত হইয়াছিল । 
একবার বরিশালে তাহার বাসাতে. আমাকে আহারের জন্য নিমন্ত্রণ 
কবেন। আমি যাইয়া! দেখি রান্নাঘরের বারান্দায় দুইখানা পাতা 
রহিয়াছে । একখানাতে তিনি বসিলেন, অপরখানাতে আমাকে 
বসাইলেন। আমি একটু অবাক হইলাম কিন্তু কিছু বলিলাম না । 


1 ] 
7 


/ ]. রা ॥ 
ৰা 1010111 1010 
1117111 
] 1111 1011 রা 
1. [0] ] 
11011 


1 
1 7 


1 ৰ রর [ 
4 ৫, 


[1 
||. 


ৰা 
10 ] ৰা 
10101111) 

রা 111] 

1 রি 
/ 1 
1111 





€ ২৯ ) 


আহারের. পর অয।চিতভাবে তিনি বলিলেন, “দেখ ললিত, যাহা- 
দ্রিগকে ভালবাসা যায়, তাদের সঙ্গে একস্থানে বসিয়া আহার 
করিতে দোষ নাই ।, অশ্বিনী বাবুও প্রথমে ব্রাঙ্মদের সঙ্গে অন্ন 
গ্রহণ করিতেন না। অথচ তখন সকলেই তাহাকে ব্রাহ্ম বলিত । 
তিনি ব্রাহ্মদমাজে নিয়মিত মৃত উপাসনাতে যাইতেন, বক্তৃতা 
করিতেন, ব্রাঙ্ষঘমাজ কমিটির মেধর ছিলেন। কিন্তু বেদীতে 
বসিয়। উপাসনা করিতেন ন।। পরবর্তীকালে এই আহারের নিয়ম 
রক্ষা করেন নাই। আমি জিজ্ঞাসা করিলে বলিলেন, যারা কংগ্রেস 
কন্ফারেন্সে এত ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত থাকে তারা অত অন্ন বিচার 
করিয়া চলিতে পারে না। 

জগদীশ বাঁবু ত্যাগী পুরুষ ছিলেন। ইচ্ছা করিলে তিনি উচ্চ 
পদ লাঁভ করিতে পাঁরিতেন, অনেক অর্থ উপাজ্জন করিতে 
পারিতেন। সে দিকে তাহার মন আকৃষ্ট হয় নাই। নিজে 
বিবাহ না করিয়া সামান্য আহার পরিচ্ছদে সন্তষ্ট থাকিয়া লোকের 
সেবা করিয়াছেন। মানুষ ঠৈয়ারী করা অশ্বিনী বাবু ও জগদীশ 
বাবুর জীবনের ব্রত ছিল। তাই জগদীশ বাবু শিক্ষকতা কাধ্যই 
বরণ করিয়াছিলেন । তাহাদের আদর্শে আমিও শিক্ষকতা কাধ্য 
গ্রহণ করিয়াছিলাম। কিন্তু গভর্ণ মেণ্টের রোষানলে পড়িয়া! চিরবাঞ্চিত 
শিক্ষকতার কাধ্য ত্যাগ করিতে হইল। জগদীশবাবু আপনাকে 
বিলোপ করিয়া দ্রিয়াছিলেন। শুনিয়াছি অশ্বিনীবাঁবু যখন নির্বাসিত 
হইয়া লক্ষৌ। €জলে আবদ্ধ ছিলেন তখন তার জীবনলিপি লিখিবার 
জন্য একখান! বাঁধান খাতা দ্রেওয়া হ্ইয়াছিল। তিনি ফিরিয়া 
আসিনে বন্ধুগণ সেই খাতাতে কি লেখা আছে জানিতে চাহিলেন। 
“তিনি দেখাইলেন, খাতাখানি শূন্ত। ছুই পার্খে দৃঢ় মলাট। অশ্বিনী 


(॥ ৩০ ) 


বাবু বলিলেন, আমার জীবনেরও একদিকে জন্ম আর এক দিকে 
সৃত্যুর্ূপ মলাট রহিয়াছে, মাঝখানে সব ফাকা। জগদীশ বাবুও 
নাকি বলিয়। গিয়াছেন, তাহার যেন স্বতিচিহ কেহ রক্ষা না 
করেন। অন্ুরক্ত শিষ্য ও ছাত্রদের পক্ষে এই আব্দার রক্ষা করা 
সম্ভব হইবে কিনা জানি না। 

অশ্বিনী বাবু চলিয়া গেলেন, জগদীশ বাবুও চলিয়া গেলেন। 
বরিশাল আজ শৃন্ত। কিন্তু তাহারা বরিশালবাসীর হদয়মন্দিরে 
উজ্জ্লভাবে শোভা পাইতেছেন । 

আমিও দীর্ঘকাল রোগে শধ্যাগত আছি । জগদীশ বাবুর শেষ 
কালেও তাহার চরণতলে যাইয়] বসিতে পারিলাম না। তবে 
আশা আছে, শীঘ্রই অপরলোকে যাইয়া তাহাদের সঙ্গে মিলিত 
হইব। সেই মিলনের আনন্দের প্রতীক্ষায় এই রোগ যন্ত্রণা 
ভোগ করিতেছি। 


শিষ্য সঙ্গে (১) 


একদিন সকালবেলা ( ১৯১০ শ্বীঃ) এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচাধ্যদেবের 
গৃহের সম্মুখে উঠানে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। সন্ধ্যা- 
ধ্যান সমাপনান্তে তিনি যখন ঠাকুরঘর হইতে বাহির হইয়! নিজের 
ঘরের দিকে আমিতেছিলেন, তখন সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাহাকে অভিবাদন 
করিয়া দীড়াইয়া রহিলেন। আচাধ্যদেব তাহার আগমনের উদ্দেশ্য 
জানিতে চাহিলে বুদ্ধ শ্রদ্ধাবিনআ্রভাবে উত্তর করিলেন (অবশ্য 
বরিশালের উচ্চারণভঙ্গীতে ) “আজ্ঞে, বাখরগঞ্জের শিব দেখিতে 
আসিয়াছি।” এই বৃদ্ধ ত্রাহ্মণের উক্তি বরিশালের জনসাধারণের 
আচাধ্যদেবের প্রতি স্পষ্ট দৃঢ় ধারণারই প্রতিধ্বনি । তিনি ছিলেন 
বরিশালের শিব--সৌম্য, শান্ত, স্থুসমাহিত, তপস্যাদীপ্ত ও মনোরম- 
কান্তি শিব ঠাকুর। 

বালক বয়সে ধাহাঁকে দেখিয়া শ্রীশ্রীরামকৃষ্দেব বলিয়া উঠিয়া 
ছিলেন “এ কাচা সোণ। কোথায় পেলে অশ্বিনী ?-তিনি থে 
বরিশালের লোকের শ্রদ্ধার বন্ত হইবেন তাহাতে কিছুই আশ্তর্য্য 
ছিলনা । জন্মস্থুলভ শুদ্ধ অপাপবিদ্ধ ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিলেও 
তাহার জীবন গভীরতর সত্যের উপলব্ধির জন্য সর্বদা তপন্যাপরায়ণ 
ছিল। প্রায়শ:ই তাহার মুখে এই কথা শোনা যাইত “তপ, তপ, 
তপ।; নহিলে* পত, পত, পত” অর্থাৎ “তপন্তা! কর, তপস্ত! কর, 
তপস্যা কর; নহিলে পতিত হও, পতিত হও, পতিত হও ।” শুধু 
যে তপন্ঠ। ব্যতীত আত্মোপলব্ধি হয় না তাহা নহে, পূর্ববকর্মকলে যে 
' উন্নত চরিত্র ও উচ্চ আধ্যাত্মিক অধিকার লাভ ঘটিয়াছে তাহাও রক্ষা 


( ৩২) 


করা সম্ভব হয় না । 'আমি বেশ শুদ্ধ সংযতই আছি, আমার আর তপঃ 
ক্লেশের প্রয়োজন কি? এই বুদ্ধি করিলেই পতন অনিবাধ্য। আচাধ্যদেব 
সর্বদা এই কথাই স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য পূর্বোক্ত উপদেশ প্রদান 
করিতেন। এবং তিনি নিজে ছিলেন এই উপদেশের জীবন্ত 
সার্থকতা ৷ 

থপ্রতিষ্ঠ দ্েববিগ্রহ ষেমন জনসাধারণকে দুর দৃরান্ত হইতে আকর্ষণ 
করে, অথচ নিকটে উপস্থিত হইলে প্রাণে একটা সসঙ্কোচ শ্রদ্ধা, 
ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতার অন্ুভৃতিমিশ্রিত একটা ভয় ভয় ভাব--পাছে 
দেবতার নিকট কোন অপরাধ হয়--মনের মধ্যে ঘোরা ফেরা করে, 
তাহার কাছে এই ভাব সকল সময়েই বিদ্যমান ছিল । তাহার আদেশ 
ছিল দেবতার আদেশ, অস্বীকার করিবার উপায় নাই; সেখানে 
দ্রটতা আছে, কঠোরতা! নাই, নেহ আছে কিন্ত প্রশ্রয় নাই । প্রেমের 
আকর্ষণে বড় ছোট, ধনী দরিদ্র সকলে ছুটিয়৷ অসিত, কিন্তু তাহার 
সুসংহত নিলিপ্ত ভাবের সম্মুখে শ্রদ্ধানিবেদনের চপলতা আপনিই 
সংযত হইম্বা যাইত। 

আচার্ধাদেবের দিকে তাকাইলে মনঃপ্রাণ আপনিই পবিভ্রতায় 
ভরিয়। উঠিত। মৃ্হাত্বা অশ্বিনীকুমারের স্থপ্রসিদ্দধ ভক্তিযোগ গ্রন্থে 
লিখিত আছে যে একদিন কামভাব অত্যন্ত প্রবল হইলে কোন তরুণ 
বন্ধুর রৌদ্রে দেওয়া কাপড়ের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই উত্তেজনা আপনিই 
থামিয়া গেল। অশ্বিশীবাবু আমাদের নিকট বলিয়াছিলেন যে, সে বন্ধু 
আর কেহই নহেন- আমাদের আচাধ্যদেব স্বয়ং। খাহার পরিধেয় 
বস্ত্র দর্শনে চিত্তের চঞ্চলতা৷ দূর হইয়! যায়, তাহার জীবন্ত মুক্তি যে 
চিত্তকে শুদ্ধ পবিভ্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করিবে তাহাতে আর 
আশ্চধ্য কি? 


( ৩৩ ) 


অনেকের আজও ধারণ! যে ভক্তিযোগের প্রকৃত লেখক জগদীশ- 
বাবু। অবশ্ত তিনি যে লেখক নহেন, তাহার প্রমাণ করিবার কোন 
প্রয়োজন নাই। তবে তাহাদের ধারণার মূলে একটা গৃঢ় সত্য 
বিদ্যমান আছে--আচার্যাদেবের মধ্যে ভক্তিযোগের আদর্শ যুত্তিমান 
ও জীবন্ত হইয়। উঠিয়াছিল। 


ব্রজমোহন বি্যালয়ে পাঠকালীন প্রায় দেড় বৎসর কাল আচাধ্য- 
দেবের আশ্রমে থাকিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল । বহুদিন পর্য্স্ত 
আচাধ্যদেবের ঘরের বারান্দায় একটা লম্বা কাঠের বাক্স অমনি পড়িয়া 
আছে দেখিয়া! একদিন কৌতুহলী হইয়া বয়োবুদ্ধ কাহাকেও জিজ্ঞাসা 
করিয়! আনিতে পারিলাম, যে উহা! “ন্যারের”* বাছ্যন্ত্রের বাক্স । 
তিনি পূর্বেবে উহাতে সঙ্গীতালাপ করিতেন। তাহার দেখাদেখি 
কয়েকজন ছাত্রের সখ বাড়িয়া উঠায়, তিনি তাহাদিগকে প্রতি- 
নিবৃত্ত হইতে আদেশ দেওয়ার পূর্বের, নিজে উহা চিরদিনের মত 
বন্ধ করিয়া দেন। “আপনি আচরি ধশ্ম জীবেরে শিখায়” তবে না 
আচাধ্য হওয়া যায়? বরিশালের সঙ্গীতজ্ঞগণ সকলেই একবাক্যে 
আচার্যদেবের জঙ্গীতশাস্ত্রে গভীর পারদশিতা ও বুযুৎপত্তির সাক্ষ্য 


* ছাত্রগণ শিক্ষককে “ন্তার” বলিয়! সন্বোধন করে। কিন্তু আচাধ্যদেব ছিলেন 
বরিশালের সকলেরই 'ম্তার, ৷ *ন্যারে” বলিয়াছেন, “ন্তারের বাঁসা” বলিলে আচা্য- 
দেবকেই বুঝাইত। তাহার এই সর্ববাদিসম্মত ব্যাপক “হ্যার” উপাধি, তিনি যে 
সকলেরই আচার্য্য ঞ্লই কথার স্পষ্ট প্রমাণ ছিল। একদিন এক পত্রের শিরোনামায় 
কোন ভদ্রলোক লিখিয়াছিলেন 51 ]9250151) 15151761156”, তিনি শিরোনামা 
দেখেয়। হাসিয়! বলিলেন “এর আমাকে 91 উপাধি দিয়ে জেলে পোরার বন্দোবস্ত 
কর্বে দেখ ছি।” (সত্তরট কর্তৃক যাহার! £:9181767০০ প্রাপ্ত হন, তাহাদের নামের 
আগেই মাত্র “51£” শব্ধ প্রয়োগ হইতে পারে )। 

৮৬. 


(৩৪ ) 


দিবেন। আমি নিজে অনেক দিন দেখিয়াছি, তিনি কত রমবোধ 
ও আনন্দের সহিত সঙ্গীতবিজ্ঞান সন্বত্ধে অপরকে উপদেশ দিতেছেন,, 
অথচ ছাত্রদের মঙ্গলার্থে সঙ্গীতযন্ত্রের সহিত চিরবিচ্ছেদ স্বেচ্ছায় 
ঘটাইয়! ছিলেন-_-কতখানি ত্যাগ, সংযম ও ছাত্রদের মঙ্গল ইচ্ছা 
থাকিলে ইহা সম্ভব হইতে পারে? দুষণীয় বস্ত বা অভ্যাস ত্যাগ 
প্রশংসার বটে, কিন্তু অপরের কল্যাণার্থ নির্দোষ আনন্দবর্জনে 
কতখানি প্রাণের দরকার হয়, তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা স্থুকঠিন। 

ছাত্রদের মঙ্গলের জন্ত এই ত্যাগন্বীকার অপেক্গা অধিকতর 
কঠোর ছিল তাহার নিরামিষাহার ও ব্রতোপবাসাদি ত্যাগে। 
যাহার শ্রেষ্ঠ ও সম্মানাহ তাহাদের বাহিক আচারের অনুকরণ 
করার প্রবলতা ছাত্রদের মধ্যে যথেষ্ট বিছ্ভমান--কিস্তু তদনুযায়ী 
চরিত্রগঠন ও যোগ্যতার্জন করার সাধন! গ্রহণে বড় কেহ অগ্রসর 
হইতে চাহে না। ফলে ছুই দিন খুব মাতামাতি, বাড়াবাড়ি করিয়! 
তাহারা সব ছাড়িয়। দেয় এবং পরিশেষে বিজ্ঞের মত মন্তব্য প্রকাশ 
করিতে থাকে “মশাই, ঢের করে দেখেছি, ওর আদবে কোনই 
মূল্য নাই।” চরিত্র সাধনার আন্তরিক প্রেরণা বা প্রয়োজন বোধ 
ব্যতীত ব্রতোপবাস, হয় ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা, না হয় ভগ্তামীর 
সৃষ্টি করিয়া থাকে। অযোগ্য অনধিকারীর অন্করণস্পৃহ! অমঙ্গল- 
কর বলিয়া তিনি তাহাদের সে সুযোগ না দেওয়ার জন্য নিজে 
সাধারণ দশজনের মতই চলিতেন; কিন্তু বিশে বিশেষ ছাত্রদের 
বেলায় আপত্তি ত দুরের করা, সম্মতিই দিতেন। আমি যখন 
তাহার সহিত ছিলাম, তখন আশ্রমের কয়েকজ্নেই একাদশীর 
উপবাপ করিত, কেহ কেহ নিরামিষও খাইত। 

আচাধ্য শঙ্করের জীবনীপাঠ ও স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরম্বতী- 


(৩৫ ) 


মহারাজের ( তখন সতীশবাবু) সহিত মাখামাথির ফলে বেদান্তের 
অদ্বৈতবাদের প্রতি আমার একটু বেশী বেশী বঝৌঁক জন্মে। 
নির্বাণষটুকের আবৃত্তি ও ““অহং ব্রন্মাম্মি' প্রভৃতি ঝড় বড় কথা 
অনর্গল বকিতে থাকিতাম | আচার্যদেব ছুই চারিদিন আমার 
এই শুন্যগর্ত উচ্ছাস লক্ষ্য করিলেন এবং একদিন যখন আমি খুব 
উৎসাহের সহিত আবৃত্তি করিতে ছিলাম “পিতা নৈব মে নৈব 
মাতা ন জন্ম চিদানন্দরূপঃ শিবোহহং শিবোইহম্ঠ তিনি হাসিয়া 
বলিলেন (তিনি যে কাছে বেড়ার ওপাশে ছিলেন সে হ'স আমার 
ছিল না) “ব্যস, তোমার বাবাকে লিখে দিচ্ছি, আর তোমাকে 
পড়ার খরচ পাঠাতে হবে না, তোমার ত পিতা মাতা কিছুই 
নাই।” তৈল ঢালিলে যেমন ডালের উতাল আপনি পড়িয়া যায় 
তাহার এই বাক্যে আমার অদ্বৈতবাদের উচ্ছ্বাস একেবারেই থামিয়া 
গেল। তাহার এই স্েহপূর্ণ তিরস্কারহীন মন্তব্য আমার অযোগ্যতা 
যেমন স্পষ্ট করিয়! দিল, বোধ হয় কোন পণ্ডিতের শত যুক্তি 
তর্ক তাহ। পারিত না। 

তিনি আমার অনধিকার বাগাড়ম্বরকে বন্ধ করিয়াই ক্ষান্ত 
রহিলেন না; তিনি জানিতেন, যে ধর্মস্পৃহা এই অদ্বৈতবাদের 
উচ্ছ্বাস স্ষ্টি করিয়াছে, তাহার জন্যও কিছু কর! একান্ত প্রয়োজন। 
তাই একদিন ছুপুর বেলা ঘরে বিয়া যখন সমবয়সীদের সঙ্গে 
আড্ডা দিতেছিলাম, এমন সময় আচাধ্যদেব আমার নাম ধরিয়! 
ডাক দিলেন।* ত্রস্তপদে ভয়ে ভয়ে তাহার নিকট উপস্থিত হইলাম, 
বুঝি বা আড্ডা দেওয়ার জন্য তিরস্কার করিবেন। তিনি আমার 
'দিকে স্থিরনেত্রে তাকাইয়া বলিলেন “তোমার 11০০-_ধন্মাদর্শ লিখে 
'নাও-অনায়াসেন মরণং, বিনা দৈন্যেন জীবনমরাধিতগোবিন্দ- 


( ৩৬) 

চরণস্য কিং ভবেৎ--অর্থাৎ মরণে কোন প্রকার ছুঃখবোধ এবং 
জীবনযাপনে দৈন্তভীব থাকিবে না, কিন্তু সকল সময়ে মনে 
রাখিতে হইবে গোবিন্দের চরণ ভজনা না করিলে কিছুই হইল না1,% 

আমার ম্যালেরিয়৷ জর ছিল, স্ৃতরাং খাওয়া দাওয়া, চল! ফেরা, 
বহু বিধিনিষেধ মানিতে হইত । তন্মধ্যে একটী ছিল--কল। 
খাওয়া নিষেধ; অথচ উহা আমার অতিশয় প্রিয় খাদ্য। তাই 
একদিন ঠাকুর ঘরের একটা প্রসাদী কলা, যখন ঘরে কেহ নাই 
তখন পরদার আড়ালে বসিয়৷ খাইয়া ফেলিলাম, ভাবিলাম কেহ 
জানিতে পায় নাই। কিন্তু রাত্রে আচাধ্যদেব আমাকে বলিলেন, 
«গোপনে কলা খেলে জর 'ভালে৷ হবে কেমন করে?” আমি ত 
অবাক হইয়া গেলাম। তিনি কেমন করিয়! জানিলেন? আজ 
পর্ধ্যস্ত এই ব্যাপারটি আমার কাছে রহস্তাবৃত আছে। 

আর একদিনের কথা মনে আছে। সকালবেলা ঘরে বৃসিয় 
পড়িতেছি, এমন সময় তিনি ডাক দ্দিলেন। ত্বাহার ঘরে উপস্থিত 
হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন “বল, দৈব কি পুরুষাকার বড়?” আমি 
উত্তর দিলাম “পূর্বজন্মের কর্শফলই এ জন্মে দৈবরূপে প্রকাশ পায়, 
এবং আমাদের সংস্কৃত পাঠ্যপুস্তক হইতে গশ্লোকটী বলিলাম--“যথা। 
হ্যেকেন চক্রেণ ন রথস্ত গতির্তবেৎ তথ! পুরুষাকারং বিনা দৈবং ন 
সিধ্যতি” অর্থাৎ যেমন এক্চক্রে রথ চলিতে পারে ন। তেমনি দৈবও 
পুরুষাকার ব্যতীত ফলবতী নহে। তিনি ঘরে উপস্থিত জনৈক 











* এতদ্যতীত চল! ফেরা, বিশেষ ভাবে, ষ্টিসযমবিষয়ে তিনি অনেক 
উপদেশ দিয়াছেন ; কারণ দৃষ্টিকে আশ্রয় করিয়াই ইন্দরিয়চাঞ্চল্য বিশেষ ভাবে ঘটিয়। 
থাকে। মনঃসংযম দ্বার কি প্রকারে চক্ষুর দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ কর। যাঁয় সেই যৌগিক 
প্রক্তিয়াও শিখাইয়। ছিলেন। | 


( ৩৭ ) 


প্রবীণ ভদ্রলোককে বলিলেন “কেমন, আপনার উত্তর মিলিল ত?* 
আচাধ্যদেব এক টিলে ছুই পাখী মারিলেন-_-আমার পড়াশ্তন৷ ঠিকমত 
হইতেছে কিনা, তাহার পরীক্ষা হইল এবং জিজ্ঞাস্থ ভদ্রলোকের উত্তরও 
মলিল। 

আমার এক বালক ভ্রাতুন্পুত্র ভোলানন্দ গিরি মহারাজের নিকট 
দীক্ষা পায় এবং দীক্ষার নির্দেশানুযায়ী য্তস্যাহীর নিষিদ্ধ ছিল। 
স্থতরাং তাহার পিতা তাহার মাছ বন্ধ করিয়া! দেন। বালকের কিন্তু 
মাছের প্রতি ভীষণ লিগ্মা ছিল। ছুই চারি মাস কোন রকমে কাটিয়! 
গেল, কিন্তু “প্রকৃতিং যাস্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি” (প্রাণিগণ 
স্ব স্ব প্রকৃতির অনুযায়ী চলিতে বাধ্য, নিগ্রহ কি করিতে পারে)? 
বালকটীা সমবয়স্ক বোন্দের সঙ্গে বসিয়৷ খাওয়ার জিদ ধরিল; এবং 
অপরের অলক্ষ্যে প্রথমে মাছের ঝোঁলে মাখা ভাত, পরে দুই এক 
টুকরা মাছেরও সঘ্যবহার আরম্ভ করিল। আচার্য)দেবের কাছে এই 
ব্যাপার উত্থাপন করা হইলে তিনি তাহাকে তিথি ও বারের নিষিদ্ধ 
দ্রিন বাদ দরিয়া অন্য দ্রিনে মাছ খাইতে বলিলেন--প্রকৃতির উপর 
জবরদস্তি করিতে নাই, ধীরে সুস্থে সংযত করাই প্রকুষ্ট পশ্থা । 

১৩১৫ কি ১৩১৬ সালে বরিশালে এক ভীষণ সামাজিক বিক্ষোভের 
্ষ্টি হয়-_শ্রীযুত গণেশচন্দ্র দাস মহাশয়ের বিধবা কন্টার পুনব্বিবাহ 
সম্পর্কে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া এই মিথ্যা সংস্কার সমাজে 
বদ্ধমূল হইয়াছে যে, বিধবা-বিবাহ অতিশয় পাপজনক এবং 
বিধাতার ইচ্ছার উপর ইচ্ছা! পরিচালন । স্বণা, ক্রোধ ও ক্ষোভে 
সমাজ ক্ষেপিয়া উঠিল। কিন্তু বিস্ময়, অতিশয় বিস্ময়ের ব্যাপার 
ছিল এই যে, এই অনুষ্ঠানের উদ্যোগকর্ত চিরকুমার ব্রদ্মচারী 
বরিশালের ধর্াদর্শ আচার্য জগদীশ! চারিদিকে তুমুল কোলাহল 


( ৩৮ ) 


উখিত হইল। যেমন সমুদ্রের ক্রুদ্ধ তরঙ্গোচ্ছীস পাহাড়ের পদতলে 
আছাড় খাইয়া চূর্নবিচুর্ণ হইয়া যায়, তেমনি সমাজের জড় সংস্কারের 
আক্রোশ আচাধ্যদেবের নিকট আসিয়া যেন কেমন ব্যর্থ ও 
হতমান হইতে লাগিল। 

সেই সময় একজন বৃদ্ধ পণ্ডিত তাহার নিকট উপস্থিত হইয়! জিজ্ঞাস 
করেন, “আপনি বিধবা বিবাহ দিতে চাচ্ছেন কোন্‌ শাস্তযুক্তিতে ?” 
তিনি দৃঢ়তার সহিত ধীরে উত্তর করিলেন, “শান্ত্রবিচারের জন্য 
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বই পড়ে নেবেন ৮ পণ্ডিতজীর তর্ক করিবার 
আগ্রহ এই উত্তরে নিভিয়া গেল, তিনি আস্তে আস্তে চলিয়! 
গেলেন। 

শুধু কি জনসাধারণ ও পর্ডিতগণকে লইয়। ফ্যাসাদ ছিল? তাহার 
প্রিয় ছাত্র ও ভক্তসেবকগণ মধ্যেও বিরোধীতার ভাব প্রকাশ পাইল-_ 
ইনি এ কি করিতেছেন!” এই ঘটনার প্রায় ষোল বৎসর পরে 
আচাধ্যদেবের ঘরে বসিয়। বিধবা-বিবাহ প্রসঙ্গ উঠিলে আচাধ্য- 
দেবের জনৈক অতিপ্রিয় ও ভক্তসেবক অঙ্গযোগের স্থুরে বলিয়া 
উঠিলেন «আপনার এ সব কাঁজের যুক্তি আমরা! খুঁজিয়া পাই না, 
আমাদের মোটেই ভাল ঠেকে নাই ।” আচাধ্যদেব অতিশয় দৃঢ়তার 
সহিত উত্তর করিলেন, “আমার জীবনে এর চেয়ে ভাল কাজও 
আর কিছু করি নাই।” কয়েকজন ভক্ত সেবকের মত আমিও 
বিধবা-বিবাহ সমর্থন করিতে একান্ত কুষ্ঠিত ছিলাম এবং বিদ্যাসাগর 
মহাশয়ের মত খগ্নার্থ স্বৃতিগ্রস্থসমূহ অধ্যয়ন করিতে আর্ত 
করিয়া দ্রিলাম এবং শাস্ত্রে বিধবা-বিবাহের স্পষ্ট সমর্থন দেখিতে 
পাইয়া মন্দাহত হুইয়াছিলাম সুতরাং আন্তে আন্তে বলিলাম, «শাস্ত্রে 
যখন বিধবা! বিবাহের কথা আছে, তখন আর বিরোধীতা করিতে 


(& ৩৯ ) 


পারি না)” তিনি পুর্ববৎ তেজের সহিত উত্তর করিলেন, “আমি 
ইহাকে অন্তরের সহিতই সমর্থন করি |” 

নারী-কামনা পরিত্যাগ যে ব্রদ্মচারীর জীবনে একটা ভিত্তিমূলক 
আদর্শ, নারীর প্রতি সহান্গভূতি ও শ্রদ্ধা সেই ব্রহ্মচারীর কতদূর ছিল 
তাহা তাহার বিধবাবিবাহ ও নারীর উন্নতিকর শিক্ষা ও শিল্প 
প্রতিষ্ঠান গড়িয়। তুলিবার প্রচেষ্টার মধ্যে অতিশয় স্পষ্ট ছিল। নারীকে 
পত্রীরূপে গ্রহণ না করার হেতু তাহাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও গ্রীতির 
অভাব নহে, ইন্দ্রিয়সংঘম্র উচ্চতর আদর্শই উহার কারণ ছিল। 
বরিশালে নারী স্বাধীনতা ও নানাবিধ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রধান 
কাধ্যকরী প্রেরণা পরোক্ষভাবে আচাধ্যদেবের আশ্রম হইতেই 
স্থষ্ট হয়। প্রতি রবিবার পুরুষগণের মত বহু মহিলাও কীর্তন ও 
শান্ত্রবাখ্যা শ্রবণের জন্য তাহার আশ্রমে সমবেত হইতেন। যেমন 
তীর্থভূমিতে নারীর অবরোধ নাই, তেমনই তাহার আশ্রমতীর্থের 
আকর্ষণ অজ্ঞাতসারে অবরোধ প্রথা দূরীকরণে সহায়তা করিয়াছিল । 

আচাধ্যদেবের শাস্ত্রে গভীর শ্রদ্ধা ও উপলদ্ধি অসীম পাণ্ডিত্য- 
মণ্ডিত হইয়। যখন উপদেশ ও শাস্ত্র ব্যাখ্যার ম্ধ্য দিয়া প্রকাশ 
পাইত, তখন একান্ত শান্ত্রবিমুখের নিকটও শাস্ত্র মধুর ও হৃদয়- 
গ্রাহী হইয়া উঠিত। মহাত্মা অশ্বিনীকুমারের এই সম্বন্ধে একদিনের 
মন্তব্য আচাধ্যদেবের পাণ্ডিত্য ও গুঢ় উপলদ্ধি বিষয়ে স্পট ধারণ 
জন্মাইতে পারিবে। “গ্যাখ, জগদীশকে আমিই প্রথমে ভাগবত 
পড়াই, আর আজ আমিই তার পাঠ শুনতে আসি।” তিনি প্রতি 
রবিবার প্রায় একথণ্টা কি দেড়ঘণ্ট। কাল শান্তর ব্যাখ্যা করিতেন। 
তখন সমুদয় শ্রোতা উৎকর্ণ ও নিন্তব্ধ হইয়। থাকিত, স্থুম্ধুর 
সঙ্গীত বা কীর্তন লোককে এতদূর মুগ্ধ করিত না । 


(৪০ ) 


রবিবার ব্যতীত অন্যান্ত পর্বদিনেও তৎ তৎ দ্রিনের উপযোগী 
ধর্মব্যাখ্যা ও মহাপুরুষ-জীবনী আলোচনা হইত। বৌদ্ধ, শিখ, 
এমন কি ক্রিশ্চিয়ান ও ইসলাম ধর্মসমাজের পর্বদিনেও তাহাদের 
শান্্রতাৎ্পধ্য ও মহাপুরুষ-জীবণী আলোচিত হইত। যদিও 
সনাতন ধর্শকে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করিতেন, তথাপি অন্য ধর্মের 
প্রতি তিনি উপযুক্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কদীচ কার্পণ্য করেন নাই। 
তাই অন্তান্ ধন্মীবলম্বিগণও তাহাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিত | 

একদিন অকৃস্ফোর্ড মিশনের রেভারেও্ড ফচেটু সাহেব বলিতে- 
ছিলেন "থুষ্টান না হইলে আর প্রাণের কোন ভরসা নাই।”» আমার 
জনৈক আত্মীয় তাহাকে তখনই প্রশ্ব করিলেন, "আপনার মতে ত 
তাহা হইলে জগদীশবাবু ত্রাণ পাইবেন ন।1” উত্তরে সাহেব 
বলিলেন “জগদীশবাবু ত্রাণ পাইবেন, কারণ তিনি গুপ্তভাবে খৃষ্টান 
আছেন ।” 

তাহার সমুদায় ধন্মমতে উদ্দারভাব যেমন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের 
শ্রদ্ধাকর্ষণ করিয়াছিল, তেমনি তাহার প্রেমভাব তাহাকে অজাত- 
শত্রু করিয়া তুলিয়াছিল। তাহার এই প্রেমভাব শুধু মানুষে আবদ্ধ 
ছিল না, সকল জীবজন্ততেই প্রসারিত হইয়াছিল। একদিন তিনি 
বলিয়াছিলেন--তখন পাতগঞ্জলের “অহিংস! প্রতিষ্ঠায়াং তৎসন্নিধো 
বৈরত্যাগঃ (অহিৎসায় প্রতিষ্ঠিত হইলে তাহার নিকটে অপর জন্তরও 
বৈরভাব ত্যাগ হয়) কথার ব্যাখ্যা আমাদের নিকট করিতেছিলেন 
--দেখ এ কথা অতিবাস্তব, আমি ষখন অহিংস! সাধনায় ভরপূর 
ছিলাম তখন প্রত্যক্ষ করেছি মশা গায়ে বসে” অপ্রস্তত হয়ে উড়ে 
গেছে, ছারপোকা কামড়ায়নি 1৮ 

স্থতরাং তিনি রাষ্্রক্ষেত্রে হিংসাবাদ পছন্দ করিতে পারেন নাই 


(৪১ ) 


এবং যাহাতে উহা তাহার আশ্রমের ভিতর প্রবেশলাভ করিতে 
না পারে, তদ্বিষম্ে অতিশয় হু'সিয়ার ছিলেন। 
যদিও বাহিরে জনসাধারণের চক্ষে কন্মীরূপে তাহাকে খুব কমই 
দেখ! যাইত, তথাপি তাহার প্রেমের উত্স সকল সময়েই আর্ত, 
গীড়িত ও দরিদ্রের জন্য উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিত--কিন্তু এ উচ্ছ্বাস 
কখনে। বিবেচনাহীন ভাবে ঘটিত না। কেহ আসিয়া কান্নাকাটি 
করিলেই যে তিনি গলিয়া যাইতেন অর্থাৎ প্রয়োজনের হিসাব ন! 
করিয়া কাতরতা-প্রকাশ-সামর্থ্য দেখিয়া দান করিতেন তাহা 
মোটেই নহে। স্থিরভাবে সকল কথা শ্বনিয়। তিনি নাম, . ধাম, 
ঠিকানা জানিয়া লইতেন, পরে খোজ করিয়া প্রয়োজনানুসারে সাহায্য 
করিতেন; স্থতরাং কাতরোক্তিদ্বারা মন ভিজাইয়! তাহার নিকট 
হইতে দান আদায় করা সম্ভব ছিল না। তীহার প্রেম ও সেবা, বুদ্ধি, 
যুক্তি ও বাস্তবতা অবলম্বন করিয়াই কাধ্যকরী হইম্বা উত্ভিত--ভাব- 
প্রবণতার তরল উচ্ছাসকে তিনি মোটেই প্রশ্রয় দিতেন নাঁ। দরিদ্র 
বান্ধব সমিতি, রামরুষ্ণমিশন ও কাঁলীশচন্ত্র আতুরাশ্রম পরিচালনার 
মধ্য দিয়া তাহার করুণ সেবাভাব ও সংযত বিচারবুদ্ধির পরিচয় 
লাভ করা যাইতে পারিত। 
ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের সঙ্গীতের এই কয়েকটা পংক্তি ত্তাহার 
সেবাদর্শের আংশিক পরিচয় প্রদান করিবে £-- 
অগ্নিদাহে কেহ সর্বস্ব খোয়ায়, 
দাড়ায়ে না রব পুতুলের প্রায়, 
রোগীর শিয়রে, মৃত্যুর শয্যায়, 
জাঁগিব, গাইব তোমার নাম। 
এই শ্লোকটী আচাধ্যদেবেরই রচনা । তিনি আমাদিগকে সেবা- 


(৪২ ) 


কার্যে উপদেশ দেওয়ার সময় বলিয়া দিয়াছিলেন যে, “সেবাকালে 
মনে মনে খুব নাম করুবি, তাতে নিজের মন প্রফুল্ল, সেবাকার্ধ্য 
অধিকতর মধুর এবং রাত্রে নিদ্রাভাবের জন্য যে শারীরিক গ্লানি 
ও অবসাদ সম্ভব, তাহাও দূর হইয়া যাইবে ।” তাহার উপদেশের 
বাস্তবসত্যতা সম্বন্ধে বহু সেবককম্মাই সাক্ষ্য দিবেন । 

ধাহার নেতৃত্বে বরিশালের প্রায় সমুদায় সেবাগ্রতিষ্ঠানই 
পরিচালিত হইত, তিনি কিন্তু কর্মকোলাহল হইতে দূরে আত্ম- 
গোপন করিয়া থাকিতে ভালবাসিতেন, অপরের হাতে যথাসম্ভব 
কর্তৃত্ব ছাড়িয়া! দিয়া। তাই যখন একে একে তাহার সহকম্মিগণ, 
এই ম্রধাম ছাড়িয়৷ চলিয়া গেলেন, তখন বুদ্ধবয়সে আচাধ্যদেব 
জনসাধারণের চক্ষে কর্মীরূপে প্রকাশিত হইতে বাধ্য হইলেন। 
স্থতরাৎ যাহারা তাহার যৌবনের কর্মবিকাশ লক্ষ্য করিতে ন৷ 
পারিয়া, তাহাকে শুধু আত্মসমাহিত ভক্তযোগী বলিয়াই ধারণা! 
পোষণ করিতেন, তাহারা কতকট। বিভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। 

তিনি শুধু দৈহিক সেবা দিয়াই সন্তুষ্ট ছিলেন না, মানুষের 
আধ্যাত্মিক পেবাকেই তান শ্রেষ্ঠ মনে করিতেন; তাই তাহার 
আশ্রমে কন্মের সঙ্গে ধশ্মভাবহই অধিকতর জাগ্রত ছিল। বর্তমান 
শিক্ষালয়ে ধশ্ম ও চরিত্রসাধনা শিক্ষা দেওয়ার সুবিধা অতিশয় কম; 
এই জন্য তিনি “বাল্যাশ্রম” গঠন করিয়া উহার কর্তৃত্বভার সেবা- 
কাধ্যের মত পণ্ডিত কালীশচন্দ্রের উপর অর্পণ করেন-_যদিও আচার্ধ্য 
তিনিই ছিলেন। বাল্যাশ্রমে ভারতের ছাত্রাদর্শকে কাধ্যকরী করিয়া 
তুলিবার শিক্ষা দেওয়৷ হইত। 

যদিও বছবৎসর ব্রজমোহন কলেজের লজিক ও গণিতাধ্যাপকের 
কাজ করিয়াছিলেন তথাপি ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপেই 


(৪৩ ) 


তিনি জনসমাজে পরিচিত। বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও পরিচালক তীহাঁরই 
অস্তরঙ্গ বন্ধু ভারতবিখ্যাত অশ্বিনীকুমার । তাহাদের গভীর বন্ধুত্বের 
'কথা অশ্বিনীবাবুর মুখে আমর। অনেক শুনিয়াছি। এত ভালবাসা 
সত্বেও একবার বিদ্যালয়ের কার্যাচালনা সম্বন্ধে মতভেদ হওয়ায় তিনি 
ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের কার্ধ্য ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন, বন্ধুত্বের 
ত্বর্ণ আবরণ তাঁহার সত্য বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই। অবশ্ 
পরে এই ব্যাপারের মীমাংসা হইয়াছিল । 

রবিবার দ্রিন আশ্রমে লোকসমাগম হেতু বর্ধাকালে কাদাটা একটু 
বেশীই হইত। তাহাতে সমাগত ভক্তগণের অস্থবিধা হইত ॥ 
এতদ্দর্শনে জিলাস্কলের জনৈক বনুভাষী শিক্ষক আশ্রমস্থ তরুণ বাঁলক- 
গণকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়া ছিলেন “তোমরা মিউনিসিপাঁলিটার রাস্তায় 
ষে ইটের স্তুপ আছে, তার কতকগুলি এনে ত দিতে পার?” তাহারা 
এই কথ! আচাধ্যদেবের কর্ণে প্রবেশমাত্র তিনি তীব্র প্রতিবাদ 
করিয়। উঠিলেন, “তুমি ছেলেদের চোর হইতে শিখাইও না।” জিলা- 
স্কুলের শিক্ষকটা বলিলেন “ও ইট ত সর্বসাধারণেরই | উহা আনিলে 
চুরি হইবে কেন?” তিনি উত্তর করিলেন “হা, উহা! নিশ্চয়ই চুরি_- 
উহ] সর্বসাধারণের রাস্তার জন্, তোমার আমার বাসার ব্যবহারের 
জন্য নহে।” আমরা রাস্তার ইট আনিলে যে চুরি করা হয় ইহা মনে 
করিতাম না, যেমন রাস্তার ধারের কুল বা জাম্গছের ফল খাওয়ায় 
কোন চুরি হয় না, তেমনি মনে করিতাম। কিন্তু আচার্্যদেবের 
কথায় আমাদের ভ্রান্ত ও মলিন বুদ্ধি শুদ্ধ হইয়া চৌর্ধ্যব্যাপারের স্বরূপ 
আরও নিগৃঢ় ভাবে বুঝিতে সক্ষম হইল। 

আচাধ্যদেবের বাহক নিলিপ্ত ভাবের পশ্চাতে ভক্ত ও ছাত্রগণের 
প্রতি দরদ ও তাহাদের উন্নতি কামনা কত প্রবল ছিল, আমার 


(8৪ ) 


ব্ক্িগত ছুই একটা ব্যাপারে তাহা বেশ টের পাইয়াছি। এম্‌, এ, 
পাশ করিয়া কেবলমাত্র সংসারক্ষেত্রে ঢুকিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছি, 
এমন সময়ে আচাধ্যদেবের সামাজিক শিক্ষার বিরোধী এক কাধ্য 
করিয়া অতিশয় সক্কোচের সহিত তাহার নিকট উপস্থিত হইলাম । 
আমাকে দেখিয়া তাহার মুখ একেবারে মলিন হইয়া! গেল, হৃদয়ভেদী 
এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া তিনি বলিলেন “যাঃ, যে সরষে দিয়ে 
ভূত ছাড়াব, সেই সরষেই ভূতে পেয়েছে 1” এই কথা বলিয়াই তিনি 
মনঃকষ্টে নীরব হইলেন। আমিত মরমে মরিয়া গেলাম। সমস্ত 
মনপ্রাণ আত্মগ্রানিতে ভরিয়া উঠিল, তখনই মনে মনে সন্কল্প করিলাম, 
আমাদের পরিবার হইতে বরপণপ্রথা দূর করিতে হইবে এবং এই 
সঙ্কল্পে কৃতকার্যযত1 লাভও করিতে পারিয়াছি। 

যুদ্ধের শেষভাগে যখন কাপড় ছুশ্মলয হওয়ার জন্য গরীব কাঙ্জালের 
একান্ত ছুশ্প্রাপ্য হইয়াছিল, তখন আচাধ্যদেবের তত্বাবধানে বস্ত্রবিতরণ 
কাধ্য আরম্ভ হইয়াছিল । এ সম্পর্কে মাঁড়োয়ারী ব্যবসায়ী ঝুনঝুন- 
ওয়ালার নাম স্মরণীয়, তিনি বহু কাপড় দান করেন। আমাদের উপর 
দুঃস্থ ও নিঃস্ব লোকের খোঁজ করিয়া তাহাদিগকে কাপড় দেওয়ার ভার 
পড়ে এবং তদন্সারে যাহা কর্তব্য তাহা সম্পাদন করি। তিনি সকল 
বিষয়েরই সংবাদ লইতেন এবং এই কাধ্যের পর তাহার নিকট উপস্থিত 
হইলে তিনি প্রছ্ুল্চিত্তে আমাকে বলিলেন “না, যা আশশ্কা৷ করে- 
ছিলাম তা হয়নি, সরষেকে ভূতে পায় নি।৮ যেমন ধিক্কার ছারা ক্রি 
দেখাইয়া দিয়াছিলেন, তেমনি প্রশংসাদ্বারা উত্সাহ বদ্ধন করিলেন। 
যাহারা শুধু ক্রটি দেখায় তাহারা সংশোধনের চাইতে ছোট করিয়া 
ফেলে অনেক বেশী । পূর্বে আমাকে যে তিরস্কার করিয়াছিলেন সে 
প্রায় ছয় মান আগে, অথচ সেকথা মনে রাখিয়া ঠিক প্রশংসাছার! 


(8৫) 


আবত্মপ্রত্যয়কেও তিনি জাগ্রত করিয়া দিলেন। এই ব্যাপার স্পষ্ট 
প্রমাণ দ্রিল যে তিনি কতখানি দরদ ও মঙ্গলকামনাগারা তাহার 
অন্ুগতগণকে পরিচালন। করিতেন। 

যুদ্ধের পর শাসনসংস্কার সম্পর্কে রাষ্রালোচনার সূত্রপাত হইয়া 
নরম ও গরমপন্থীর মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ ১৯১৭ খুষ্টাবে বেশ প্রকাশ 
পাইল । নরমপস্থিগণ সরকারের আন্বগত্য করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে 
তাহাদিগকে তীত্র আক্রমণ কর হইতে লাগিল। একদিন শ্রীযুক্ত 
চিত্বরঞ্রন দাশ (তখনে। দ্েশবন্ধু হয়েন নাই) দ্রেশনেতা স্থরেক্তর- 
নাথকে অতিশয় তীব্রভাষায় আক্রমণ করেন। সেই প্রসঙ্গ উত্থাপিত 
হইলে আচাধ্যদেব ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া বলেন যে, দেশপৃজ্য 
লোককে সমালোচনা করা অতিশয় অসঙ্গত হইয়াছে। আমি 
ব্যারিষ্টার দাশ মহীশয়কে সমর্থন ও স্ববেনবাঁবুকে সমালোচন! করিতে 
উদ্যত হইলেই তিনি আমাকে ধমক দিলেন, “ন্থরেনবাবুর নিন্দা ও 
গুরুনিন্দা সমান, আমার সাম্নে তা হ'তে পারে না, চলে যাও আমার 
ঘর থেকে ।” ধাহাকে দেশশুদ্ধ লোক মান্য করে তাহার সম্বন্ধে 
চপল সমালোচন! শোনাও সঙ্গত নহে--করাও সঙ্গত নহে। 

আমি চলিয়! গেলাম; কয়েকদিন পরে আবার দেখা হইলে 
তিনি ন্বেহের সহিত বলিলেন “আমি ভেবে দেখলাম তোমার কথাই 
ঠিক, স্থরেনবাবুর বর্তমান কাধ্যপদ্ধতি জাতীয় আদর্শের অনুকূল নয়, 
তোমাকে মন্দ বলা আমার ঠিক হয়নি।” আমার মত সর্বরকমে 
ক্ষুদ্র ও নগণ্যব্যক্তির নিকট (তখন আমি তরুণ যুবক মাত্র, সবে 
বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করিয়া! আসিয়াছি ) এই প্রকার ক্রটি স্বীকার কত 
বড় মহীন্ভবতা, তাহা আজকালকার তথাকথিত নেতৃগণের মেজাজ- 
' সন্বদ্ধে যাহার অবগত আছেন তাহারা বলিতে পারিবেন। 


€৪৬ ) 


অহিৎসা-মূলক রাষ্ট্রনৈতিক কার্য্যে ত্বাহার প্রত্যক্ষ যোগ না 
খাকিলেও, তিনি উহাকে অন্তরের সহিত সমর্থন করিতেন। 
অসহযোগ আন্দোলনের সময়, ১৯২১ সালে, যখন শিক্ষকতা ত্যাগ 
করিয়া কর্মক্ষেত্রে নামিয়া৷ পড়ি, তখন তিনি প্রশংসাপূর্ণভাবে 
আমার কার্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। যদিও কার্য্যতঃ 
তাহাকে অসহযোগ ব্যাপারে যোগ দিতে হইয়াছিল, তথাপি তিনি 
নিজমত স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করিতেন। অশ্বিনীবাবু ব্রজমোহন 
বিদ্যালয়কে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিগ্লিষ্ট করিলে তিনি 
পূর্ব উহার প্রধান রহিলেন, কিন্তু স্পষ্টভাবেই জানাইয়৷ দিলেন 
“আমার ব্যক্তিগত কোন মত এ কাধ্যে নাই, আমি অশ্বিনীবাবুর 
কর্শচারীমাত্র এবং তাহার নির্দেশানুসারে কাজ করিতেছি ।” পাছে 
ব্রজমোহন বিদ্যালয়কে জাতীয় বিদ্যালয়ে পরিণত করিয়া পরিচালন। 
করার কৃতিত্ব কেহ ভুলক্রমে তাহার উপর আরোপ করে এইজন্তই 
তিনি প্রকাশ্তভাবে নিজমত জ্ঞাপন করিয়া ছিলেন। জাতীয় শিক্ষার 
প্রতি তাহার শ্রদ্ধার অভাব ছিল, একথা ইহাতে প্রমাণিত হয় না। 
কারণ কয়েক বৎসর পরে অশ্বিনীবাবু ইহধাম ত্যাগ করিয়া গেলে, 
ব্রজমোহন বিদ্যালয় আবার কলিকাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ততুক্ত 
হইয়াছিল। তখন কিন্তু তিনি আর উহার শিক্ষকতা করেন 
নাই, পরন্ধ শ্রীযূত শরৎকুমার ঘোষ মহাশয়ের উদ্যোগে ও 
আমাদের সহযোগীতায় যখন নৃতন জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত 
হয়। তিনি উহার সর্ববিধ আম্কুল্য ও মঙ্গলবামনা করিয়া 
ছিলেন। বিদ্যালয়ে প্রতিদিন পাঠারস্তের পুর্বেবে বন্দেমাতরমূ 
স্তোত্রের সঙ্গে এই স্তোত্রটী পাঠ করিতে তিনি উপদেশ 
দিয়াছিলেন £-- 


(৪৭ ) 


্ব্তযস্ত বিশ্বস্ত খলঃ প্রসীদতাম্‌। 
ধ্যায়ন্ত ভূতানি শিবং মিথো ধিয়া ॥ 
চেতস্ত ভদ্রং ভজতাদধোক্ষজে । 
আবেশ্ততাং নো! মতিরপ্যহৈতুকী ॥ 

“বিশ্ববাসীর মঙ্গল হউক, খলব্যক্তি প্রসন্নভাব ধারণ করুক, 
প্রাণিগণ পরস্পরের গ্রতি মনে মনে ম্ঙ্গলচিস্তা করুক, আমাদের 
ভদ্র চিত্র অধোক্ষজ হরির ভজনা করুক এবং আমাদের মধ্যে 
অহৈতুকী মতি প্রবেশ করুক |” 

দুর্নীতিপরায়ণ পতিত ব্যক্তি সাধুপথে প্রত্যাবর্তন করিলেও 
সমাজের লোক তাহাকে স্বণা করিয়া থাকে (অবশ্য সে যদি খুব ধনী 
ও প্রতিপত্তিশালী লোক হয়, তবে কেহ বড় ঘ্বণা করিতে যাঁয় না, 
পরস্ত তাহার আনুগত্য করিয়া থাকে ) বিশেষতঃ সে যার্দ দরিভ্র 
ও নারী হয়। বাজারের বেশ্ঠার সন্ন্ধে ত কোন কথাই উঠে 
না। দুর্বল অসহায়ের উপর আমাদের নীতিবুদ্ধি অতিশয় জাগ্রত 
ও ক্রিয়াশীল থাকিয়া! মানুষের পুণ্যপথকে যে কত ভাবে রুদ্ধ 
করে, সে করুণ কাহিনী বিবৃত করিবার স্থান এ নহে। কোথায় 
সেই আচার্য কশ্ঠপের সান্বিকসাধনা যাহা পতিপরিত্যক্তা শকুস্তলাকে 
সাগ্রহে আশ্রমে স্থান দিয়াছিল--কোথায় সেই মহাপ্রাণতা ! হিন্দু- 
সমাজের দিকে তাঁকাইলে ভগ্ড নীতিজ্ঞান নারীজাতির উপর কি 
প্রকার উৎপীড়ন করিতেছে তাহা দেখিয়। হৃদয় অবসন্ন হইয়! পড়ে। 
কিন্ত যে দিন বাজারের বেশ্তা স্বখদ| পাপপথ পরিত্যাগ করিয়া 
সাধু-জীবন-যাপনের জন্য সাহায্য ভিক্ষা করিল, এই মহাপ্রাণ আচার্ধ্যদেব 
তাহাকে স্বণা করা ত দূরের কথা, সাদরে কন্যার মত বরণ করিয়! 
 নিলেন। ভদ্দ্রগৃহস্থের বাড়ীতে বাসস্থান ও উপজীবিকার পন্থা নির্দেশ 


(8৮) 


করিয়া দ্িলেন। সমাজের চপল মন্তব্যে কাণ দেওয়ার মত দুর্বল মন 
তাহার কোন দিনই ছিল না। 

ষে সমাজসংস্কারপ্রয়াস বিচ্ছিন্নভাবে চলিয়। আসিতেছিল, তাহা 
যখন সংঘবদ্ধভাবে হিন্দুমহাসভার মধ্য দিয়া কার্ধ্যকরী হইয়া উঠিতে 
উদ্যত হইল, তখন তিনি সানন্দে উহাতে যোগদানকরতঃ বরিশাল 
হিন্দুমহাসভার সভাপতি পদ গ্রহণ করেন । শুদ্ধি, সংগঠন, অস্পৃশ্ঠতা- 
বজ্জন, বিধবা-বিবাহ প্রভৃতি বিষয় সম্বদ্ধে তাঁহার অভিমত বরিশাল 
জিল। হিন্দু সম্মেলনের সভাপতিরূপে তিনি যে অভিভাষণ প্রদান করিয়া- 
ছিলেন, তাহাতে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। অভিভাষণ লেখা 
ব্যাপারে তাহার সেক্রেটারীর কাজ করিবার সৌভাগ্যলাভ আমার 
ঘটিয়াছিল এবং তছৃপলক্ষে সমাজসংস্কার বিষয়ে তাহার আস্তরিক 
আগ্রহের সহিত আমার আরও ঘনিষ্ঠতর জ্ঞান লাভ ঘটিয়াছিল। 
অবশ্ট সকলেই একবাক্যে তাহার অভিভাষণকে সর্বরকমে উৎকুষ্ট 
হইয়াছে বলিয়! যে মৃত প্রকাশ করিয়াছিল তাহাতে আশ্চর্যের 
কথা কিছুই নাই । 

গঠনমূলক রাষ্ট্রান্দোলনে তাহার সহানুভূতি থাকিলেও জন-সেবা» 
চরিত্রগঠন, ধন্মাদর্শ প্রতিষ্ঠা ও প্রচার এবং সমাজসংস্কার ছিল তাহার 
সর্বাপেক্ষা প্রিয় কাধ্য। স্থতরাং আমাকে সমাজান্দোলনে বিশেষ 
ব্রতী দেখিয়া তিনি অতিশয় সন্তোষ লাভ করেন এবং আমাকে 
আশীর্বাদ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আমি পিতৃত্বের ভার নিয়ে তোমাকে 
আশীর্বাদ কবৃছি, যেন তুমি আমাদের আশা পূর্ণ ধর্তে পার।” 
নিজের শক্তি ও সাধনার দিকে তাঁকাইলে কোন ভরস! পাই না; 
তবে যদি কিছু সম্ভব হয় ত এই মহাপুরুষের আশীর্বাদে--কারণ 
উহা ত দ্বেবতার বর! 


(৪৯ ) 


আচাধ্যদেবের সংস্কারান্দোলনে যোগদান ব্যাপার গৌড়া ভক্তদের 
কাছে মোটেই ভাল ঠেকে নাই; অথচ আচার্ধযদেবকে অশ্রদ্ধা 
কর। ব1 তাহাকে মিথ্যা কার্যকারী মনে করিবার মত মনোবৃত্ভিও 
ভক্তদের মধ্যে ত দূরের কথা, বিরুদ্ধবাদীদ্ের মধ্যেও কাহারও 
ছিল বলিয়! জানিতে পারি নাই। যাহা হউক, গোৌঁড়াদলের 
ভক্তগণ এই কথা বলিয়া নিজেদের মনে গ্রবেধ আনিয়াছিল__ 
উহা নরেন প্রমুখ স্সেহাম্পদের প্রতি স্নেহের ফল--বাস্তবিক এই 
সব কাজ তাহার অন্তরের হইতে পরে না। যিনি সত্যের কাছে 
সব বিসঙ্জন দিতে পারেন, তাহার সম্বন্ধে তাহার ভক্তদের এই প্রকার 
ধারণা তাহাদেরই চিত্তের দুর্বলতার পরিচায়ক । যিনি আমাদের 
মনোবৃত্তি স্থষ্টি করিয়া আমাদিগকে মানসপুত্রত্বের সৌভাগ্য প্রদান 
করিয়াছেন আজ তাহার সম্বন্ধে পূর্ব্বাস্তভাবের কথ। বড়ই ম্নস্তাপের 
সন্দেহ নাই। অবশ্য তাহারা যে সত্য জানে না বা বোঝে না 
তাহা নহে; মনকে প্রবোধ দেওয়ার এ এক অতি দুর্ববল পন্থা মাত্র। 
আচাধ্যদেবের কোন লৌকিক গুরু ছিলেন বলিয়া আমর! জানি 

না। লৌকিক গুরুর প্রয়োজনীঘ়ত। তিনি স্বীকার করিলেও উহা! যে 
সকলের জন্যই অবশ্য প্রয়োজনীয় এ কথা তিনি মানিতেন না। 
দীক্ষা ও গুরুকরণ সম্বন্ধে তিনি বলিতেন “মহাপুরুষ যেমন গুরু হইতে 
পারেন, তদ্রপ নিজের আত্মাও গুরু হইতে পারে ।” গীতার নিম্ন- 
লিখিত কথ৷ বিশ্বাস করিলে লৌকিক গুরুর অপরিহাধ্যতা সকলের 
সম্বন্ধে থাটে ন।&. 

শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোহভিজায়তে ॥ 

দঃ রং নী 
অথব। যোগিনীমেব কুলে ভবতি ধীমতাম্‌ ॥ 
৪ 


(৫০ ) 


তত্র তং বুদ্ধিমংযোগং লভতে পৌর্ধবদেহিকম্। 
যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধ কুরুনন্দন ॥ 
পূর্ববাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হৃবশোইপি সঃ। 
জিজ্ঞান্থরপি যোগস্ত শব্বব্রদ্ধাতিবর্ততে ॥ 
অর্থাৎ যোগত্রষ্ট ব্যক্তি শুচি ও শ্রীমানের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন 
অথবা ধীমান্‌ যোৌগীর কুলে । সেখানে পূর্ববদেহে লন্ধ বুদ্ধিসংযোগ 
লাভ করিয়। পুনর্বার সিদ্ধির জন্য সাধনা করিতে থাকেন। পূর্ববা- 
ভ্াসানুসারে নিজের স্বাধীন প্রচেষ্টা বাতীতও তাহার চিত্ত 
ভগবদভিমুখী হয় এবং তবজিজ্ঞান্থ হওয়। মাত্র তিনি কাম্যকর্মের 
অতীত ত্রহ্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েন । 
অতএব যোগত্রষ্টদ্দের পক্ষে এ জন্মে লৌকিক গুরুর দরকার 
নাও হইতে পারে। 
কাহারও কাহারও অনুমান যে তিনি সিদ্ধ মহাত্মা সোনা- 
ঠাকুরের মন্ত্রশিগ্ ছিলেন; কোন এক ঘটন৷ উপলক্ষে তিনি 
আমাকে বলিয়াছিলেন যে সোনাঠাকুর তাহাকে এক মন্ত্র জপের 
উপদেশ দিয়াছিলেন বটে, তবে তিনি তাহা অল্পদিনই জপ করিয়া- 
ছিলেন। দীক্ষা গ্রহণ করিয়া গুরুকরণ হইলে এ ব্যাপার সম্ভব 
হইত না। 
আত্মাই ছিল তাহার গুরু, এবং আত্মায় সমাহিত হইয়াই 
তিনি পরমধামে গমন করিয়াছেন, আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন 
আশীর্বাদ ও উপদেশ; উহাতে. বিশ্বাস রাখিয়া স্থাপ্রতিষ্ঠ হইতে 
পারিলেই আমরা তাহার নাম উচ্চারণ করিবার ও তাহার গৌরবে 
গৌরবান্িত হওয়ার যোগ্যতালাভ করিব । 
গু শান্তি! শাস্তি! শান্তিঃ 


শিষ্য সঙ্গে (২) 


ছাত্রজীবনে ছুই বৎসর কালমাত্র আচাধ্যদেব জগদীশ মুখো- 
পাধ্যায়ের সান্নিধ্যে বাস, তাহার চরণপ্রাস্তে বসিয়া উপদেশ শ্রবণ 
ও ঘনিষ্ঠভাবে তাহার জীবনধারা পধ্যবেক্ষণ করিবার সৌভাগ্য 
লাভ হইয়াছিল। ততৎ্পরে, মাঝে মাঝে তাহাকে দর্শন করিতে, 
তাহার সংস্পর্শ হইতে জীবনগঠনোপযোগী নৈতিক ও আধ্যাত্মিক 
শক্তি আহরণ করিতে, নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক জীবনের 
নানাবিধ সমন্যার সমাধান করাইয়া লইতে, তাহার নিকটে উপস্থিত 
হইয়াছি; কিন্তু একসঙ্গে বহুদিন তাহার প্রভাবের ভিতরে 
অবস্থান করিবার স্বযোগ আর হয় নাই। কিন্তু গাত্রজীবনের 
এ ছুই বত্সর আমার পর্রবাজীন জীবনপাধনার দিক্‌ হইতে যে 
কত মূল্যবান, চিত্তবিকাশের স্তরে স্তরে ক্রমশঃই তাহা গভীরতর 
ভাবে উপলন্ধি করিয়াছি। অপরকে তৎসন্বন্ধে কোন ধারণা দেওয়! 
আমার পক্ষে সম্ভব নয়। 


সেই ছুই ব্সরের পরে ২৫ বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে, অনেক 
অবান্তর বিষয়ের স্মৃতি স্বাভাবিক নিয়মান্ুসারে অবশ্যই অস্পষ্ট 
হইয়া গিয়াছে । কিন্তু আচারধ্যদেব সম্বন্ধে অনেক ক্ষুদ্র সুত্র বিষয়ের 
স্বৃতিও যেন শছ্যোদৃষ্ট ব্যাপারের স্থৃতির ন্যায় উজ্জ্লভাবে চিত্তক্ষেত্রে 
আত্মপ্রকাশ করিতেছে । তাহার অনেক উপদেশ, অনেক ব্যবহার, 
অনেক কাধ্যকলাপ আমার চিত্তববিকাশের বিভিন্ন স্তরে পুনঃ পুনঃ 
স্বৃতিপথারুঢ় হইয়া নৃতন নৃতন অর্থ ও ভাবসম্পদ লইয়া প্রকাশ 


(৫২ ) 


পাইয়াছে, হয়ত বা সেই নৃতন অর্থবস্তার প্রতিক্রিয়ায় কিঞ্চিৎ, 
রূপাস্তরিতও হইয়া থাকিতে পারে। তাহার সেই সময়ের অনেক 
কথা এখনও কাণে নৃতন স্থরে বাজে, অনেক কাধ্যকলাপ এখনও 
চোখের উপর জীবস্তভাবে ভাসে। তৎ্সঙ্গে ইহাও ন্বীকাধা 
যে, বু কথার মম্ার্থই মাত্র হৃদয়কে দখল করিয়া আছে, ঠিক 
তাহার মুখের ভাষা পৃরোপুরি স্মরণ নাই। এই অবস্থায় যতদূর 
সম্ভব, তাহার সেই কাল সম্বন্ধে আমার স্বৃতিটি অংশতঃ লিপিবদ্ধ 
করিতে চেষ্টা করিব। এমন অনেক কথা আছে, যাহ! আমার 
নিজ জীবনের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং যাহা এখন পধ্যস্ত 
আমার প্রকাশ করিবার অধিকার বা ইচ্ছা নাই। তদ্ব্যতীত, 
প্রকাশযোগ্য যাহা আছে, তন্মধ্যেও একটি প্রবন্ধে আর কয়টা 
কথাই বা লেখা যাইবে ? 

যখন গ্রামের স্কুলে পড়ি, তখন বরিশালের তিন জন আদশ 
পুরুষের নামের সহিত পরিচিত হই--অশ্থিনীকুমার, কালীশচন্দ্র ও 
জগদীশ । বরিশাল-সন্বন্ধীয় তাৎকালিক বালকোচিত ধারণার সঙ্গে 
এই তিন জন মহাপুরুষের চিন্তা জড়িত হইয়৷ গিয়াছিল। এখনও 
বরিশালের স্বতির সঙ্গে এই তিন জনের স্বথৃতি অবিচ্ছিন্নভাবে 
জড়িত হইয়া আছে। আমার শিক্ষকগণের মধ্যে কেহ কেহ 
তাহাদের ছাত্র ছিলেন । ততিন্ন, গ্রামের অনেক শিক্ষিত ভদ্রলোক 
তাহাদের ছাত্র বা ছাত্রকল্প ছিলেন। তাহাদের মুখে নানা কথ। 
শুনিয়। শুনিয়! বালস্থুলভ কল্পনার সাহায্যে বরিশাল, বরিশালের 
ব্রজমোহন বিদ্যালয় এবং উক্ত আদর্শ শিক্ষকত্রয় সম্বন্ধে একট] ধারণা 
করিয়া লইয়াছিলাম। তাহার ফলে আমার নিজ জেল! (ফরিদপুর ) 
'অপেক্ষাও বরিশাল যেন অনেকটা আপন হইয়। পড়িয়াছিল, বরিশালের 


(৫৩ ) 


আবহাওয়াই যেন সত্য-প্রেম-পবিত্রতা মাখা মনে হইয়াছিল, বরিশালে 
শিক্ষা্দীক্ষা লাভ একট! বিশেষ সৌভাগ্য বলিয়া বোধ জন্মিয়াছিল। 

স্থলজীবনে পড়ার ভিতরে পণ্ডিত কালীখচন্দ্রের “সংস্কৃতপ্রবেশ 
ব্যাকরণ” সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ লাভে সহায়ক হইয়াছিল বটে, কিন্তু 
তাহার যে সব কাধ্যকলাপের কথ৷ শুনিয়া! গ্রাণ উদ্দীপ্ত হইয়। উঠিত, 
তাহার কোন নিদর্শন অবশ্য উহার মধ্যে পাইতাম না। কিন্তু সেই 
সময়ে,_-যৌবনারস্তের অব্যবহিত পূর্ববীবস্থায়--ভক্তবীর অশ্থিনী- 
কুমারের 'ভক্তিযোগের” সহিত বুদ্ধি ও হৃদয়ের সংযোগ এখনও 
জীবনের একটা প্রকাণ্ড সৌভাগ্য ও ভগবানের বিশেষ কৃপা বলিয়া 
অনুভব করি। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের কণ্টকন্বর্ূপ বহু 
প্রলোভন ও বিদ্ববিপত্তি হইতে আত্মরক্ষা করিবার প্রেরণা ও শক্তি 
এই 'ভক্তিযোগ? হইতে লাভ করিয়াছি । ভক্তিযোগের প্রকাশক- 
বূপে আচাধ্য জগদীশ একটি ভূমিক। লিখিয়াছিলেন, তদ্যতীত তাহার 
আর কোন লেখ! পাঠ করিয়াছি বলিয়! মনে হয় না। 

মহাত্ম! অশ্বিনীকুমার তৎকালে দেশব্যাপী জাতীয় আন্দোলনের 
এক প্রভাবশালী নেতা । তীহাঁর কাধ্যকলাপ দেশবিদেশে সর্ববত্তই 
আলোচিত হইত। এই সব আলোচনার মধ্যে কখন কখন অশ্বিনী- 
কুমারের ব্যক্তিগত জীবনের কার্য্যকলাপ সম্বন্ধে কিছু কিছু বিরুদ্ধ 
সমালোচনাও কাণে আদিত। কিন্তু দেখিয়া বিস্মিত হইতাম যে, 
কথাপ্রসঙ্গে যখনই জগদীশবাবুর কথা উঠিত, তখন “কুকথায় পঞ্চমুখ, 
ব্যক্তিগণেরও* মস্তক শ্রদ্ধায় নত হুইয়া পড়িত। তার কথা আলাদা, 
বলিয়া তাহাকে যেন সকল প্রকার সমালোচনার উর্ধে রাখিয়া দেওয়া 
হইত। তাহাদের এই প্রকার ভাব দেখিয়া মনে হইত যে, জগণ্দীশ- 
বাবু এমন একজন মানুষ, ধাহার চরিত্রে কোন কালিমা স্পর্শ করিতে 


(৫৪ ) 


পারে না, যাহার লোকোত্তর চরিত্রের প্রভাবে বিশ্বনিন্দুকের! পথ্যস্ত 
তাহার মধ্যে নিন্দনীয় কিছু খুঁজিয়া পায় না কিংবা কোন নিন্দনীয় 
কাধ্য তাহার উপর আরোপ করিতে সাহস পায় না। তখন ধারণা 
হই'ত যে, অশ্বিনীকুমারের বিবৃত ভক্তিযোগের সম্যক আদর্শটী সম্ভবতঃ 
এই জগদীশবাবুর মধ্যেই নিখুঁত মৃত্তি পরিগ্রহ করিয়াছে । এইরূপ 
আলোচন। ও চিন্তার ফলে সেই কৈশোর জীবনেই হৃদয়টী তাহার 
দিকে আকৃষ্ট হইয়াছিল, অজ্ঞাতসারেই যেন তাহার সহিত প্রাণের 
একট। নিবিড় যোগ স্থাপিত হইয়াছিল, তাহার নিকট শিক্ষাদীক্ষা 
লাভ করিতে ও তাহার আদর্শে জীবনটা গঠন করিতে একটা প্রবল 
আগ্রহ জন্মিয়াছিল ! 

১৯৬ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দারিদ্রের 
নিগ্রহে সেই আগ্রহ বিসজ্ন দিলাম । আহার-বাসস্থানের কিঞ্চিৎ 
সথবিধার দিকে লক্ষ্য করিয়া ময়মনসিংহ সিটী কলেজে পড়িতে 
আসিলাম। কিন্তু করুণাময় জীবনদেবতা অন্তরের আকাজ্জাটা মঞ্জুর 
করিয়া আমার অজ্ঞাতসারে স্থব্যবস্থাই করিয়। রাখিয়াছিলেন। যে 
স্ববিধার দিকে লক্ষ্য করিয়া ময়মনসিংহ আসিয়াছিলাম তাহা মিলিল 
না। তখনই অপ্রত্যাশিত ভাবে বরিশাল যাওয়ার বন্দোবন্ত 
হইয়া গেল। অনাত্বীয় বা অপরিচিত লোকের মধ্যে থাকিতে 
হইলে, বরিশালে থাকাই সর্বাপেক্ষা ভাল,--এ সম্বন্ধে আত্মীয়-স্বজনগণ 
সম্পূর্ণ একমত ছিলেন, যেহেতু ব্যারামপীড়া হইলে সেখানে বাড়ী 
অপেক্ষাও অধিক যত্বের সহিত চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রুধ। হয় বলিয়! 
সকলেই জানিতেন। বরিশালবাঁসী একজন অপরিচিত ভদ্রলোক 
ময়মনলিংহ হইতে বরিশাল যাইতেছিলেন, তাহার সঙ্গ লইয়া 
বরিশাল চলিলাম। এইভাবে বরিশাল যাওয়া আমি আমার 


(৫৫ ) 


ক্ষুদ্র জীবনের একটা বড় ঘটনা বলিয়া স্মরণ করি। আমার 
ংসারাম্থগত প্রযত্ব ব্যর্থ করিয়া ভক্তিযোগের একটি উতৎ্সমুখে নিয়া 
যাওয়ার এই অপ্রত্যাশিত ব্যবস্থার মধ্যে ভগবানের কতখানি করুণ। 
নিহিত ছিল, তাহ! তখন যতটুকু হৃদয়ের আবেগে অনুভব করিয়া- 
ছিলাম, এখন বিচার দ্বারা তদপেক্ষা অনেক তেশী অনুভব করি। 
এই প্রকার কয়েকটা বিশেষ ঘটনার স্বতি অনেক সময় মনে 
করাইয়া দেয়, 
«করুণা তোমার কোন্‌ পথ দিয়া কোথা নিয়া যায় কাহারে, 
সহসা দেখিন্থ নয়ন মেলিয়! এনেছ তোমারি দুয়ারে? । 

সেই ভদ্রলৌকটির সাহায্যে একটা এঠিকাবাসায়, আহার ও 
বাসস্থান নির্দিষ্ট করিয়া কলেজে ভর্তি হইলাম । পণ্ডিত মৃহাশয় 
ক্লাসে সংস্কৃত পড়াইতেন। আচাধ্যদেব লজিক পড়াইতেন এবং 
প্রতি রবিবারে বেলা একটার সময় প্রধানত: প্রথম বার্ষিক শ্রেণীর 
ছাত্রদের জন্যই গীতা ব্যাখ্যা করিতেন। অশ্বিনীবাবু তখন 
কলেজে পড়াইতেন ন1। পুরাতন ছাত্রদের নিকট হইতে 
তাহাদের চরিত্র ও কাধ্যকলাপ সম্বন্ধে ক্রমশ:ই নান! কাহিনী শ্রুতি- 
গোচর হইতে লাগিল। তাহাদের জীবন ও ব্যবহারের টৈশিষ্ট্য 
কিছু কিছু লক্ষ্যও করিতে লাগিলাম। তাহাদের সান্লিধ্যলাভ 
বস্ততঃই মৌভাগ্য বলিয়া অনুভব করিলাম। ছাত্রগণের প্রতি 
তাহারা যেরূপ নিতান্ত আপনজনের মত ন্মেহমম্তাযুক্ত ব্যবহার 
করিতেন, এবং ছাত্রগণ যেরূপ অসঙ্কোচে ঘনিষ্ঠভাবে তাহাদের 
সহিত মিশিত ও খোলা প্রাণে কথাবার্তী বলিত, তাহা দেখিয়া 
মুগ্ধ হইতাম । এখানে যেন ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে কোন 
ব্যবধান নাই । 


€ ৫৬) 


প্রায়ই দেখিতাম, পণ্ডিত কালীশচন্দ্র খালি গায়ে, খালি পায়ে, 
দুই হাতের নীচে ছয় সাতটি ছাত্রের কাধ চাপিয়া ধরিয়া, হাঁসি 
ও কথার ঢেউ তুলিয়া, শ্মশানখোলা বা কাশীপুরের রাস্তার দিকে 
চলিয়াছেন, আগে পিছে আরও ছাত্রের বহর চলিয়ছে। ছাত্রদেরও 
কি আনন্দ! কখন দেখিতাম, হয়ত শ্বাশানখোলারহই কোন 
অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার স্থানে এক ছাত্রের উরুর উপর মাথ! রাখিয়া, 
ছুই ছাত্রের ছুই কাধে ছুই পা তুলিয়া দিয়া, দুই পার্খে দুই ছাত্রের 
কাছে হাত ছু"খানি টিপিতে দিয়া, তিনি শুইয়। আছেন, চারিদিকে 
আরও অনেক ছাত্র ক্ষতি করিতেছে । মাঝে মাঝে হঠাৎ উঠিয়। 
কাহারও নাক মুলিয়া, কাহারও কাণ মলিয়া, কাহারও পিঠ 
চাপড়াইয়া দ্রিতেছেন। এই সব আনন্দের খেলার মধ্যেই কত 
উপদেশ চলিতেছে, তাহার নিজ্জের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বর্ণন! 
হইতেছে, তাহার পুরাতন ছাত্র ও সহকন্্ীদের বোগিসেব। প্রভৃতি 
কার্যের প্রশংসা হইতেছে । অশ্বিনীবাবু সারা ভারতবর্ষের মধ্যে 
কত বড় একটা বিবাটু পুরুষ বলিয়! জানিতাম। বাসায় গিয়া 
দেখিতাঁম, হয়ত তিনি “ফরাসে বসিয়া কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে 
একটা! বড় থালায় তৈল দিয়া মুড়ি খাইতেছেন, মাঝে মাঝে 
কাড়াকাড়িও করিতেছেন, আর ছাত্র-শিক্ষকের হাসির রোলে সমস্ত 
বাঁড়ীট1! যেন মুখরিত হইতেছে; সামনে চেয়ারে হয়ত অনেক 
বিশিষ্ট ভদ্দলোক বনিয়। আছেন, তাহাদের সঙ্গেও কথাবার্তা 
হইতেছে। নিয়শেণীর হিন্দু মুললমান কয়েকজন লোক হয়ত গ্রাম 
হইতে সহরে আসিয়া! “বাবুকে” একবার শুধু দর্শন করিয়া ুতার্থ 
হইয়া যাইবার জন্ত উপস্থিত হইয়াছে, তাহাদিগকেও আপ্যায়িত 
করিতেছেন। সকলের সঙ্গেই যেন প্রাণের একটা মাখামাখি 





সেবাত্রত কালীশচন্দ্র 





( ৫৭ ) 


প্রকাশ পাইত। তিনি কত বড় লোক, আর আমি কত ক্ষুদ্র,--প্রথম 
আলাপেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি এই সঙ্কোচ ও ব্যবধান 
দূর করিয়া দিতেন । এই সব ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গেই গভীর বিষয়ের 
আলোচনাও হৃইত। শিক্ষা, ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহান, কিছুই 
বাদ যাইত ন।। 

ছাত্রদের সঙ্গে এই যে একট সখ্যভাবের খেলা, এট। ব্রঙ্মমোহন 
বিদ্যালয়ের আরও অনেক শিক্ষকের মধ্যে অল্লাধিক পরিমাণে লক্ষ্য 
করিতাম। কিন্তু এতখানি মেলামেশার ভাব আচার্য জগদীশের 
ব্যবহারে দেখিতাম না। তাহার সকল ব্যবহারের মধ্যে একটি 
প্রসন্ন গাম্তীষ্য লক্ষিত হইত । তাহার সকল কথা, সকল হাবভাব, 
সকল আচরণের মধ্যে সর্বদাই একটি স্িগ্ধ মধুর প্রশান্ত সৌন্দর্যোর 
বিকাঁশ হইত। হাসি ঠাট্টা রসিকতাও তিনি করিতেন না, তাহ 
নয়, আপন সন্তানের ন্যায় কোলের কাছে টানিয়া নেওয়ার ভাব 
তাহার ব্যবহারেও প্রকাশ পাইত, কিন্তু সবই একটু গাস্তীরধ্যমাখা 
দেখা যাইত । কোন ভাবেরই উদ্বেলত। তাহার মধ্যে দেখিতাম 
না। তাহার চোখের দিকে চাহিলে অনেক সময় মনে হইত, 
তিনি যেন ছুইটি জগতের মাঝখানে থাকিয়া উভয়েরই সহিত যোগ 
রক্ষা করিয়া জীবনের সব কর্ম চালাইয়া যাইতেছেন,--একটি 
ইক্িঘগ্রাহ জগৎ ও একটি অতীন্দ্রিয় জগৎ | 

পরবস্তীকালে কোন এক সময় কথাপ্রসঙ্গে তিনি আমাদের 
মনশ্চক্ষুর উপরে একটি চিত্র অঙ্কিত করিয়। দিয়াছিলেন,--সম্মুখে 
দিগন্তবিস্তৃত বাত্যাবিক্ষবধ উত্তালতরঙ্গময় হিংশ্রজস্তস্মাকুল ভীষণ 
সমুদ্র। তার পরপারে, স্থির নিশ্চল নির্বিকার অনস্ত মহাকাশের 
কোলে মহামহিমময় সবিতৃদেব বিশ্বের সর্ধত্র আপনার কিরণমালা 


(৫৮ ) 


বিকীরণ করিয়া বিরাজমান । একটি মানুষ সেই সমুদ্রের বেলা- 
ভূমিতে দ্াড়াইয়া আছে। তাহার দৃষ্টি সমুদ্র অতিক্রম করিয়। 
সবিতুদেবের দিকে অপলকভাবে নিবদ্ধ । সবিতৃদেব আপনার কিরণ- 
মাল! বিস্তার করিয়৷ সমুদ্রের নানাকারে আকারিত তরঙ্গসমূহকে 
কত বিচিত্র শোভায় সৃসজ্জিত করিতেছেন,__মাঝে মাঝে দৃষ্টি নত 
করিয়া তিনি তাহা আন্বাদন করিতেছেন। যাহারা সমুদ্র মধ্যে 
নিপতিত হইয়া তরঙ্গাঘাতে জজ্জরিত হইতেছে, তাহাদের যন্ত্রণা! 
দেখিয়। মাঝে মাঝে তাহার চিত্ত ব্যথিত ও করুণাধুত হইতেছে । 
সমুদ্র তরঙ্গ মস্তক উত্তোলন পূর্বক ভীমবেগে তাহার দিকেও অগ্রসর 
হইয়া! কিছুদূরে থাকিতেই যেন অবসাদগ্রস্ত হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে, 
এবং তাহার পদ স্পর্শ করিয়াই ফিরিয়া যাইতেছে, তাহাকে বিন্দু- 
মাত্র টলাইতে পারিতেছে না, গ্রাস করা ত দূরের কথা। সমুদ্রের 
ভিতরে যে কত হিংস্র জন্তর লড়াই, কত হত্যাকাণ্ড, কত 
ছুর্বলের উপর প্রবলের অত্যাচার, কত আর্তনাদ হাহাকার 
অনবরত চলিতেছে, তাহা তাহার দৃষ্টির মধ্যেই আসিতেছে না। 
মায়া-সাগরের তটদেশে জ্ঞানী ভক্তগণ ভগবানের দিকে দৃষ্টি স্থির 
রাখিয়া এইভাবেই অবস্থান করিয়া থাকেন। আচাধ্য জগদীশের 
নিজের জীবন দেখিয়া যে ভাবটি মনে উদ্দিত হইত, তাহা! 
অনেকট। এই প্রকার। তিনি যেন সংসার সমুদ্রের বেলাভূমিতেই 
থাকিতেন, ভিতরে কখন ধর! দিতেন না। 

ক্রমশঃ মাঝে মাঝে আচাধ্যদেবের বাসায় যাইতে আরম 
করিলাম । তাহার বাসায় তখন কয়েকখানা ছোট ছোট কুটির 
মাত্রই ছিল, -গোলপাতার ছাউনি, কাচা ভিত। চারিপার্থেই লঙ্বা 
লম্বা গাছ। কতকটা সর্যাৎসেঁতে ও ছায়ায় ঢাকা। কাচা পুলের 


(৫৯ ) 


উপর দিয়৷' বাসায় ঢুকিতে, অনত্যস্ত লোকদের খালে পড়িবার 
কিছু আশঙ্কাও ছিল। তখনও ছাত্রদিগকে লইয়াই তিনি থাকিতেন। 
তাহার শয়ন গৃহের ছোট বারান্দায় অর্ধাংশে একখান তক্তাপোষ, 
অপরাদ্ধে একখান। অর্দহস্ত প্রশস্ত বেঞ্, ও একখান! সাবেকী 
আমলের অগ্ধভগ্র বাশের মোড়া । এই মোড়াটাই তাহার আসন 
ছিল। আগন্তকগণ, ছাত্রই হউক কিংবা বিশিষ্ট সম্ত্রান্ত ভদ্রলোকই 
হউন, কেহ পার্খস্থ বেঞ্চে, কেহ বা সন্মুখস্থ তক্তাপোষে বসিতেন। 
ঘরের ভিতরে তাহার শুইবার খাটখান। একটু উচু ছিল, এবং তাহার 
সঙ্গে সংলগ্ন নীচু একখান। তক্তাপোষ ও ছোট একটি টেবিল। 
টেবিলের উপর ২৪ খান! বই, ২১ টা ওঁধধের শিশি, ইত্যাদি দেখা 
যাইত। ঘরের অপরার্ধে আর একখান! তক্তাপোষ ছিল। তাহার 
শধ্যাসংলগ্ন তক্তাপোষখানি ব্যতীত আর সবগুলিই ছাত্রদের শয়নের 
জন্য ব্যবহৃত হইত । তিনি খন ঘরের ভিতরে থাকিতেন তখন 
তাহার বিছানাই বসিবার আসন, আগন্তকগণ তক্তাপোষ ছ"খানি 
অধিকার করিতেন। আমর! ছাত্রাবস্থায় যতদিন ছিলাম, এইরূপ 
ব্যবস্থাই দেখিয়াছি, মোড়াটীরও পরিবর্তন হয় নাই, যদিও বেতের 
বাধ অনেকস্থানেই খুলিয়া গিয়াছিল। তাহার গোলপাতার ঘর 
পরবর্তীকালে ভক্তগণের আগ্রহে ও মহান্ুভবতার ইষ্টকালয়ে উন্নীত 
হওয়ার পরেও আসবাবপত্র প্রায় পূর্ববত্ই ছিল। মোড়াটা আতি- 
মাত্রায় জীর্ণ হইয়া! সম্পূর্ণ অব্যবহাধ্য হইলে তাহাকে সরাইয় 
একখান অপেক্ষাকৃত আধুনিক আকারের বেতের মোড়! তাহার 
স্থান দখল করে, এবং অনেককাল পরে (সম্ভবতঃ তাহার অনুস্থা- 
বস্থায়) একখানা আরাম কেদারা আসিয়া তাহাকেও স্থান ভ্রষ্ট 
করে। তিনি জ্ঞান ও ভাবের রাজ্যে যেমন অসাধারণ পুরুষ 


(৬০) 


ছিলেন, ভোগ ও ব্যবহারের রাজ্যে তেমনি নিতান্তই সাধারণ 
ছিলেন। 

আচাধ্যদেবের জীবনের আদর্শে এ স্থানের ছাত্রগণের জীবনও 
একটু নৃতনভাবে গড়িয়া উঠিত। বাড়ীটি একটু স্টাৎসেতে ও 
বর্ধার দিনে কিছু কাঁদা হয় বলিয়।, পুলের গোড়া হইতে আরম্ত 
করিয়া বাড়ীর ভিতরে প্রায় অপর সীম! পর্যযস্ত, ইট শুরকী দিয় হাত 
দেড়েক প্রশস্ত একটি রাস্তা কর! হইয়াছিল। জানিলাম, ছাত্রেরাই 
ইউখোলা হইতে মাথায় করিয়া ইট শুরকী বহিয়া আনিয়া 
নিজেরাই রাস্তা তৈয়ারী করিয়াছে । বাড়ীর আগাছা তুলিয়া 
ফেলিয়া ও ঝাট দিয়! পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও স্থাস্থাকর অবস্থার 
রাখ! ছাত্রদেরই কাধ্য। মাঝে মাঝে ঘর লেপ দেওয়া, ভিত্‌ 
খসিয়] পড়িলে মাটি কাটিয়া সমান করা-_-সবই তাহাদিগকে করিতে 
হয়। ন্বয়ং আচার্্যদেব ছোট কাপড় পরিয়া, মাথায় গাম্ছা 
জড়াইয়া, নিজে এই সব কাধ্য করিয়৷ ছাত্রদিগকে শিক্ষা দ্রিতেন। 
প্রয্নোজন হইলে পায়খানা পরিষ্কার করিতেও তাহারা কুন্তিত হইত 
না এবং মেথরের মুখাপেক্ষী হইয়। দুর্গন্ধ ভোগ করিত না। 
পায়খানার বেড়! দেওয়া, মেরামত করা--এ সব ত নিজেরাই করিত। 

কয়েকটি ছাত্রেরই বিশেষ উৎসাহে ও উদ্যোগে একটি ঘরে 
শরীশ্রারাধাকৃষ্ণ* যুগলমৃত্তির আমন প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ ভাবে 
কোন না কোন ছাত্রদ্বারা নিত্যই সেখানে পূজা! হইত। প্রতি 
সন্ধ্যায় ছাত্রগণ সেখানে সমবেত হইয়া কিয়ৎকাল* ভজন সঙ্গীত 
করিত। আচাধ্যদেব কোন কোন দ্বিন তাহাদের মধ্যে আসিয়া 
এবং কোন কোন দিন ম্বীয় আসনে বসিয়াই সেই ভজনে 
যোগদান করিতেন। মাঝে মাঝে তিনি তাহাদিগকে ধর্থগ্রস্থ 


( ৬১ ) 


পাঠ ও ব্যাখ্যা! করিয়া শুনাইতেন, এবং তৎ্সঙ্গে তাহাদের 
জীবনগঠনোপযোগী উপদেশ প্রদান করিতেন। যে কোন ছাত্রের 
যে কোন দুর্বলতা বা অসঙ্গত ব্যবহার তাহার দৃষ্টিপথে আসিত 
প্রসঙ্গক্রমে পরোক্ষভাবে তাহা উল্লেখ করিয়া তিনি স্থমিষ্ট ভতখ্সন। 
করিতেন এবং তাহাদের মন্স্তোচিত আত্মগৌরববোধ জাগ্রত 
করিয়া সংশোধন ও উন্নতি সাধনের পথ নির্দেশ করিয়া দিতেন। 
সাক্ষাৎ ব্যক্তিগত শাসন ও উপদেশ অপেক্ষা এই প্রকার শিক্ষাপ্রদান 
অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর ফলগ্রদ হইত । এইরূপ এক এক দিনের 
শিক্ষায় ছাত্রগণ যেন নৃত্তন ভাবের উদ্দীপনা ও নৃতন জীবনী- 
শক্তি লাভ করিত। পূজা ও ভজন তদবধি রীতিমত চলিয়া 
আসিতেছে। ঠাকুরের মৃত্তি এক থাকিলেও আসনের ক্রমশঃ 
উৎকর্ষ সাধিত হ্ইয়াছে। বহুসংখ্যক দেবমৃত্তি ও মহাপুরুযমৃত্তি 
ক্রমশঃ সমাগত হইয়! গৃহখানিকে আদর্শ ভজনালয়ে পরিণত 
করিয়াছে । ইষ্টকনিশ্মিত পাকা মন্দির উঠিয়া ঠাকুরের আসন 
সেখানে পাকাপাকি ভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। আচাধ্যের 
সাধনা, শিষ্কদের সানুরাগ সেবা ও ভক্তদের সমাগম অবলম্বন 
করিয়া ভগবানই ক্রমে ভ্রমে আপনাকে এখানে উজ্জলতররূপে 
প্রকটিত ও দৃঢ়তররূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। বাসা সম্পূর্ণরূপেই 
আশ্রমে পবিণত হইয়াছে । কিন্তু ইহা পরবর্তী সময়ের কথা । 

সেই ভজনগুহে সহরের বহুসংখ্যক ধন্মপিপাস্থ পুরুষ ও 
নারী প্রতি হ্ববিবার প্রাতঃকালে সমবেত হুইতেন। সাধারণত: 
সকালে ৭টা হইতে ১১ট। পধ্যস্ত এই ভক্তসম্মিলনের কার্য চলিত। 
গায়ক ভক্তগণ প্রাণের সকল আবেগ ঢালিয়া দিয় ভগবৎকীর্ভন 
'করিতেন। আচাধ্যদেব কখন কখন বিশেষ বিশেষ ভক্তকে বিশেষ 


(৬২ 9 


বিশেষ গান গাহিতে আদেশ করিতেন। নানাবিধ ধর্মগ্রন্থ পাঠ, 
ব্যাখ্যা ও আলোচনা হইত। আচাধ্যদেব গীতা ও ভাগবত এবং 
কখন বা উপনিষৎ ব্যাখ্যা করিতেন। ভক্তদের হৃদয়ের উদ্বেলতা 
নানাভাবে প্রকাশ পাইত। পণ্ডিত মহাশয়ের দীর্ঘায়ত চক্ষু ছুইটা 
হইতে বড় বড় ফোটা পড়িত, মাঝে মাঝে হুম্কার হইতে 
থাকিত ও শরীর ছুলিতে থাকিত। কাহারও নীরবে অশ্রুপাত, 
কাহারও গাত্রকম্প, কাহারও উচ্চহাস্ত-_নানা! রকমই দেখ! যাইত । 
বলা বাহুল্য, এ সকলের অর্থ তখন কমই বুঝিতাম। কিন্তু একটা 
ভাবের তরঙ্ক সমস্ত স্থানটাকেই যেন আন্দোলিত করিতেছে, ইহ! 
অনুভব করা যাইত। 

আচীধ্যদেবকে দ্রেখিতাম, তিনি একদিকে একটি খুঁটী ঠেস 
দিয়া নীরবে মুদিত নেত্রে স্থিরভাবে বপিয়া আছেন; কোন 
উদ্বেলতা নাই, অঙ্গকম্প নাই, আহ। উহু হুষ্কার কিছুই নাই, 
অনেক সময়েই একথানা হাত কপালে বা মাথায় ঠেকাইয়। 
নিষ্পন্দ ভাবে উপবিষ্ট । মাঝে মাঝে গানের আদেশ বা পাঠের 
আদেশ দিতেছেন। নিজের পাঠের সময় উপস্থিত হইলে, চোক 
মুছিয়। নাঁক ঝাড়িয়া, আসন একটু ব্দলাইয়৷ পুস্তক খুলিতেন। 
চোখ দুটা তখন নবোদ্দিত অরুণের মত দেখ! যাইত, স্বর একটু 
ভারাক্রান্ত বোধ হইত। ব্যাখ্যার মধ্যে কোন বক্তৃতার 
ছট। বা সুরের ঝঙ্কার নাই, কিংবা বাক্যের মধ্যে কোন আবেগ 
পূরিয়া! দেওয়ার চেষ্টা নাই।. অথচ প্রত্যেকটা কথা একদিকে 
যেমন বুদ্ধির সংশয় মিটাইত, অন্দিকে তেমনি প্রাণের গভীরতম 
প্রদেশ স্পর্শ করিত। তাহার ব্যাখ্যা শুনিতে যাহারা অভ্যন্ত 
হইয়া যাইত, অন্ত কাহারও ব্যাখ্যায় তাহাদের আর তেমন 


( ৬৩ ) 


ংশয়চ্ছেদ ১৪ রসান্বাদন হইত না। ইহা এ সব ভক্তদের অনেকের 
মুখেই শুনিয়াছি। ব্যাপার শেষ হইলে তিনি যখন বাহির হইতেন, 
তখন মুদ্তিটী একটু অভিনব ভাব ধারণ করিত। চোখের চাহনী, 
মুখের সৌষ্ঠব, হাটাচলার ভঙ্গী-সবই একটু নৃতন বোধ হইত। 
সে ভাবগুলি এখনও চোখে ভাসে, কিন্ত তাহা বর্ণনার ভাষা নাই। 
বোধ হইত যে, তাহার মনপ্রাণ যেন কোন্‌ জগদতীত প্রদেশে 
বিহার করিতেছে, চোখ যেন কি এক অপূর্ব বস্তু দর্শনের নেশায় 
বিভোর হ্ইয়| আছে, সামনের জিনিষে যেন তাহার নজর 
পড়িতেছে না, সমস্ত শরীরের ভিতর দিয়া আনন্দ যেন উথলিয়া 
উদ্ভিতে চাহিতেছে, গল! দিয়া স্বর যেন বাহিরে আসিতে চায় না, 
অথচ যেটুকু বাহিরে আসে, সেটুকু অতীব মিষ্ট। তাহার ভাবের 
আবেগ তিনি বেশ প্রধত্বের সহিত চাপিয়া রাখিতেন, এবং তাহাতে 
যেন শরীরের উপর একটু ধাক্কা লাগিত বলিয়াও মনে হইত । 
ছাত্রজীবনে এমন একজন মহাপুরুষের সাঙ্গিধ্যে এই প্রকার 
নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আবেষ্টনীর মধ্যে বা করা একটা বিশেষ 
সৌভাগ্য । ইহাতে জ্ঞাতসারে ও অজ্ঞাতসারে চরিত্রের উপর 
একটি স্থাক্ী প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়৷ স্বাভাবিক। যে সব পিতা- 
মাতা বা অভিভাবক ছেলেদের আধ্যাত্মিক অন্থশীলনের জন্য ততটা 
লালায়িত ছিলেন না, তাহারাও মনে করিতেন যে, জগদীশ- 
বাবুর কাছে ছেলেকে রাখিতে পারিলে সে মানুষ হইয়৷ উঠিবে। 
যে সব ছেলেক পিতামাতাও স্থশাসনে রাখিতে পারিতেন না, 
জগদীশবাবুর বাসায় থাকিলে তাহারাও সংযত চরিত্র ও পাঠে 
মনৌযোগী হয় বলিয়া সাধারণের বিশ্বাস ছিল। এই কারণে অনেক 
অভিভাবক সেখানে ছেলে রাখিবার জন্য সচেষ্ট হইতেন। অথচ 


(৬৪ ) 


সেখানে স্থানের অন্নতা বশত: অল্পসংখ্যক ছাত্রের বাসের 
ব্যবস্থ' ছিল। অনেককেই বিফল মনোরথ হইয়া ফিরিয়া যাইতে 
হইত। আচাধ্যদেবের সন্নিকটে একটু স্থান পাইবার জন্য প্রথম 
হইতেই আমার লালসা ছিল, কিন্তু প্রস্তাব করিতে সাহস পাই 
নাই । সেখানকার বিধিব্যবস্থা দেখিয়া লোভ ক্রমশ:ই বাড়িতেছিল। 
ঠিকাবাসায় অনস্থবিধাও বোধ হইতেছিল। একদিন আমার 
একজন শুভাকাজ্ষী বন্ধু আমাকে আচাধ্যদেবের সন্গিধানে নিয়! 
গিয়া প্রস্তাব করিয়! ফেলিলেন। তখন একটি ছাত্র অস্ুস্থৃতা- 
নিবন্ধন ছুটি নিয়া বাড়ী গিয়াছিল। আচাধ্যদেব আমার প্রতি 
বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া বিনা আপত্তিতে প্রার্থন। মঞ্জুর 
করিলেন, এবং এ ছাত্রটার স্থান দখল করিতে বলিলেন, ও 
জানাইলেন যে সে ফিরিয়া আদিলে কোন রকম একট। বন্দোবস্ত করা' 
ঘাইবে। আমার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া গেল। এত সহজে এই 
পবিত্র স্থানে প্রবেশ লাভ হইবে, ইহা কল্পনাই করিতে পারি 
নাই। বরিশালে থাকিয়া জগদীশবাবুর বাসার ছাত্র হওয়া একট! 
উচ্চ অধিকারের মধ্যে পরিগণিত ছিল। 

এই আশ্রমে স্থান পাওয়ার কিছুদিন পরে একদিন অশ্বিনীবাবুর্‌ 
সহিত দেখা করিতে গিয়াছি। তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া যখন 
জানিলেন, আমি জগদীশবাবুর বাসায় থাকি, তখন একট! গাঢ় 
আলিঙ্গন দিয়া বলিলেন, তুই জগদীশের খাস মহালের প্রজা, আঃ 
তবে আর ভাবনা কি? “জগদীশের খাসমহালে” স্থান লাভ কর! 
যে একটা উচ্চ অধিকার, তাহা যেন নৃতন ভাবে অনুভূত হইল। 

এই আশ্রমবাসী ছাত্রদের সেবাব্রতত ও কর্মজীবনের অন্থান্থয 
দিক্‌ হইত্তে ঘে সব বিষয় শিক্ষণীয় ছিল, আমি সে সব বিষয়ে 


(৬৫ ) 


যথোচিত শিক্ষালাভ করিতে পারি নাই, যেহেতু আমার প্রকৃতি 
তাহার অনুকূল ছিল না। আমার স্বভাবে কম্মোদ্যমেরও নিতান্ত 
অভাব ছিল, এবং নিকটবর্তী বন্ধুদের সহিতও বেশী বথাবার্তী। ও 
মেলামেশা করিতে পারিতাম নাঁ। আচার্যদেব মাঝে মাঝে সে 
দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেন, 01050919010 বলিয়া মুছু 
ভতৎ্পনাও করিতেন, “বাংল! ভাষ। ভূলে যাচ্ছনা ত? বলিয়া কখন 
কখন শ্লেষও করিতেন, নিজে দৃষ্টান্ত দেখাইয়া ও আদেশ করিয়। 
কখন কখন ছোটখাট কশ্মের মধ্যে টানিয়া নামাইতেও চেষ্টা 
কবিতেন। আমি আমার ক্রটিগুলি বেশ অনুভব করিতাম। কিন্তু 
“্বভাবং ত্যক্তমিচ্ছামি স্বভাবে! মাং ন মুঞ্চতি”-_কাধ্যক্ষেত্রে আমার 
এইরূপ অবস্থাই দীড়াইত। যাহার ভিতরে তিনি চাঞ্চল্য বেশী 
দ্েখিতেন কিংবা বাহ্যিক কাঁজকম্মের ঝেৌঁকই বেশী লক্ষ্য করিতেন, 
তাহাকে তিনি সংযম ও গ্রশান্তভাবের অনুশীলন করিতে ও পড়া 
শুনায় অধিক মনোযোগী হইতে উপদেশ দিতেন । যাহাকে তিনি 
সত্যধিক মুদুভাবাপন্ন, বাহক কম্মসম্পাদনে নিরুৎসাহ ও প্রয়োজনীয় 
লৌকিক বিষয়ে উদাসীন দেখিতেন, তাহার ভিতরে তেজ, বীর্য, 
উত্সাহ ও কর্মোগ্যম বৃদ্ধি করিতে যত্ববান্‌ হইতেন। জ্ঞানাজ্জনে 
মনোযোগী হইতে হইবে বলিয়। কেহ পুঁথির কীট হইয়া অন্ত সব 
বিষয়ে অন্ধ ব। পদ্ধু হইয়া! থাকিবে, ইহ। তিনি ইচ্ছা করিতেন না। 
দেহ মন বুদ্ধি হৃদয়--সকল দিক্‌ দিয়া পুষ্ট শক্তিশালী ও সজাগ হইয়া 
উঠিবে, ইহাই* তাহার অভিপ্রায় ছিল। একদিন দুইটা বিপরীত 
ভাবাপন্ন ছাত্রকে সন্মুধে আনিয়া বলিলেন দেখ, আমি এই ছুইএর 
মিলন চাই। 


আমার স্বভাবের প্রাতিকুল্যবশতঃ আমি আচাধ্যদেবের এই সব 
৫ 


। (৬৬ ) 


উপদেশ ভক্তিনহকারে গ্রহণ ও আশ্রমবাঁসীদের কাধ্যকলাপ সম্রদ্ধ 
দৃষ্টিতে দর্শন করিলেও, সম্যকৃরূপে তাহা অন্সর্ণ করিতে পারিত্ঃম 
না। কাজেই আশ্রমে থাকিয়াও আমি আশ্রমের স্বাভাবিক জীন- 
ধারা হইতে একটু যেন বিচ্ছিন্ন থাকিতাম। পক্ষান্তরে আচাধ্যদেবের 
নিজন্ব ধন্মজীবনটীই ক্রমশঃ আদর্শরূপে আমার হৃদয় অধিকাঁর করিতে 
লাগিল, তাহার ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার চিত্ত ভ্রমশ:ই আকৃষ্ট 
হইতে লাগিল, তাহার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আচরণগ্তলি অলক্ষিতে লক্ষ্য 
করিতে লাগিলাম, তাহার প্রত্যেকটী উপদেশ প্রাণের মধ্যে অমূল্য 
সম্পদ্‌্রূপে রক্ষা করিতে যত্ববান্‌ হইলাম। তাহার সম্মুখে বসিয়। 
প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া উপদেশ নেওয়া কমই হইত, কিন্তু তীহাঁর 
কথাবার্তা ও চলাফেরার দিকে সর্বদাই একট। নজর থাকিত। সেই 
ছাত্রজীবনে তাহার নিকট হইতে যাহা কিছু সংগ্রহ করিয়াছি, 
এই অধ্যাপকজীবনে তাহার মুল্য ক্রমশঃ বেশীমাত্রায় উপলব্ধি 
করিতেছি, এবং এখনও নিজের জীবন গঠনে ও ছাত্রদিগকে উপদেশ 
প্রানে তাহার স্মরণ ও সাহায্য গ্রহণ বুল পরিমাণে আবশ্যক 
হইতেছে । সেই সমম্নের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার উপর কালের 
প্রভাব কোন প্রকার আবরণ স্ষ্টি না করিয়া বরং তাহাদিগকে 
উত্তরোত্তর উজ্জলতর করিয়া তুলিয়াছে। বাহিক কর্শের দিকেও 
যে প্রেরণা তখন স্বভাবের বিরুদ্ধত| অতিক্রম করিয়া কাঁধ্যকরী হইতে 
পারে নাই, তাহাও যে স্ক্সভাবে জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার 
করিতেছিল, ইহা! অন্বীকার করিবার উপায় নাই। শুবিদ্যৎ জীবনে 
সে প্রভাব কতক পরিমাণে উপলব্ধি করিয়াছি । 

প্রায় প্রত্যহই সন্ধ্যাবেলা আচার্যদেব্র নিকটে ছুগ্চার জন 
অন্ধালু লোকের সমাগম হইত। তন্মধ্যে বালক, যুবক, বৃদ্ধ, কম্ধা, 


( ৬৭ ) 


জ্ঞানী, ভক্ত, সব শ্রেণীর লোকই দেখা যাইত। তিনি কখন 
বারান্দায় তাহার অদ্ধভগ্ন মোড়াটার উপর, কখন বা তাহার শষ্যার 
উপর বসিয়া তাহাদের সহিত আলাপ ও আলোচনা করিতেন। 
সেই সান্ধ্য আসরে নানাজাতীয় আলোচনাই শ্তনিতে পাইতাম, 
ধন্মতত্ব, কম্মনীতি, দেশসেবা, সমাজসেবা, জাতি ও সমাজের অবস্থ। 
ও তাহার প্রতিকার, বিজ্ঞান, দর্শন, হত্যাদি। বাজে কথাণ্ড ষে 
হইত না তাহা নহে। যখন উপস্থিত ভদ্রলোৌকদের মধ্যে নিরর্থক 
অবান্তর বিষয়ের আলাপ আরম্ভ হইত, তখন তিশি সাধারণতঃ 
চুপ করিয়া! থাকিতেন, কিংবা তাহার! চিন্তে বেদন। বোধ করিতে 
পারে এই আশঙ্কায় ছু একটা কথায় যোগ দিয়। তাহাদের মনোরঞ্জন 
করিতেন। উহার ওুঁদাসীন্ত বা অন্তমনস্কতার ভাব দেখিলেই 
তাহাদের খের়াল হইত, ধে উদ্দেশ্যে এই মৃহাপুরুষের নিকটে 
তাহারা সম্মিলিত, তাহা যেন ব্যর্থ হইতেছে বলিয়া অনুভূতি 
হইত, তাহার এত সান্নিধ্যে আসিয়াও তাহাকে যেন দূরে ঠেলিয়! 
দেওয়া হইতেছে মনে করিয়! একটু লজ্জাবোধ জন্মিত। তখন 
তাহারা হয়ত চুপ করিয়| জিজ্ঞাস দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে 
তাকাইত, অথব। পূর্বপ্রসঙ্দ অবলম্বনেই কোন বিষয়ের তাৎপধ্য 
জিজ্ঞাসা করিয়া তাহাকে যেন দূর হইতে কাছে টানিয়া আনিত। 
তিনিও অনেক সময় তাহাঁদের আলোচ্য বিষয় ধরিয়াই উপদেশ দিতে 
আরম্ভ করিতেন। কখন কখন অতি সাধারণ লৌকিক বা সাংসারিক 
কথা হইতে জারস্ত করিয়া আস্তে আস্তে অতিশয় জটিল রহস্তপূর্ণ 
আধ্যাত্মিক তত্বের গভীর গবেষণায় প্রবৃত্ত হইতেন। 

এই সব আলোচন! সাধারণতঃ এমন স্বচ্ছধারায় প্রবাহিত হইত, 
এমন আড়ম্বরবিহীন স্বাভাবিক কথাবার্তার ভিতর দিয়া অগ্রসর 


(৬৮ ) 


হইতে থাকিত যে, ইহার মধ্যে আচাধ্যের ন্যায় উচ্চানন হইতে 
তত্বোপদেশ দেওয়ার ভাব, পণ্ডিতের ন্তায় শাস্ত্র ব্যাখ্যান ও যুক্তি- 
জাল বিস্তারের পারিপাট্য, কিংবা শ্রোতাদের বুদ্ধিশক্তির অল্পতার 
প্রতি কোনরূপ করুণা বা অবজ্ঞার ভাব কখনই প্রকাশ পাইত 
না। অথচ এক একটি বিষয়ে এই প্রকার সরল ও অকৃত্রিম 
আলোচনার মধ্যেও কত সময় কত শাস্ত্রের অবতারণ! হইত, কত 
তর্কযুক্তির প্রবাহ চলিত, জড়বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা হইতে কত 
ৃষ্টান্তের আমদানী হইত, পাশ্চাত্য দর্শন ও প্রাচ্য দর্শনের কত 
মত মতান্তরের উল্লেখ হইত । কিন্তু তিনি প্রত্যেক কথার মধ্যে 
এমন একটি প্রাণ প্রতিষ্টা করিতেন ও এমন একটি মধুর রদ ঢালিয়া 
দিতেন যে, সবট1 যেন একটি সরল ও জীবন্ত গল্পের মত শুনাইত। 
যখন এক একটি আলোচনা! সিদ্ধান্তে গিয়। পৌছিল, তারপর 
বিচার করিলে বোঝা যাইত, যে, কত বড় কঠিন সমস্যার সমাধান, 
কত স্ুক্ম জটিল রহস্যের মীমাংসা, কেমন স্থন্দর সরস ও সরল- 
ভাবে বুদ্ধি ও হৃদয়ের দ্বারে তিনি উপস্থিত করিয়াছেন। মনে 
মনে যতই তাহা রোমস্থন করিবার চেষ্টা কর! যাইত, ততই তাহার 
অগাধ পাগ্ডিত্যের সহিত ব্যাখ্যাননৈপুণ্য ও প্রাণের সরলতার কথা 
ভাবিয়া মুগ্ধ ও অভিভূত হইতে হইত । 

তাহার পাণ্ডিত্যের পরিমাণ করিবার শক্তি আমার ছিল না 
পরবর্তী কালে ডিগ্রীধারা হইয়া! “বিদ্বান্‌* আখ্য1 লাভ করিয়া এবং ভিগ্রী- 
লোলুপদের অধ্যাপকপদে অধিষ্ঠিত হ্ইয়াও যখন মাঝে মাঝ তাহার দর্শন 
ও উপদেশ লাভের জন্ত গিয়াছি, তখনও সে সামথ্য হয় নাই। যখনই 
গিয়াছি, তখনই তাহার মুখে নৃতন নৃতন তথ্য শ্রবণ করিয়াছি, নৃতন 
নৃতন প্রেরণা লাভ করিয়াছি, সতের বৎসর বয়সে নিজেকে তাহার 


(& ৬৯ ) 


নিকটে যেমন অজ্ঞ বালক বলিয়া বোঁধ হইয়াছে, চল্লিশ বৎসর বয়সেও 
প্রায় তদ্রপই মনে হইয়াছে । স্ৃতরীং তাহার জ্ঞানের গভীরতা ও 
ব্যাপকতা সম্যক্রূপে উপলব্ধি করা কখনই সম্ভব হয় নাই । সাহিতা- 
সেবী, বিজ্ঞানসেকী, দর্শনসেবী, বিভিন্ন ধন্মীবলম্বী, বিভিন্ন কম্মীবলম্বী, 
নানা শ্রেণীর বিশিষ্ট লোকই তীহার নিকটে যাইতেন ও আলাপ 
আলোচনা করিতেন । তাহাদের মন্তব্য অনেক সম্য কাণে আসিত। 
শুনিতাম যে, এত বিভিন্ন বিষয়ে একূপ গভীর জ্ঞান অতি বিরল দৃষ্ 
হইয়। থাকে । অথচ, তিনি কোন পুস্তক লিখেন নাই, কোন প্রবন্ধ 
পর্য্যন্ত প্রকাশ করেন নাই, কোন প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা পর্য্যন্ত করিতেন 
না। বে সব কর্মে যশ, মান, প্রতিষ্টা লাভের সম্ভাবনা আছে, কিংবা 
কোন বাদ প্রতিবাদের ভিতরে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবন। আছে, সেই 
সব বন্দ হইতেই তিনি যেন প্রধত্বপূর্ববক দূবে থাকিতেন। যেসব 
কন্ম প্রকাশ্য সমালোচনার বিষষ হয়, তাহাতে তিনি হস্তক্ষেপ 
করিতেন না। অপেক্ষাকৃত বুদ্ধ বয়সে অস্থস্থাবস্থায় যখন সাধারণতঃ 
লোকে কম্ম হইতে অবসর গ্রহণ করে-_জীবপ্রেমের প্রেরণায় কোন 
কোন লোকহিতকর প্রতিষ্ঠানের সহিত তিনি কিছু কিছু যুক্ত 
হইয়াছিলেন। আমরা যে সমযে তাহার নিকট ছিলাম, তখন তাহাও 
দেখি নাই, যদিও সকলকেই তিনি কল্যাণকর কন্মে আত্মনিয়োগ 
করিতে উপদ্দেশ ও উৎসাহ দিতেন। সাধারণ লৌকিক ব্যবহার 
যথাসস্ভব কমাইয়া সমস্ত শক্তি তত্বেপলব্ধি ও ভগবদভজনে নিয়োজিত 
করার সাধনাই সম্ভবতঃ তাহাকে পুস্তকাদি গ্রণয়নেও বিরত করিয়াছিল । 
আমাদের অবস্থানকালে তাহাকে লেখাপড়াও বেশী করিতে দেখি 
নাই। যতটুকু করিতেন, তাহা শান্ত্রালোচনা, সাধ্যসাধনতত্বের 
বিচার ও আস্বাদন । 


( ৭০ ) 


ত্বাহার জ্ানতপন্তার কথা অন্তের কাছেও যেমন শুনিয়াছি, 
তাহার নিজ মুখেও কথাপ্রসঙ্গে কিছু কিছু শুনিয়াছি। তিনি 
আমাদিগকে কখন কখন মুখে মুখে সংস্কৃত লোক শিখাইতেন, এবং 
কতবার শুনিয়। ঠিকমত আবৃত্তি করিতে পারি, তাহা পরীক্ষা 
করিতেন। এতছুপলক্ষে তাহার নিকট শুনিয়াছি যে, তাহার 
বাল্যকালে তাহাদের বাড়ীতে অনেক ব্রাঙ্ষণ পণ্ডিত ও ঘটক 
আসিতেন। এবং সেই সব পণ্ডিতের নিকট তিনি নৃতন নূতন 
সংস্কত শ্লোক শিখিতেন। এইরূপে শ্লোক মুখস্থ করিতে তিনি 
এত অভ্যস্ত হ্ইয়াছিলেন যে, একবার শুনিলেই তিনি তৎক্ষণাৎ 
পুনরাবুত্তি করিতে পারিতেন, এবং মোটামুটা অর্থও বলির! দিতে 
পারিতেন। শেষে আর পণ্ডিতের! তাহাকে যেন নৃতন শ্লোকই 
বলিতে পারিতেন না, শোনামাত্র পূর্বপরিচিত শ্লোকের মতই তিনি 
তাঁহা আবৃত্তি করিতেন। পরে, শ্রোক রচনায়ও তাহার অদ্ভুত 
দক্ষত| হইয়াছিল। যে কোন বিষয়ে তাহাকে শ্লোক রচন| করিয়া 
দিতে বলিলে, ছু'তিন মিনিট মাত্র চুপ করিয়া থাকিক্না “মালিনী” 
'শাদ্দুল বিক্রীড়িত” প্রভৃতি কঠিন কঠিন ছন্দে তিনি স্থললিত ভাব- 
গম্ভীর শ্লোক রচনা করিয়। দিতে পারিতেন। সংস্কৃত সাহিত্য দর্শন 
পুরাণাদিতে তাহার অসাধারণ অধিকারের পরিচয় সাধারণ কথাবার্তার 
মধ্যেও পাঁওয়া যাইত । 

ইংরেজী ভাষায়ও তাহার দখল অসাধারণ ছিল। তিনি হেড- 
মাষ্টার হিসাবে স্কুলের উচ্চতম . শ্রেণীতেই ইংরেজী * পড়াইতেন। 
কিন্তু কলেজের অধ্যক্ষও তাহার ইংরেজীর জ্ঞানে আশ্চধ্যান্থিত হইতেন । 
বি, এ, ক্লাসের ছাবত্রগণ সর্বাপেক্ষা কঠিন বইগুলির অতি জটিল অংশ 
নিয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইলেও, তিনি একটু মাত্র দেখিয়া 


॥ ৭১ ) 


অতি সরল ভাবে তাহা ব্যাখ্যা করিয়! দিত্েন। খ্যাতনাম! ইংরেজ 
সাহিত্যিকগণের মধ্যে প্রায় সকলের গ্রন্থের সহিতই তাহার ঘনিষ্ঠ 
পরিচয় ছিল। 

নিজের সাধন বলে তিনি উদ্ছিদ্‌ বিদ্যায় (3০275) পারদর্শিতা 
লাভ করিয়াছিলেন । ধন্মতত্ব ব্যাখ্যার কালেও তীহার নিকটে 
দৃষ্টান্ত ছলে উদ্ভিদ রাজ্যের অনেক প্রকার গুহা রহস্য ও তাহার মধ্যে 
রসময় ভগবানেব বিচিত্র লীলার কথ। শুনিতে পাইতাম । তিনি 
ষখন ছাত্রদিগকে লইয়া! বাসার আগাছ। উৎপাটন ও আবজ্জন। 
পরিফার করিতেন, তখনও মাঝে মাঝে বৃক্ষলতা ফুলফল প্রভৃতির 
আভ্যন্তরীণ ব্যাপারসমূহ সরস ভ।যাঁয় গল্পের আকারে ধর্ণন করিয়া 
একসঙ্গে তাহাদের শ্রমের লাঘব, আনন্দবদ্ধন ও জ্ঞানের প্রসারণ 
করিতেন । কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলিতেন যে, এক সময়ে উদ্ভিদ- 
জগতের রহস্য ভেদের নেশ। তাহাকে পাইয়া বমিরাছিল। তখন 
দিনরাত কেবল এই বিষয়ের পঠন ও চিন্তন | উদ্ভিদ্বিদ্যা সম্বন্ধে 
নানাবিধ পুস্তক অধ্যয়ন করা, নিজে নিজে তাদষয়ে গবেষণা করা, 
[18210115116 21855 লইয়। বৃক্ষ গুল্ম তৃণ লতা ফুল ফল মূল পাতা 
প্রভৃতির ভিতরের স্থক্ম ব্যাপারসমূহ পরীক্ষা করা, গাছপালাৰ 
মধ্যে উতস্থক দৃষ্টি ও চিন্তাপুর্ণ মন নিয়া ঘুরিয়া বেড়ান,__ এ সবই 
তখন প্রধান কাধ্য ছিল। এই প্রকার তপশ্যা্ধারা তিনি উদ্ভিদ্‌- 
জীবন সম্বন্ধে নান। তথ্য আহরণ করিতেন, এবং তৎ্সঙ্গে নিজের 
আধ্যাত্মিক দৃষ্টি ও ভক্তিরস-ভাবিত-হৃদয় মিলাইয়! ভগবানের প্রেমের 
লীল। দর্শন করিতেন । 

জ্যে'তিষ শাস্ত্রে (30:০0075) তাহার অনাধারণ ব্যুৎপত্তি 
ছিল। ইহাঁও তিনি নিজের স্বাধীন প্রচেষ্টাদ্বারাই অঞ্জন করিয়া" 


(৭২ ) 


ছিলেন। তিনি বি, এ, ক্লাসে 25000010র অধ্যাপনা করিতেন । 
কলিকাতায় কোন কোন প্রখ্যাতনাম। অধ্যাপকের নিকট অধ্যয়ন 
করিয়া আসিয়াও ছাত্রের অনেকে বলিত যে, 4১9007017%র জটিল 
সমস্যাগুলিকে এমন সরস ও সরল করিয়া তুলিতে আব কোথাও 
দেখা যায় নাই। তিনি যে বিষয়ই ব্যাখা করিতেন, তাহা আর 
কেবলমাত্র বুদ্ধির জ্ঞেয়ে বিষয় থাকিত না, হৃদয়ের সম্ভোগ্য বিষয় 
হইত। ইহা তীহার শিক্ষার একটি বিশেষত্ব ছিল। জ্যোতিষ 
শাস্ত্রের জ্ঞানাজ্জন সম্বন্ধে তিনি নিজে বলিয়াছেন যে, কোন এক 
সময় তাহার দিন রাত্রি জ্যোতিষের আলোচনাতেই অতিবাহিত 
হইত। কখন কখন জটিল অঞ্চ লইয়। রাত্রি প্রভাত হইয়া যাইত, 
এক মুহূর্তও নিদ্রা হইত না। কখন বা অঙ্ক কষিতে কষিতে ক্লান্ত 
হইয়া ঘুমাইয়া পড়িতেন, খাতা পেন্সিল বুকের উপরই থাকিত। 
নিদ্রার ভিতরেও সেই চিন্তার প্রবহই চলিতে থাকিত। একটি 
10010 নিয়া কথন কখন এক মাস বা ততোধিক সময় অতিবাহিত 
হইয়াছে, কিন্ত নিজের চেষ্টায় তাহার সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত 
কিছুতেই নিবুভ্ত হইতেন না, বা পরাজয় মানিতেন না। এরূপ 
অবস্থায় স্বপ্নে কোন মহাপুরুষ আসিয়৷ সমস্যাটির সমাধান রলিয় 
দিয়া গেলেন, _এই প্রকার অভিজ্ঞতা তাহার একাধিকবার হ্ইয়াছে। 
উৎসাহে তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইত। তৎক্ষণাৎ উঠিয়া সমাধানটি 
লিখিয়া রাখিতেন। ভম্ধত প্রণালীবদ্ধভাবে গণনা করিয়া! সেই 
সমাধানটি লাভ করিতে তাহার আরে! কয়েক দ্রিন কাটিয়া গেল। 
স্বপ্রলন্ধ সমাধানের সহিত তাহার গণনার ফল সম্পূর্ণ মিলিয়া 
যাওয়াতেই তাহার দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল যে, মহাঁপুরুষগণ তত্বপিপা্থ 
সাধকদের প্রতি এইরূপ কৃপা! করিয়া থাকেন । 


( ৭৩ ) 


শারীরবিদ্যা, স্বাস্থ্যতত্ব, আমুর্ধেদ প্রভৃতিতেও তিনি যথেষ্ট 
ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন । সমাজবিধি সম্বন্ধে অনেক খুটানাটার 
সহিত তাহার পরিচয় ছিল, এবং সে সকলের মূল উদ্দেশ্য ও 
তাহাদের বর্তমান আকারের সহিত মূল উদ্দেশ্তের সামগ্রশ্ত ব! 
অপামগ্তস্ত পুঙ্থান্ুপুঙ্খরূপে বিচার করিয়। তিনি যুগোচিত সামাজিক 
কর্তব্য নির্দেশ করিতেন। জাতির ইতিহাস ও রাষ্্রিক সাধনার 
সহিত তীাহার বুদ্ধিগত ও প্রাণগত যোগ ছিল। যদিও তিনি কোন 
সামাজিক বা রাষ্্রিক আন্দোলনে কাধ্যতঃ যোগদান করিতেন না, 
তথাপি তাহার বুদ্ধি ও হৃদয় তংসন্বদ্ধে উদানীন ছিল না। তিনি 
সব বিষয়ের খবর রাখিতেন এবং সব বিষয় বিচারপূর্ব্বক তত্বনি্য 
ও ইতিকর্তব্যতা নির্ধারণ করিয়া রাখিতেন। কম্মিগণ অনেক সময় 
তাহাদের সংশয় নিরাস ও পথ নির্দেশের জন্য তাহার নিকটে 
আমিতেন, এবং তাহার নিকট হইতে প্রেরণা শক্তি ও সছুপদেশ 
লইয়া যাইতেন। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় দর্শনশান্ত্রে তাহার পাণ্ডিত্য 
অগাধ ছিল, তাহা বলাই বাহুল্য । তিনি যখন যে বিষয়ে তত্বান্ট- 
সন্ধানে আত্মনিয়োগ করিতেন, তাহা সেই সময়ের জন্য তাহার 
নিত্য নিরন্তর ধ্যেয় ও বিচাধ্য বিষয় হইত। এইরূপ সাধনার ফলে 
তত্বসমৃহ যেন আপনাআাপনি তাহার নিষ্পাপ, নির্মল ও নিরাবরণ 
অন্তঃকরণে আত্মপ্রকাশ করিত। তত্বযতীত, কোন সত্য তিনি শুধু 
বুদ্ধি দ্বারা গ্রহণ করিতেন না, কেবলমাত্র বিচারের সাহায্যে বুঝিয়া 
রাখিলে তাহা"্ব তৃপ্তি হইত না, তিনি তাহা হৃদয় দ্বারাও গ্রহণ 
করিতেন, প্রেমের সাহায্যে প্রত্যেক সত্যের প্রাণের ভিতরে প্রবেশ 
করিতেন। সেই হেতু, যতটুকু অধ্যয়ন, পধ্যবেক্ষণ ও যুক্তিবিচার 
করিয়া তিনি যতখানি সত্যলাভ করিতেন, তদপেক্ষা অনেক 


৭8 ) 


বেশী পরিশ্রম করিয়াও সাধারণ বিদ্যাসেবীদের পক্ষে তাহা সম্ভব 
হয় না। 

একদিন মহাত্মা অশ্বিনীকুমারের নিকটে বসিয়া আছি। ছোট 
বড় সকলেই ত তাহার সমবয়সী ছিল! আমার একজন সহপাঠী 
বন্ধু তাহাকে কথাপ্রঙ্গে বলিলেন যে আপনার সম্বন্ধে প্রশংসাবাদের 
সঙ্গে কখন কখন বিরুদ্ধ সমালোচনাও শোনা যায়, কিন্তু জগদীশ- 
বাবুব সম্বন্ধে প্রশংসাই শুধু শোন। যায়, তাভার বিরুদ্ধে কোন কথা 
কারও মুখে শোনা যায় না। তিনি প্রথমতঃ হাসিতে হাসিতে 
বলিলেন, এই কারণে আমি তোমাদের জগদীশবাবুকে বড় একটা 
কিছু মনে করি নাঁ। যে সব বিষয়সম্পর্কে বিরুদ্ধ সমালোচনা হয়, 
তার মধ্যে তার আছে কি? বিষয়পশার কিছু নাই, কোন মামলা 
মোকদ্দমার মধ্যে যাইতে হম্ন না, কারে। সঙ্গে শত্রতা করিতে হয় 
না, কোন 1১0111০ জ০1এব মধ্যে ঢুকিল না, দশ রকম লোকের 
সঙ্গে মিলিয়া দশ রকম মতের বিরোধ ও স্বার্থের সংঘর্ষের মধ্যে 
পড়িল না, একট। বিয়ে পর্যন্ত করিল না, একটা পারিবারিক 
কলহের সম্ভাবনা পর্যন্ত রাখিল না, চিরকাল ত্রক্ষচষ্য করিয়া, 
ভগবান্‌ ভগবান্‌ করিয়।, আর চারিপার্থে ছাত্র ও ভক্ত লইরা, 
সহরের এক কোণে জীবন কাটাইয়৷ দ্িল। তার কোন কাজের 
দ্বাব| কি 1)010110 2900096 হয় যে, 1)01011০ তার বিরুদ্ধে কোন 
কথা বলিবে? এইরূপ কিছুক্ষণ ব্যাজস্তরতি করিয়া, তারপরে একটু 
গম্ভীর হইয়া অশ্বিনীকুমার বলিলেন, হারে, জগদীম্শর কথা কি 
বলিব! এমন লোক সারা ছুনিয়ায়,_শুধু এদেশে নয়, সারা দুনিয়ায় 
কটা পাবি? 01721900720. 2101]1ে এই ছুইএর এমন সমাবেশ 
কোথা পাবি? প্রত্যেকটি কথা এমন জোর দিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে 





স্বগয় অশ্বিনীকুমার দত্ত 





( ৭৫ ) 


বলিলেন য়ে, তাহা কাণের ভিতর দিয়া মন্মে প্রবেশ করিল; 
আমাদের এত কাছে বিদ্যমান এমন সাদাসিদে এই নিতান্ত আপন 
লোকটি সারা ছুনিয়ার মধ্যে এত বড়! অবাক হইয়। ইহাই 
ভাঁবিতে লাগিলাম। বাস্তবিক, আমরা আপনাদিগকে অন্তরে 
অন্তরে এত ক্ষুত্র বলিয়া অনুভব করি, ঘে, আমাদের সঙ্গে সমান 
ভূমিতে ধাহারা ঘনিষ্ঠভাবে খেলামেশ! করেন, বাহিক আচার 
ব্যবহারে ধাহাদিগকে আমাদের মতই নিতান্ত সাধারণ দেখিয়! 
থাকি, ধাহাদের জীবন্যাত্রাব মধো আমাদের সাধারণ জীবনযাত্রা 
হইতে অতান্ত পৃথক রকমের কোন আড়ম্বর না দেখি,সেই 
আড়শ্বর এশ্বর্যেরই হউক কিংব। দারিদ্র্েবই হউক, ভোগেরই হউক 
বা ত্য।গেরই হউক, বাক্যের হউক বাঁ কাষ্যেবই হউক,_ তাহার 
যে সমগ্র মানবসমাজের মধ্যে অসাধারণ মানুষ হইতে পারেন, 
বাঠির হইতে কোন প্রভাব্প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তি বা সঙ্ঘ তাহা 
আমাদিগকে চোখে আকুল দিয় না বুঝাইলে আমাদের পক্ষে তাহা 
ধারণা বরা সম্ভব হয ন|। 

আচার্য জগদীশের জ্ঞানের পরিমাণ করা যেমন আমাদেব পক্ষে 
সম্ভব ছিল না, তাহার প্রেমের গভীরতা ও ব্যাপকতা উপলব্ধি 
করাও তেমনি আমাদের ন্যায় ক্ষুত্রপ্রাণ বালকদের পঙ্গে অসম্ভব 
ছিল। শীতকালে রাত্রি ১টা বা ২টার সময়েও পণ্ডিত কালীশ্চন্্ 
যদ্রি শুনিতে পাইতেন যে, কোন অসহায় ব্যক্তি তিন চারি মাইল 
দূরে রোগ যন্ত্রণায় কষ্ট পাইতেছে এবং তাহার চিকিৎস! ও শুঞষার 
কোন ব্যবস্থা নাই, অমনি তিনি শধ্যাত্যাগ পৃৰ্বক ২।৪জন ছাত্রকে 
ঘুম হইভে জাগাইয়া ও পশ্চাতে আসিতে আদেশ করিয়৷ একাকী 
ব্যাকুলপ্রাণে মেদ্িকে ছুটিয়া যাইতেন, এবং সেই রোগীর জন্য 


€ ৭৬ ) 


সর্বপ্রকার স্থবন্দোবস্ত করিতে না পার! পর্যস্ত তিনি যেন নিজেই 
যন্ত্রণায় ছটফট করিতেন। তাহার জীবপ্রেম এইরূপ কার্যে প্রকাশ 
পাওয়ায় আমরা সহজে ধারণ] করিতে পারিতাম। কিন্তু আচাধ্য 
জগদ্রীশের প্রেম এইপ্রকার কাধষ্যে রূপ পরিগ্রহ না করাম্ন, তাহার 
সন্থন্ধে ধারণা করিতে বিশেষ ুম্ম দৃষ্টির প্রয়োজন ছিল। অথচ, 
সেই পণ্ডিত মহাশয়ের মুখেই শুনিতে পাইতাম যে, জগদীশবাবুব 
জীবপ্রেমের গভীরতা ও ব্যাপকতা অতুলনীয়। অন্থের দুঃখ তিনি 
যেমন তাহার সার। প্রাণ দিয়। অনুভব করেন, তাহা! একমাত্র তাহার 
ম্যাম মহাপ্রাণ উন্নভ প্রেমিক ভক্তের পক্ষেই সম্ভব। মহানভব 
কম্মযোগী অশ্বিনীকুঘার দেশের আপামর জনসাধারণের সর্বপ্রকার 
অভাব ও ক্লেশ কিরূপ গভারভাবে অনুভব করিতেন, তাহা তাহার 
বাক্য ও কাধ্যের ভিতর দিয়া সর্বদাই আমাদের উপলব্ধির ক্ষেত্র 
পথান্ত আসিয়া পৌছিত। তিনি সেই সব অভাব ও ক্লেশের 
প্রতিকারকল্পে আপনার দৈহিক শক্তি, মানসিক শক্তি, সংগঠনী 
শক্তি ও আপনার সব প্রভাবপ্রতিপত্তি প্রয়োগ করিতেন বলিয়া 
তাহার ভিতরের অন্ুভৃতি সম্বন্ধে কথঞ্চিৎ অন্কুমান করা আমাদের 
পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু আচার্য জগদীশের কম্মবিমুখ দেহখানির 
বাহ্থাবরণের মধ্যে কত বড় একটা বিশাল প্রাণের তরঙ্গ খেলিত, 
তাহা স্কুল দৃষ্টিতে কিরূপে দেখা যাইবে? অশ্বিনীকুমারের ন্যায় 
মহাপ্রাণ ব্যক্তিকেও যখন সেই প্রাণের নিকটে শ্রদ্ধায় নতশির 
হইতে ও তাহার গুণকীর্তনে রত হইতে দেখ। যাইত, তখন তাহার 
মহিম। কতকটা উপলব্ধিগোচর হইত । 

আচাধ্য জগদীশ ছিলেন ভাবরাজ্যের লোক । ভগবান্‌ তাহার 
দেহখানিও ভাবসাধনারই অন্থকৃল করিবা স্থষ্টি করিয়াছিলেন। তিনি 


৮ লহ 2 


নিজেও যথোচিত পুরুষকার প্রয়োগ দ্বার। সেই সর্ববাঙ্গনুন্দর গৌরবর্ণ 
দেহথানিকে কন্মসাধনায় সথপটু করিয়! তোলেন নাই। তাহার সমস্ত 
অহ্ধপ্রত্যঙ্গ স্বভাবতঃ যেন মাখনের ন্যায় কোমল ছিল। করতল ও 
পদতলের রক্তিম আভা শান্ত্রবর্ণিত দেবদেবীগণের করকমল ও চরণ- 
কমলের স্বৃতি জাগাইয়। দ্রিত। তিনি একবার অশ্বিনীকুমারের সহিত 
পরমহংস রাম্কঞ্চদেবকে দর্শন করিতে গিবাছিলেন। তখন তাহার 
প্রথম যৌবন। পরমহংসদেব নাকি তাহাকে দেখিয়াই আনন্দে 
অশ্বিনীকুমারকে বলিয়াছিলেন যে, অরুণোদয়ের পূর্ববে তোলা এই 
মাখনটুকু কোথা থেকে আন্লে? প্রৌঢ় বয়সে দেখিয়াও এই 
উপমাটিই মনের মধ্যে জাগিয়। উঠিত। তাহার ভিতর ও বাহির 
ছুইই ধেন মাখনসদূশ ছিল__যেন মানবদেহমনের ছাকা সধত্রসঞ্চিত 
সারভূত বস্তটুকু, মানবীয় কর্্মজগতের সর্বপ্রকার আবিলতা, ঘাত- 
প্রতিঘাত ও তাপক্লেশের সহিত অসংশ্লিষ্ট থাকিয়া তছুপরি ভাসমান । 
এই সুগঠিত সুন্দর দেহখানি শীত, রৌদ্র, বর্ষা সহ করিতে অপটু 
ছিল, আয়াসপাধ্য কন্মে ব্যাপৃত হওয়ার উপযোগী ছিল না। ব্যারাম 
গীড়াও এই শরীরটাকে আলিঙ্গন করিতে ক্ুর করে নাই। 
প্রকুতিজননী যেন তাহাকে কোলাহলময় বাহাজগৎ হইতে যথাসম্ভব 
সংগোপন করিয়া, বিবিধ কৌশলে সংসারের বাহ্কম্মগ্তলিকে তাহার 
অধিকার হইতে যথাসম্ভব সরাইয়া দিয়া, তাহার প্রেমের ধারাটীকে 
কন্মরাজ্য হইতে ভাবরাজ্যে প্রবাহিত করিয়া, তাহার জ্ঞানপ্রেম- 
স্বন্দর জীবনটা» অধ্যাত্মজগতেই পরিপূর্ণ করিয়া তুলিবার ব্যবস্থা 
করিয়াছিলেন । শারীর প্রকৃতির ইঙ্গিত ও আন্তর প্রকৃতির স্বরূপ 
অনুধাবন করিয়া, বাহৃক্শে আপেক্ষিক বিরতি অবলম্বন পূর্বক ভাব- 
রাজ্যের সাধনীতেই বিশেষরূপে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। এই 


(৭৮ ) 


সাধনায় ভগবতপ্রেমের অঙ্গীভূতভাবে জীবপ্রেমও ক্রমশঃই তাহার 
বিশুদ্ধ অন্তরে উত্তরোত্তর গভীরতা ও ব্যাপকতা লাভ করিতেছিল। 
জীবম্ন্রেরই, তন্মধো মানুষের ও বিশেষতঃ ভারতবাসীর দুঃখ দৈন্য 
তিনি তাহার হৃদয়ের অস্তঃস্থলে গভীরভাবে অনুভব করিতেন। 
তাহার চোখমুখ হাবভাবের মধ্যে মাঝে মাঝে সেই অনুভূতির কিছু 
কিছু পরিচয় পাওয়া যাইত। যখন তাহার নিকটে বালবিধবাদের 
কথা উঠিত, বা অনাথ বালকবালিকাদের প্রসঙ্গ উঠিত, কিংবা 
দেশের অন্নবস্ত্র, শিক্ষাদীক্ষার অভাবের বিষয় আলোচনা হইত, 
অথব| দেশকম্্ীদের প্রতি অত্যাচারের কাহিনী বর্ণিত হইত, তখন 
প্রায়ই তিনি অতিমাত্রায় গা্তীধধ্য অবলম্বনের চেষ্টা করিয়াও স্থির 
থাকিতে পারিতেন না, ভাব সংগোপন করিতে সমর্থ হইতেন না। 
প্রত্যেকটা বেদনা তীব্রভাবে তিনি নিজে ভোগ করিতেছেন বলিয়া 
মনে হইত; অশ্রধারায় তাহা কতকটা প্রশমিত হইত। তাহার 
এরূপ অবস্থা বহুবার প্রত্যক্গ করিয়াছি । 

তাহার জীবপ্রেম ভগবৎপ্রেমের সহিত যুক্ত থাকায়, ভগবৎ- 
প্রেমের একটি বিশেষ অঙ্গরূপেই বিকসিত হুওস্বায়, ইহার শক্তিও 
অসাধারণ ছিল। তিনি কন্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ না হইলেও, শুভেচ্ছ! প্রেরণ 
করিয়া সমাজের, জাতির ও জীবজগতের কল্যাণ সাধন করিতেন। 
বাহ্যিক প্রচেষ্টা ব্যতীতও এই প্রকার আধ্যাত্মিক প্রেমশক্তি ঘ্বার। 
কতদূর কল্যাণ সাধন করা যায়, তাহা অবশ্য আমাদের ন্যায় স্ুল- 
দর্শীদের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন। কিন্তু ধাহাদের ক্য়খ্পরিমাণেও 
অধ্যাত্মৃষ্টি খুলিয়াছে, তাহারাই ইহা অগ্ভভব করিতে সমর্থ হন। 
সুলদৃষ্টিতেও ইহা প্রত্যক্ষ করা গিয়াছে যে, কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন 
জাতীয় লোকহিতকর কার্যে নিয়োজিত লো'ক সকল তাহার নিকটে 


( ৭৯ ) 


আসিয়া, তাহার দ্বারা আপনাদের কর্সন্বন্ধীয় বিবিধ সমস্তার সমাধান 
করাইয়া লইয়া, তাহার উপদেশ পাইয়া, তাহার চরণ ম্পর্শ করিয়া, 
নৃতন শক্তি, নৃতন কন্মো্ম, নূতন আশাভরসা, ও নূতন দৃষ্টি লইয়। 
স্থপ্রসন্ধ চিত্তে ফিরিয়। গিয়াছে । অনেক কম্মী এরূপ সাক্ষ্য প্রদ্ধান 
করিয়াছেন যে, তাহাকে মাঝে মাঝে কেবলমাত্র দর্শন করিয়। গেলেও 
কন্্মশক্তি বহুপ্তণ বদ্ধিত হয়, কম্মের সফলতাঁও অনেক বেশী পরিমাণে 
লাভ হয়। আচাধ্যদেব এই সব সেবাব্রতীদের প্রতি নানাভাবে 
আপনার প্রীতি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতেন। আর্তসেবাপরায়ণ কোন 
বালক নিকটে আপিলে, তিনি কখন কখন তাহাকে অতি কাছে 
বসাইয় স্বহন্তে বাতাস করিতেন। কখন বা নিজ হস্তে একবপ 
লোককে তিনি কিছু খাওয়াইতেন। সেবাব্রতীকে সেবা করিয়! 
তিনি যেন ধন্ত হইতেছেন, এরূপ ভাব প্রকাশ করিতেন। অতিশয় 
মনোযোগসহকারে তিনি তাহাদের সেবাকাধ্যের বিবরণ শুনিতেন, 
এবং প্রশংসমান দৃষ্টিতে তাহাদের দিকে চাহিতেন। সেবাব্রতের জন্য 
রামকুষ্খমিখনের প্রতি তাহার প্রগাঢ় অন্থরাগ ছিল, এবং ভজ্জন্তই 
বিশেষভাবে স্বামী বিবেকানন্দকে তিনি এযুগের আদর্শ পুরুষ বলিয়া 
নির্দেশ করিতেন । 

একদিন আচার্য্যদেব একান্তে বসিয়। আছেন। চোখ দুটা মুদিত 
ন। হইলেও অন্তনিবদ্ধ; কোন্‌ ভাব প্রবাহে ভামিতেছিলেন, জানি 
না। এমন সময়ে এক জিজ্ঞাসা লইয়! উপস্থিত হইলাম। মুক্তির প্রসঙ্গ 
উঠিল। এনক্ষন্বে তাহার সেদিনের উপদেশটী হৃদয়ে একট| বড় স্থান 
দখল করিয়া আছে, যেহেতু তাহার নিজের হৃদয়টী সেদিন বিশেষভাবে 
ব্যক্ত করিয়াছিলেন বলিয়! বোধ হইল। তিনি যাহা বলিলেন, তাহার 
মন্দ এইরূপ :-_নিজের মুক্তির জন্য এত লালায়িত কেন? তোমার 


(৮০) 


চারিপার্শে তোমারই মত লক্ষ লক্ষ লৌক বন্ধনের যাতনায় ছট্ফট্‌ 
করিতেছে, তোমারই মত বিচারশক্তিসম্পন্ন লক্ষ লক্ষ লোক উপযুক্ত 
শিক্ষাদীক্ষার অভাবে কামক্রোধ লোভাদির বশীভূত হইয়া অকল্যাণকে 
কল্যাণ মনে করিয়া, আপাতমনোরম অশেষ ছুঃখপ্রদ বিষয়ের দিকে 
ছুটিয়া বিবিধ তাপে সন্তাপিত হইতেছে, তোমারই মত ব্রহ্মানন্দের 
অধিকারী অসংখ্য লোক অজ্ঞানে অন্ধ হইয়া ক্ষুত্র ক্ষুত্র স্বার্থসিদ্ধির 
লালসায় পরস্পরের সহিত মারামাবি কাড়াকাড়ি করিয়া নানাবিধ 
দুঃখে জঙ্জরিত হইতেছে, তোমারই মত সুখছুঃখান্ুভূতি সম্পন্ন অসখখ্য 
মানষ অন্নহীন বস্ত্রহীন গৃহহীন অবস্থায় নানা! অত্যাচাব অবিচারে 
নিপীড়িত হইয়। ম্নুষ্যত্বেৰ আদর্শ হইতে সম্পূর্ণজূপে আষ্ই হইফ! 
পড়িতেছে এবং পশুপক্ষীর ন্যায় কোন রকমে প্রাণটুকু রক্ষ। করিবার 
জন্য প্রাণপণ করিতেছে । স্বজাতীয় এই সকল লোককে পশ্চাতে 
ফেলিয়া, তাহাদিগকে মুক্তির পথে লইয়া যাইবার কোন ব্যবস্থ 
না করিয়া, তাহাদের প্রাণের জালায় একটু শান্তিবারি সেচনের চেষ্টা 
না করিয়া, নিঙগের নির্বাণ মুক্তি লাভ করিবার জন্য আকাঙ্ষা কেন? 
নিজের চিন্ত। যে পরিমাণে ছাড়িতে পারিবে, সেই পরিমাণেই নিজের 
মুক্তি সাধিত হইবে । তোমার প্রাণ এবং অন্যান্য সকলের প্রাণ কি 
আলাদ। ? দেহমীত্রই আলাদ।। দেহাত্ববোধ অতিক্রম করিয় 
প্রণরাজ্যে প্রবেশ কর, দ্রেখিবে, সকল দেহের মধ্যেই তুমি 
অবস্থান করিতেছ। বুঝিবে, সকলের স্থখছুঃখই তোমার স্বখছুঃখ, 
সকলের বন্ধনই তোমার বন্ধন। জগতের কোন ব্ক্তি অজ্ঞানান্ব 
থাকিতে তোমার জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পাদন হইল কৈ? জগতে 
কোথাও হাহাকার থাকিতে তোমার প্রাণ নিরাবিল আনন্দে 
প্রতিষ্ঠিত হইবে কিরূপে? জগতের কোন লোক সংসার জালায় 


(৮১ ) 


জর্জরিত থাকিতে, তুমি সংসার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন হইবে 
কিরূপে? ধাহারা যথার্থ ম্হাপ্রাণ, তাহারা নিজেদের ব্যক্তিগত 
এহিক ও পারত্রিক সকল প্রকার স্থার্থসিদ্ধির বাসনা নিঃশেষ 
করিয়া দিয়া, বিশ্বপ্রাণের সহিত প্রাণ মিলাইয়া, সকল জীবের কল্যাণ- 
চিন্তায় রত থাকেন, সকলের মধ্যে শক্তি ও শ্রভেচ্ছা প্রেরণ করেন, 
সকলকে ছুঃখদৈন্য হইতে মুক্তি প্রদান করিতে উতস্ক হন। জীবের 
কল্যাণের জন্য মহাপুরুষগণ অনেক সম্য় অলক্ষিতে বিচরণ করেন 
বলিয়া শান্তর ও মহাজনের বাক্য আছে । ধাহারা নিজ দেহে স্থুলভাবে 
কার্ধয করিতে পারেননা, তাহারা অনেক সময় অন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের 
দেহের ভিতর দিয়া কাধ্য করিয়া থাকেন । বুদ্ধদেব সম্বন্ধে কথা আছে 
যে, তিনি নিজের মুক্তির জন্য গৃহত্যাগ করেন নাই, তাহার সাধনা ও 
তত্বজ্ঞানলাভ নিজের জন্য নয়। তিনি সকল মানবকে জরা ব্যাধি 
মৃত্যু হইতে উদ্ধার করিবার জন্য সাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, এবং 
তাহার উপায় আবিষ্ষীর করিয়া সকল শ্রেণীর লোকের মধ্যে তাহ! 
প্রচার করিয়াছেন। জগতে একটি লোকও বন্ধনগ্রস্ত ও ছুঃখ- 
গীড়িত থাকিতে, কাহারও আত্যস্তিক নির্বাণ হইতে পারেনা, এরূপ 
মৃতও তিনিই প্রচার করিয়াছিলেন বলিয়া অনেকে বলিয়া থাকেন । 

এই ভাবের কথা বলিতে বলিতে আচাধ্যদেবের হৃদয়ের মধ্যে 
যে প্রেমের তরঙ্গ খেলিতেছিল, তাহা তাহার ভাষার শ্োত, চোখের 
দীপ্তি ও ছল্‌ ছল্‌ অবস্থা প্রভৃতির ভিতর দিয়া ফুটিয়া বাহির 
হইতেছিল। ৪তিনি যেন সত্য সত্যই তখন বিশ্বের সকল লোকের 
ছুঃখদৈন্ত নিজের ভিতরে অনুভব করিয়া, তাহাদের মুক্তির জন্য নিজের 
প্রাণটী ঢালিয়া দ্িতেছিলেন, নিজের সাধনলন্ধ সমস্ত শক্তি তাহাদের 
জালা নিবারণের জন্য প্রয়োগ করিতেছিলেন। 

ঙ 


(.৮২) 


শ্রীমদ্‌ ভাগবতে ভাগবতশিরোমণি গ্রহলাদ ভগবান্‌ নৃসিংহদেবের 
চরণে যে প্রার্থন! জানাইয়াছিলেন তাহ তিনি মাঝে মাঝে শুনাইতেন। 
প্রহলাদ বলিতেছেন-_- 
নৈবোছিজে পর দুরত্যয়বৈতরণ্যা- 
স্তদ্বী্্যগায়ন-মহামৃত-মগ্রচিত্তঃ | 
শোচে ততো বিমুখচেতস ইন্দিঘার্থ- 
মায়ান্ুখায় ভরমুদ্বহতো বিষুঢ়ান্‌ ॥ 
গ্রায়েণ দেবমুনয়ঃ স্ববিমুক্তিকামাঃ 
মৌনং চরন্তি বিপিনে ন পরার্থনিষ্ঠাঃ | 
নৈতান্‌ বিহায় কপণান্‌ বিমুমুক্ষ একো 
নান্যং ত্বদস্ত শরণং ভ্রমতোইন্থুপন্তে ॥ 
হে পরমাত্মন্‌! ছুস্তর ভববৈতরণী পার হওয়ার জন্য আমি উদ্বিগ্ন 
নই) কারণ এখানেও তোমার মাহাত্ম্যকীর্তনরূপ ম্হামৃতাম্বাদনে 
আমার চিত্ত মগ্র আছে। যাহাদের চিত্ত সেই অমৃতাস্বাদনে বিমুখ 
এবং ইন্ট্রিয়ভোগ্য বিষয়নুখ রূপ মায়ামরীচিকার পশ্চাতে ছুটিয়া 
যাহার! কেবল নানাপ্রকার ভারবহনের ক্লেশই ভোগ করিতেছে, সেই 
সব মৃঢ়দের জন্তই আমার কষ্ট । হে দেব! মুনিগণ প্রায়ই নিজ 
নিজ মুক্তির কামনায় মৌনব্রত অবলম্বন পূর্বক বিজন বনে সাধন- 
ভজন করেন, তাহারা পরার্থনিষ্ঠ নন্। আমি এই সব দীন কৃপার্ 
ভাই সকলকে পরিত্যাগ করিয়া একাকী মুক্তি নিতে ইচ্ছুক নই। 
আর সংসারচক্রে ভ্রাম্যমান এই সকল কপণদের উদ্ধারের নিমিত্ত 
তুমি ব্যতীত অন্ত কেহ ত আশ্রয়নীয় নাই । 
এই প্রকারে প্রহ্নাদ দীনছুঃখী ভগবদ্বিমুখ লোক সকলের 
ক্লেশ নিজে অনুভব করিয়া ভগবানের নিকট তাহাদের কল্যাণের 


( ৮৩ ) 


জন্তই প্রার্থনা করিতেন, নিজের মুক্তির জন্য নয়। ইহাই যথার্থ 
ভক্তের আদর্শ। আচার্ধ্য জগদীশও এই আদর্শটা আমাদের সম্মুখে 
উপস্থিত করিতেন। তিনি ছাত্রদিগকে একটি প্রার্থনার মন্ত্র 
শিখাইতেন-- 

্বস্ত্ত্ব বিশ্বস্য খলঃ প্রসীদতাং 

ধ্যায়ন্ত ভূতানি শিবং মিথো ধিয়া। 

মনশ্চ ভদ্রৎ ভজতাদধোক্ষজে 

আবেশ্ঠতাং নো! মতিরপ্যহৈতুকী ॥ 

বিশ্বের কল্যাণ হউক। খল ব্যক্তিদের চিত্ত প্রসন্ন হউক। 
গ্রাণিগণ সকলে অন্তরে অন্তরে পরস্পরের মঙ্গল ধ্যান করুক। 
যাহা যথার্থ ভদ্র, মন তাহারহই ভজনা করুক। আর আমাদের 
হৃদয় নিফামভাবে (অন্ত কোন আশঙ্কা বা উদ্দেশ্য না রাখিয়া ) 
ভগবানে আবিষ্ট হউক। তিনি বলিতেন যে, এই প্রার্থনার 
ভাবটা জাতির প্রত্যেক বালক বালিক ও যুবক যুবতীর চিত্তে 
গাথিয়। দিতে পারিলে দেশের যথার্থ মঙ্গল হয়। 
আমার মনে হয়, আচাধ্যদেব অন্তররাজ্যে প্রেমের সাধনায় 

সিদ্ধিলাভ করিয়া, শেষ জীবনে-_বান্িক কম্মশক্তি শেষ হইয়া 
আসিবার কিঞ্চিৎ পূর্বে লৌকশিক্ষার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুত্র কম্মের মধ্যে 
তাহার একটু রূপ ফুটাইতে চাহিয়াছিলেন। এই হেতু তিনি 
স্থানীয় রাম্কৃষ্ণমিশনের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন, পতিতা ভগ্লীদের 
দুর্দিশাগ্রন্ত জীরনের উৎকর্ষসাধনেও কিঞ্চিৎ মনৌষোগী হইয়াছিলেন, 
বালবিধবাদের জীবনের শাস্তি ও উন্নতি বিধানের জন্য কিছু কিছু 
ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, নিজের আশ্রমে ধশ্মশিক্ষার সঙ্গে চরকা ও 
অন্ত কিছু কিছু কুটার শিল্পের আমদানী করিয়াছিলেন, এবং আরও 


(৮৪ ) 


কোন কোন সমাজহিতকর অনুষ্ঠানের সহিত আপনাকে 
যুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু এসকলই তাহার লোকশিক্ষার কিঞ্চিৎ 
অঙ্গমাত্র, তাহার লোকপ্রেমের কিঞ্চিৎ বাহপ্রকাশ মাত্র। ইহ! 
বারা তাহার অনুভূতির ধারণা করা অসম্ভব। 

আচাধ্যদেবের শ্রীমুখ হইতে আমি যতটুকু উপদেশ লাভের 
স্থযোগ পাইয়াছি, তাহাতে আমার ধারণা জন্মিয়াছে যে, তাহার 
সকল উপদেশের ভিত্তি ছিল “গীতা, ও 'ভাগবত”। গীতা ও 
ভাগবতের শিক্ষা তাহার নিজের সাধনজীবনেরও নিয়ামক ছিল । 
গীতা ও ভাগবত ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলিয়া তিনি 
উল্লেখ করিতেন । তিনি মাঝে মাঝে বলিতেন যে, আমার ঘরে 
যদি আগুণ লাগে, এবং এমন অবস্থা ঈরাড়ায় যে একটিমাজ 
জিনিষ লইয়! আমি বাহির হইতে পারি, তবে আমি গীতাখানি, 
লইয়া বাহির হই এবং মনে করি যে আমার সর্বশ্রেষ্ঠ 
সম্পদ রক্ষিত হইল, আর যদি ছুইটি জিনিষ লইয়। বাহির হওয়ার 
সম্ভাবনা থাকে, তবে গীতা ও ভাগবত, এই ছুইটি সম্পত্তি লইয়! 
আত্মরক্ষা করি। গীতা ও ভাগবতের সম্বন্ধ নির্ণয় প্রসঙ্গে তিনি 
বলিতেন যে, গীতায় যেন বিশ্বগুরু ভগবান্‌ উচ্চ মঞ্চ হইতে ব! 
পাহাড়ের উপর হইতে নিম্ন ভূমিস্থিত আর্ত ও জিজ্ঞাস্থ আমাদিগকে 
গম্ভীর নিনাদে অথচ মধুর স্বরে উপদেশ করিতেছেন এবং 
আমাদিগকে তাহার সমীপবর্তী হইবার জন্য আহ্বান করিতেছেন 
ও তুলিবার জন্য হাত বাড়াইয়৷ দিয়াছেন। কিন্তু ভুগবতে তিনিই 
সম্মোহন মৃত্তিতে আমাদের মধ্যে নামিয়া আসিয়াছেন, আমাদের 
সঙ্গে মিলিয়। মিশিয়া, খেল! ধুলা গল্প গুজব করিয়া, বিচিত্র রস- 
মাধুধ্যে সকল শ্রেণীর লোকের আস্বা্য করিয়া, সেই সব তত্বই 


(৮৫) 


আমাদের হৃদয়ের গভীর প্রদেশে অন্ুপ্রবিষ্ট করিয়া দিতেছেন। 
ভাগবতে জ্ঞান ও আনন্দ মিলিতভাবে আমাদের ভিতরে প্রবেশ 
করে এবং বুদ্ধি ও হৃদয়কে একীভূত করিয়া ফেলে। ভাগবত 
পাঠে জ্ঞান আনন্দদ্বারা জীর্ণ হইয়া জীবনের অঙ্গীভূত হয়, এবং 
আনন্দ জ্ঞানদ্বার| উদ্ভাসিত হইয়া সমুজ্জলভাবে প্রকাশ পায়। 
গীতায় ভগবান্‌ উদার ম্হান্‌ করুণাময় বিশ্ববিধাতা ও বিশ্বগুরু, 
ভাগবতে তিনি তৎসঙ্গে হুন্দর মধুর প্রেমঘনমৃত্তি দরদী সখা। 
তবে ভাগবতের ভাষাটি এমন যে, প্রত্যেকটি কথা চিবাইয়া 
চিবাইয়া আস্তে আস্তে রসান্বাদন করিতে হয়। শুধু বুদ্ধিদ্ধারা 
বুঝিলে ভাগবত অধ্যয়ন হয় না, হৃদয় দিয়া অনুভব করিতে হয়। 

বি, এ, পরীক্ষার পরে কিছুদিন তীর্থ ভ্রমণ, সাধুসঙ্গ ও শাস্ত্রচ্চা 
করিয়া যখন বরিশালে আচাধ্যদেবের নিকটে ফিরিয়া যাই, তখন 
একদিন প্রসন্গক্রমে সাংখ্যপন্থী একজন বন্ুশান্ত্রবিৎ মনীষী সাধুর 
উক্তি ও যুক্তির প্রতিধ্বনি করিয়া গীতার কোন কোন মত সম্বন্ধে 
সমালোচনা করিতেছিলাম। আচাধ্যদেব নান1 প্রকার যুক্তিতর্ক 
দ্বারা দেই সমালোচনার অন্যাধ্যতা প্রতিপাদন করিলেন। তৎপরে, 
একটু অতিমাত্রায় গম্ভীর হইয়া বলিলেন, যে, নানা স্থান ঘুরিয়া বড় 
বড় সাধুমহাত্মার সঙ্গ করিয়া যত কিছুই লাভ কর না কেন, যদি 
কোন ক্রমে গীতার ঠাকুরটিকে হারাইয়া ফেল, তবে মোটের উপর 
বড় একটা €লাকমানই হইয়াছে, বলিব। সকল শাস্ত্রের উপরে 
গীতার আসন । 

আচাধ্যদেবের সহিত পরিচয় ব্যক্তিগতভাবে ঘনীভূত হওয়ার 
পূর্বেই গীতারলাসে তাহার মুখ হইতে ভগবদ্বাক্যের আস্বাদন 
কিছু" কিছু পাইতে আরম্ভ করিয়াছিলাম। তাহার যুক্তিপূর্ণ ও 


( ৮৬ ) 


হৃদয়স্পর্শী ব্যাখ্যার ভিতর দিয়া গীতার বাণী যেন জীবন্ত হইয়া 
চিন্তাধারা ও ভাঁবধারার উপর প্রভাব বিস্তার করিতেছিল। ক্রমশঃ 
তাহার বহিজ্জীবনের ও অন্তজ্জীবনের পরিচয় লাভের ঘতই স্থযোগ 
হইতে লাগিল, গীতা যেন মনশ্চক্ষুর সম্মুখে ততই মুস্তিমতী হইয়। 
দেখ! দিতে লাগিল। বর্তমানে এই ২৫২৬ বৎসর পরেও গীতা 
অধ্যয়নের সময় তাহার মেই সময়ের অনেক কথা দর্শন শাস্ত্রের 
সুত্রের মত অনেক ছোটখাট বাণী--কাঁণে বাজিতে থাকে, চক্ষুর 
অনুপম দৃষ্টি, মুখমণ্ডলের ভাব ও দক্ষিণ হন্তের অঙ্গুলি সঞ্চালন 
চোখের সামনে ভাসিতে থাকে, তাহার কম্মবাহুল্যবিহীন দনন্দিন 
জীবনের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কার্য স্বৃতি-পথে উদ্দিত হয় । এক একটি 
শব্দের ভিতর হইতে তিনি কত রহস্য উদঘাটন করিতেন। শুনিয়। 
যেমন আনন্দ হইত, তেমনি বিস্ময় হইত, তেমনি ভাবের উদ্দীপন! 
আসিত। মাঝে মাঝে বলিতেন, এই যে “এব” শব্দটি, এর দাম 
লাখ টাকা, এই বলিয়৷ ইহার তাৎপধ্য বিশদভাবে ব্যাখ্যা করিতে 
আরম্ভ করিতেন । আবার, শ্লোকের পর প্লোক কি রকম স্বাভাবিক 
ভাব প্রবাহে আপনা আপনি উদ্দিত হয়, তাহ! দেখাইয়া দিয়া গীতার 
শব্দবিন্তাস, বাক্যবিন্তাস ও শ্লোকবিন্যাসের অনন্তসাধারণ সৌন্দধ্য 
মাধুর্য; বুঝাইয়া! দিতেন। গীতা যে একাধারে রসাল সাহিত্য, 
ুযুক্তিপূর্ণ দর্শন, সার্বজনীন ধর্্মশান্ত্রইহা আচাধ্য জগদীশের 
ব্যাখ্যার ভিতর দিয়া স্থপরিস্কুট হইয়া উঠিত। শ্রীধর স্বামীর টাকার 
প্রতি তীহার অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল। শ্রীধরের ব্যাখ্যার বিপরীত 
কোন ব্যাখ্য। তিনি গ্রহণীয় মনে করিতেন না। শ্রীধর তাহার সংক্ষিপ্ত 
টাকার মধ্যে ছোট ছোট এক একটি পদ বা একটি বাক্য সংযোজন 
করিয়। দিয়! যেরূপ এক একটি গভীর দার্শনিক রহস্যের দ্বার উদঘাটন 


(৮৭ ) 


করিয়াছেন, কিংবা এক একটি রসের খনির সন্ধান দিয়াছেন, তাহা 
কি আর কোথাও পাওয়! যাঁর ?--এইরপে প্রনঙ্গ ক্রমে প্রায়ই শ্রীধরের 
গুণগান করিতেন। পক্ষান্তরে, আমরা অন্গভব করিতাম ষে অতি 
সাধারণ পরিচিত কথাও যখন তাঁহার মুখ দিয়। বাহির হইত, তখন 
যেন তাহার ভিতরে নৃতন অর্থ, নৃতন ভাব, নূতন মাধুর্য পাওয়া 
ফাইত। 

একটি রাত্রির কথা আমার পক্ষে বিশেষ ভাবে ম্মরণীয়। সরস্বতী 
পৃজা। ধর্মরক্ষিণী সভায় ছাত্রগণের উৎসাহে ও উদ্যোগে মহাসমারোহে 
বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীর অর্চনা হয়। ধর্মালোচনা, কীর্তন, দরিদ্রনারায়ণ 
সেব! প্রভৃতি সাত্বিক অঙ্গেরই সেখানে প্রীধান্ | ইহার কয়েকদিন 
পূর্বে বেলুড় মঠের শ্রীমণ প্রেমীনন্দ স্বামী, শ্রীমৎ শিশ্ষলানন্দ স্বামী 
ও শ্রীমৎ অস্বিকানন্দ স্বামী বরিশালে আসিয়াছেন। গ্রেমঘনমৃগ্ি 
প্রেমানন্দজীর প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভিতর দিয় প্রেমধার! বিগলিত 
হইয়া দর্শক মাত্রেরই হৃদয় প্লাবিত করিত বলিয়। বোধ হইত। 
তাঁহাকে দেখিলেই আকুষ্ট হইতে হইত । শ্রীমৎ নির্নলানন্দজী বক্তৃতা 
এ উপদেশ দ্বারা সকলকে মুগ্ধ করিতেন। যুবক অশ্বিকানন্দের 
সঙ্গীতে আননের তরঙ্গ খেলিত। সরস্বতী পুজা উপলক্ষে তাহাদিগকে 
সম্বর্ধনা করিয়! ধর্মরক্ষিণী সভায় আনা হইল। শ্রীমৎ নির্মলানন্ 
স্বামী কিছুকাল বক্তৃতা করিয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসার জন্য শ্রোতৃমণ্ডলীকে 
আহ্বান করিলেন। প্রশ্নোত্তর চলিতে লাগিল। তাহার জ্ঞানগর্ত - 
ও ভ্তিভার্বাদ্দীপক উপদেশে সকলেই আমোদিত ও উপকৃত 
হইলেন। আচার্ধ্যদেবও সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন । 

গৃহে ফিরিয়া কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তিনি আমাকে ডাঁকিলেন। 
ডঃকিবার ভাবে একটু বিম্মিত হইলাম। তিনি সাধারণ ভাঁবে 


(৮৮) 


কথাবার্তা আরম্ভ করিলেন। প্রথমতঃ বলিলেন যে, তুমি ত একটি 
প্রশ্নও করিলে না, ভাবিয়াছিলাম তুমি অনেক প্রশ্ন করিবে । আমি 
ধীরে ধীরে উত্তর করিলাম যে, কোন জিজ্ঞাসা মনে জাগে নাই, অন্য 
কাহারও নিকট প্র্থ করিবার আগ্রহও বড় একটা! হয় না। বিশেষতঃ 
এতদিন এখানে যাহা শুনিয়া আমিতেছি, আজকের উপদেশের মধ্যে 
তদপেক্ষা নৃতন কিছু পাইলাম বলিয়া মনে হইল না। আচাধ্যদেব 
বলিলেন যে, ঘৃতন কিছু শুনিবার কথ! বলিতেছি না, ইহারা সন্ধ্যাসী, 
ইহাদের াপরাস* আছে, সাধাসাধন বিষয়ে খুব দৃতার সহিত 
উপদেশ দিবার অধিকাঁর ইহাদের আছে, ইহাদের কথায় জোর 
পাওয়া যায়; এখানে ত শোন বইয়ের কথ]। 

এই জাতীয় বিনয় আচাধ্যদেবের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল, এবং 
ইহা তীহার কথায় ও ব্যবহারে সর্বদাই প্রকাশ পাইত। তিনি যে 
মুখেই এই প্রকার বলিতেন, তাহা নহে; এইবপ বিনয় তাহার গ্রাণেরই 
একটি বিশেষ সম্পদ ও সৌন্দধ্য ছিল। তিনি যেন আমাদের মতই 
একজন সাধারণ লোক, দশ জনেরই একজন, বয়স কিছু বেশী ও 
দুচারিখানা বই বেশী পড়িয়াছেন বলিঘ্না একটু উপরের ক্লাসের ছাত্র 
মাত্র,_-এইরূপই তিনি নিজেকে মনে করিতেন বলিয়া তাহার কথার 
ভাবে ও ব্যবহারে প্রকাশ পাইত। বহু লোকের ধর্মোপদেষ্টা হইলেও 
তিনি যেন ধর্শজগতে শিশুই ছিলেন। তিনি কখন কখন বলিতেন, 
যে, আমি ছাঁত্রদিগকে নিয়া থাকি ও তাহাদের সঙ্গে ধর্মপ্রসঙ্গ করি, 
ইহার কারণ এই যে, ইহাদের সংসর্গে আমাকে বাধ্য হইয়া ভাল 
থাকিতে হয়, ইহারা আমাকে যে চোখে দেখে, তদহৃরূপ হইবার 
জন্য আমাকে বাধ্য হইয়া প্রধত্ব করিতে হয়, আমার ছুর্ববলতাগুলিকে 
চাপিয়া রাখিবার জন্য সজাগ থাকিতে হয়। এই ভাবের কথা তাহার 


(৮৯ ) 


মুখে শুনিয়া একদিন একজন পণ্ডিত সন্্যাসী আমাদের সম্মুখে তাহার 
বিরুদ্ধে মিথ্যাভাষণের অভিযোগ আনিয়! তীহাকে জব্দ করিয়াছিলেন । 
আমরা কোন দুর্বলতার কথ! জানাইয়া উপদেশ চাহিলে, তিনি 
অনেক সময্ন এমন ভাবে সেই সব কথা গ্রহণ করিতেন, যেন তাহারই 
ছূর্বলতার কথা স্মরণ করাইয়া দেওয়া হইতেছে, এবং উপদেশও এমন 
ভাবে দ্রিতেন, যেন নিজের দোষ সংশোধনেরই উপায় বাক্যের সাহায্যে 
চিন্তা করিতেছেন। 

পক্ষান্তরে তাহাকে যখন লোকে সাধু, মহাপুরুষ ইত্যাদি আখ্য। 
দিয়া নানা ভাবে তাহার প্রশংসাবাদ করিত, তিনি সাধারণতঃ 
চুপ করিয়াই শুনিতেন, প্রফুল্লও হইতেন না, পাসান্্দাসের? ভাব 
দেখাইয়া বিনয়মগ্ডিত প্রতিবাদও করিতেন না। সময়়াস্তরে তাহার 
মুখে লোকের প্রশংসা ও স্ততিবাদদ কি ভাবে গ্রহণ করিতে হয় 
তাহা এইরূপ শুনিয়াছি। লোকে যখন নান৷ প্রকার বিশেষণ 
লাগাইয়া আকাশে তোলে, তখন প্রতিবাদ না করিয়া কি ভাবে 
তাহা গ্রহণ করিতে হয় জান? মনে মনে বুঝিবে ও স্মরণ রাখিবে 
যে, তোমার 'এই সব শুভান্ুধ্যায়ী বন্ধুগণ তোমাকে এরূপ দেখিতে 
চান, তুমি এরূপ প্রশংসাযোগ্য হইলে তাহার! স্থখী হন, তাহার! 
স্বতিবাদের ছলে তোমার জীবনের আদর্শটি তোমাকে ম্মরণ 
করাইয়া দেন। তাহারা তোমাকে যত বড় দেখিতে চাঁন, তার 
তুলনায় তুমি কৃত ছোট, তাত নিজে জান। তাহা ম্মরণ করিয়া 
সেই আদর্শ জীবনে প্রতিফলিত করিতে দৃঢ় সংকল্প হইবে, এবং 
তোমার এ সব বন্ধুরা তোমার আদর্শ উজ্জ্বল, সংকল্প অটুট 
€ জীবন সার্থক করিবার সহায় বলিয়া তাহাদের প্রতি কৃতজ্ঞ 
হইবে ও মনে মনে তাহাদিগকে প্রণাম করিবে। 


( ৯৪) 

কখন কথন আরে! গভীর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তিনি নিন্দা 
প্রশংসা গ্রহণ করিতে শিক্ষা দিতেন। ভগবান আমাদিগকে নানা 
ভাবে কুপা করেন। নিন্দা প্রশংসা তাহার কপারই এক প্রকার 
নিদর্শন ।॥ প্রশংসাকারীরূপে তিনিই আমাদিগকে জীবনের আদর্শ 
স্মরণ করাইয়া দ্রিতেছেন, সেই আদর্শ অনুসরণ করিবার জন্য 
উত্সাহ দিতেছেন, এবং আমাদের আত্মশক্তির উপর শ্রদ্ধ! জাগাইয়! 
তুলিতেছেন। আবার নিন্বাকারীরপে তিনিই আমাদের দুর্বলতা 
তীব্রভাবে চোখে আন্গুল দিয়া দেখাইতেছেন, এবং আমাদের কত 
রকমে পতনের সম্ভীবনা আছে, তাহা বুঝাইয়া দিতেছেন। 
প্রশংসাকারী ও নিন্বাকারী, উভয়ের মধ্যে ভগবানকে দেখিয়।, 
উভয়ের মুখ হইতে ভগবানের ইঙ্গিত বুঝিয়া লইয়া, মনে মনে 
তাহার করুণার জন্য কৃতজ্ঞতার সহিত প্রণাম করিবে। কিন্ত নিজে 
কাহারও নিন্দা করিবে না, বাজে প্রশংসাও করিবে না। তবে 
মহৎ চরিত্র আলোচন। করিবে, যাহার ভিতরে যেটুকু ভাল দেখ» 
তাহা চিন্তা করিবে । তাহাতে নিজের ভিতরে মহদ্ভাব আসিবে । 
লোকের দোষ আলোচনা করিলে, নিজের মনই দূষিত হয় ॥ 
এইসব উপদেশের তাৎপর্য আচাধ্যদেবের ব্যবহারে বেশ প্রত্যক্ষ 
করিতে পারিতাম। তাহার নিন্1া কখন শুনিয়াছি বলিয়া মনে 
হয় না, প্রশংসায় তাহাকে বিচলিত হইতে দেখি নাই। তিনি নিজে 
কাহারও নিন্দা করিতেন না, প্রশংসাও সাধারণতঃ সদালোচনা 
সম্পর্কে প্রয়োজনানুলারেই করিতেন, এবং কোন বিশেষ আদর্শের 
দিকে শ্রোতাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ ও তদন্বর্তনে তাহাদের উৎসাহ- 
বর্ধনের উদ্দেশ্তেই করিতেন। নিরর্থক স্তৌোকবাক্য বা স্তৃতিবাদ 
তাহাকে করিতে শুনি নাই । 


(৯১) 


এখন' সেই রাত্রির কথা বলি। তিনি নিজে শুধু পুথির 
কথাই বলেন, এইরূপ বিনয় প্রকাশ করিয়। স্বামীজির উপদেশ 
সমূহের যেন পুনরাবৃত্তি আরম্ভ করিলেন। স্বামীজির এক একটি 
প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া! তিনি গীতার বাক্য উল্লেখ পূর্বক তাহার 
সমর্থন করিতে লাগিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলিতে লাগিলেন ষে 
দেখ, আজ যত বিষয় প্রশ্নোত্তর হইল, সব বিষয়ের কেমন সুন্দর 
মীমাংসা গীতাতেই আছে; এমন কোন সমস্যা নাই, যাহার 
সমাধান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গীতার মধ্যে পাওয়া ষায় না। 
গীতা যে সকল শাস্ত্রের সার ও বিশ্ব মানবের জীবন নিয়ন্ত্রণে 
সর্বাপেক্ষা উপাদেয় গ্রন্থ, তাহা বুঝাইয়া দ্রিলেন। গীতার এ সব 
ক্লোকের তাৎপর্য ব্যাখ্যাকল্পে ক্রমশঃ স্বাভাবিক ভাবে শ্রীমদ্‌- 
ভাগবতের তদন্থরূপ শ্লোক ও উপাখ্যানসমূহের অবতারণা করিতে 
লাগিলেন। তিনি দেখাইতে লাগিলেন যে, গীতায় যে সব সাধ্য- 
সাধন রহস্য সংক্ষেপে জমাট বীধিয়া গম্ভীর ভাবে উপস্থিত কর 
হইয়াছে, তাহাই কত মোলায়েম করিয়া, কত দৃষ্টান্ত দিয়া, কত 
বিচিত্র রসের ও ভাবের সুবিমিল ধার প্রবাহমান করিছা, 
শ্রীম্দ্‌ ভাগবত আমাদের নিকট উপস্থিত করিয়াছে, এবং আমাদের 
বুদ্ধি ও হৃদয়কে যেন অবগাহন ও সন্তরণ করিবার সুবিধা দিতেছে। 
এই সব বলিতে বলিতে তীাহারও যেন ভাবের বন্যা ছুঁটিল। 
সেখানে যেন ভাগবতেরই একটা আব্হাওয়া স্থষ্টি হইল। ভক্তি- 
প্রেমে তরঙ্গায়িত হইয়া তাহার ব্যাখ্যানের প্রবাহ ছুটিতে লাগিল। 
কেহ তীহার কথ! শ্রবণ ও গ্রহণ করিতেছে কিনা, সে দিকেও 
যেন লক্ষ্য নাই। শ্রোতা যেন উপলক্ষ মাত্র। একটির পর একটি 
হ্বংকর্ণরসায়ন শ্লোক ও লীলার নিগৃঢ় রহস্যের দ্বার উদবাটিত 


( ৯২ ) 


হইতে লাগিল। ভাগবতের চিত্তীধারা, ভাবধারা ও সাধনধারার 
সঙ্গে একট! সাধারণ পরিচয় করাইয়া দিয়া, অবশষে বলিলেন, 
এসব কথার অবতারণা কেন হইল বুঝিলে? নারদের পূর্বজন্মের 
উপাখ্যান মনে পড়ে? একবার মাত্র দেই দাসীপুত্রকে আপনার 
দিব্যরূপে দর্শন দিয়া ভগবান্‌ তাহাকে জানাইলেন যে, এই একবার 
যে তোমাকে দর্শন দ্রিলাম, ইহার উদ্দেশ্য আমার ( ভগবানের ) 
প্রতি তোমার কাম (অন্তুরাগ ) বৃদ্ধি করা। সেইরূপ তোমাকে 
যে এইরাত্রে এত ভাগবত শুনান হইল, ইহা ভাগবতের প্রতি 
তোমার কাম (অর্থাৎ অন্ররাগ ) জন্মাইবার জন্য । মনে ভাবিওন! 
যে শুধু গীতা পড়িলেই তোমার কাজ শেষ হইল? গীতার পরে 
ভাগবতের আম্বাদন চাই। বিগ্যাদ্দেবীর আরাধনার দিবসে নিশীথ 
রাত্রে বিদ্যামন্দিরের একটি নৃতন কক্ষ আচাধ্যদেব আমার নিকট 
খুলিয়া দিলেন। ভাগবতশাস্ত্রে দীক্ষালাভ হইল । তাহার আশীর্ববাদে 
গীতা ও ভাগবত আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই। 

১৯০৮ সনের ঠত্র মাসের শেষভাগে আচার্ধ্যদেব চন্দ্রনাথ, 
আদিনাথ প্রভৃতি তীর্থ দর্শন করিবার মানসে যাত্র! করেন। ছুই 
সপ্তাহের মধ্যেই ফিরিবার কথ!। শ্রীশবাবু, সুর্য্যবাবু প্রমুখ কয়েকজন 
সঙ্গী ছিলেন। আমার এফ, এ, পরীক্ষা শেষ হইয়াছে । কাজেই 
স্থযোগ পাইয়। সঙ্গ ধরিলাম। দিন কয়েকটি আমার নিকট চির- 
স্মরণীয় রহিয়াছে । আচার্ধযদেবকে যেন সেই কয়েকটি,দিন নৃতনরূপে 
পাইয়াছিলাম, এবং সাধুসঙ্গে তীর্থযাত্রার সার্থকতা সে বারই প্রথম 
বিশেষভাবে বুঝিয়াছিলাম। চলাফেরার অভ্যান ত আচাধ্যদেবের 
কমই ছিল। নৃতন নৃতন অবস্থার সংস্পর্শে, নৃতন নূতন দৃ্ 
দর্শনে, নৃতন নূতন ভাবোদ্দীপনায়, তাহার আনন্দোল্লামের ' তর 


( ৯৩ ) 


যেন তাহাকে বেশ একটু আন্দোলিত করিয়াছিল । তাহার ম্বাভাবিক 
গা্ভীধ্য যেন একটু শিথিল হইয়া অন্তরের আম্বাদনকে বাহিরে 
প্রকাশিত হইবার জন্য কিছু স্বযোগ দিয়াছিল। মাঝে মাঝে এক 
আধটুকু বালক ভাবও তাহার আচরণে প্রকাশ পাইত। 

্টামার নদীবক্ষ বিদীর্ণ করিয়া সবেগে চলিয়াছে, সলিলরাশি 
তাহার আঘাতে বিক্ষৃনষ ও স্ষুটিত হইয়া এবং নানা আকারে 
আকারিত ও স্ুর্্যকিরণম্পর্শে নানাবর্ণে রঞ্জিত হ্ইয়া ইতস্ততঃ 
বিক্ষিধ হইতেছে । আচাধ্যদেব ই্টীমারের পার্খে দীড়াইয়। এই 
খেলা! দেখিতে লাগিলেন। মাঝে মাঝে বলিতে লাগিলেন, দেখ, 
দেখ, কত হীরামণি মাণিক্য মুহূর্তে মূহূর্তে স্থষ্টি করিয়া, তদ্বার! 
কতপ্রকার নৃতন নৃতন অলঙ্কার তৈরারী করিয়া, এদ্রিকে ওদিকে 
ছুড়িয়া ফেলিতেছে,-_মান্ুষের সাজপোষাক গহনাপত্র বিলাসভোগের 
সব চেষ্টাকে যেন উপহান করিতেছে । এই সব কথা এমনভাবে 
বলিতেন, যে, তারপরে চাহিয়া দেখিলে ঠিক তদ্রপই দেখা যাইত 
এবং সেইপ্রকার ভাঁবই মনে আমিত। 

স্টামার যখন পদ্মা ও মেঘনার সঙ্গমস্থলে উপস্থিত হয়, তখন এক 
সময় পশ্চাতের দিকে মাত্র পার দেখা যায়, সম্মুখের দিকে কোন 
কূল দৃষ্টিগোচর হয় না। গভীর প্রশাস্তভাবে সেই দৃশ্ত সম্তোগ 
করিতে করিতে আচাধ্যদেব বলিলেন, পেছনের দিকে চাহিও না, 
সাম্নে অনস্তপ্রনারিত জলির প্রশান্ত মৃত্তি দেখ; এই অপার জলধি 
পার হইয়া আমরা পরপারে পৌছিব, জান ত? 

টাদপুরে গাড়ী ধরিয়। অতি প্রত্যুষে সীতাকুণ্ডে পৌছিলাম। 
দর্শনীয় স্থানসমূহ দর্শন করিলাম। নাভিগয়ায় শ্রাদ্ধ করা হইল। 
আচাধ্যদেবও যথাবিধি পিগুদান করিলেন। স্থৃফল দেওয়ার জন্য 


( ৯৪ ) 


একটি বালক উপস্থিত হইল। আমাদের সকলের পক্ষে" আচার্ধ্য- 
দেব টাকা দিয়া তাহাকে প্রণাম করিলেন, এবং আমাদের তীর্থ 
দরশন যে সফল হইয়াছে, তাহা সেই বালকটির মুখ হইতে জানিয়া 
আমর! নিশ্চিন্ত হইলাম। শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্তের হিসাবেও চন্দ্রনাথ 
ও তৎপার্খবর্তী স্থান্সমূহের একটা অনন্তসাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। 
প্রকৃতি দেবী এইক্ষেত্রে আপনার যে মুত্তিটী প্রকাশ করিয়াছেন, যে 
সব ভাবের অভিব্যক্তি করিয়াছেন, তাহা আর কোথাও দেখা যায় 
না। “সহশ্রধার।” ও তাহার রাস্ত। বাল্যকালে দেখিলেও তাহার 
চিত্র চিরকাল হৃদয়ে অস্কিত থাকে । "উনকোটি শিবের বাড়ীতে, 
জনপ্রাণিহীন পর্বতের গ্রহায় প্রকৃতি-নির্শিত অসংখ্য উর্ধমুখ, 
অধোমুখ ও পাশ্বমুখ শিবলিঙ্গের সভা, এবং তাহাদের প্রত্যেকের 
অঙ্গ বাহিয়া অবিরাম সুশীতল বারিধারা নিঃসরণ একটি অকল্পনীয় 
দৃশ্ত । চন্দ্রনাথ পর্বত হইতে দৃশ্তমান সমতলভূমির বৈচিত্র ও 
সমুদ্রের শোভা বিশেষ সন্তোগের বস্ত। বাড়বকুণ্ডের ফুটন্ত জলে 
স্নান, পর্বতগাত্রে স্থানে স্থানে ত্বাভ।বিক অগ্নিকুণ্ড ও দীপশিখ' 
পরিদর্শন--সবই মনোহর | 

আচাধ্যদেবের চোখে মুখে গতিভঙ্গীতে ভিতরের আনন্দের 
অভিব্যক্তি এবং মাঝে মাঝে চমৎকার চমৎকার উপমা দ্বারা দৃস্ত, 
শ্রাব্য ও উপভোগ্য জিনিষগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা সর্বত্রই উহাদের 
সৌন্দধ্য, মাধুধ্য ও গাভ্ভীধ্য বহু গুণ বাড়াইয়া দিত। পার্বত্য 
ঝিঝিপোকার ধ্বনি পর্বতগাত্রে প্রতিধবনিত হইয়া, বেশ জমকাল 
ও মিটি সঙ্গীতের স্থট্টি করে। আচাধ্যদেব আনন্দে বলিয়া উঠিলেন, 
আঃ, কি স্থন্দর সঙ্গীত হইতেছে, শুনিতেছ ?--হরি ওম্‌ ওম্‌ ওম্ঃ। 
একজন পথের সাথী উৎফুল্ন হইয়া তাহার কথার প্রতিধ্বনি করিয়া 


( ৯৫ ) 


বলিলেন, "তই ত, চমৎকার, প্রকৃতির অবিরাম প্রণবজপ। 
তারপর হইতে সত্য সত্যই কাণে বাজিতে লাগিল-_“হরি ওম্‌ ওম্‌ 
ওম্$। লোকে যাকে “বউ কথা কও” পাখী বলে, তার ডাক শুনিলে 
আচার্ধ্যদেব বলিতেন যে, কৃষ্ণপ্রেমিকা কৃষ্ণকে হারাইয়া তাহারই 
অনুসন্ধানে ঘুরিতেছে, আর জিজ্ঞাসা করিতেছে, “সই কৃষ্ণ ৮1 
পাহাড়ে উঠিবার সময় সমুদ্রের দিক হইতে বাতাম আসিয়া গায় 
মাথায় লাগিয়। ক্লান্তি নিবারণ করে। আচাধ্যদেবের মনে হইত 
যে, স্সেহময়ী মা কত দূর দূরাস্্র হইতে ছুটিয়া আসিয়া গায় মাথায় 
কোমল হাত বুলাইয়! সকল ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করিয়া দিতেছেন। 

চট্টগ্রাম হইতে সমুদ্র পথে আদিনাথ যাইতে হ্য়। সমুদ্রের মধ্যে 
কয়েকঘণ্টা মাত্র থাকিতে হয়। ভোরে জাহাজে উঠিলাম। কিছুক্ষণ 
পরে গৈরিকপরা একদল অপরিচিত আদিনাথ-যাত্রী সাঁধু খড়ম ঠক্‌ 
ঠক করিয়া জাহাজে চড়িয়াই আচার্ধাদেবের নিকটে আসিলেন, এবং 
বলিলেন “আপনি জগদীশ বাবু? এই নিন্‌ চিঠি।, আচাধ্যদেব 
অপরিচিত ব্যক্তিকে এইরূপ পরিচিতের ন্তায় সম্বোধন করিতে দেখিয়া 
জিজ্ঞানা করিলেন যে, আপনি চিনিলেন টিরূপে? সাধু বলিলেন, 
“বাঃ, জগদীশকে চিনিব ন1? আমরা ত অবাকৃ। মহেশখালী 
ঘবীপের মালিক জমিদার প্রসন্নবাবু আচাধ্যদেবের আদিনাথযাত্রার 
কথা শুনিয়া সমূচিত অভ্যর্থনার জন্য কাছারীতে তাহার পুত্রের নিকট 
চিঠি লিখিয়া দিয়াছিলেন। “আদিনাথ” মহেশখালী দ্বীপেই নিজ্জন 
বাস করেন। 

জাহাজ যতক্ষণ সমুদ্রের মধ্যে ছিল, ততক্ষণ আচাধ্যদেবের কত 
প্রকার ভাবের অভিব্যক্তি দেখিলাম, ও কত ভাবের কথা শুনিলাম। 
সমুত্রদর্শন আমার এই প্রথম, এবং সম্ভবতঃ আচার্্যদেবেরও প্রথম । 


( ৯৬ ) 


এক একটি দৃশ্য দেখিয়া তিনি ভাবজগতে এক এক রান্ট্যে বিচরণ 
করিতে লাগিলেন। আমাদের অধিকারান্যায়ী ছু চারটি বাণী 
আমাদিগকেও শুনাইলেন। কর্ণফুলী নদী সমুদ্রের সহিত মিলিত 
হইয়াছে । সঙ্গমস্থলে মাঝে মাঝে দেখিলাম, সমূদ্র হইতে এক এক 
থণ্ড ঘননীল পরিষ্কার জল কোনক্রমে নদীর ঘোল। জলের আবেষ্টনীর 
মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছে, এবং কিছুক্ষণ যেন আপনার বৈশিষ্ট্য ও নৈ্দল্য 
রক্ষা করিবার জন্য যথাসম্ভব লড়াই করিয়া অবশেষে হতাঁশভাবে ঘোলা 
জলের সঙ্গেই মিলিয়! যাইতেছে । আচাধ্যদ্দেব সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ 
করিয়া দেখাইলেন যে, দেখ সংসারের ঘোলার মধ্যে বা অসাধু 
আবেষ্টনীর মধ্যে এক একজন নিশ্মলচরিত্র সাধু আতিয়া পড়িয়া কি 
অবস্থা প্রাপ্ত হইতেছে । আবার, সমুদ্রের মধ্যে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইলে 
স্থানে স্থানে ইহার বিপরীত দৃশ্ঠ দেখ। যাইতে লাগিল। সর্বদিকৃব্যাপী 
পরিষ্কার নীলাম্বুরাশির মধ্যে এক একখণ্ড মলিন ঘোলা জল প্রবেশ 
লাভ করিয়া, তাহারই তরঙ্গের সঙ্গে নাচিয়া খেলিয়া, ক্রমশঃ তাহারই 
ধশ্ম প্রাপ্ত হইতে হইতে অবশেষে তাহার মধ্যেই আত্মসমর্পণ করিয়! 
ধন্য হইতেছে । আচাধ্যদেব সানন্দচিত্তে দেখাইয়া দিলেন যে» 
কোনক্রমে মহতের সহিত সম্বন্ধ স্থাপিত হইলে কিংবা সাধুগ্রভাবের 
মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিলে কি স্থন্দরভাবে জীবন কৃতার্থ হইয়া 
যায়। 

সম্মুখে অনন্তপ্রসারিত নিশ্চল গভীর মহাকাশের সহিত উত্তাল 
তরঙ্গমালাস্থশোৌভিত অসীম মহাসমুদ্রের কোলাকুলি ,দেখিয়া তাহার 
কি আনন্দ! সেই আনন্দহিল্লোলের মধ্যে কখন পুরুষ-গ্রকৃতির 
সংযোগ, কখন শিবশক্তির বিহার, কখন বুদ্ধচৈতন্যের মিলন,-এই 
প্রকার কত ভাবই যেন খেলিতে লাগিল। ভাষার ভিতর দিয় 


€( ৯৭ ) 


স্বেই সব ভাবের কিছু কিছু উথলিয়া পড়িতেছিল। আমরা প্রসাদ 
পাইলাম । 

এক সময় উর্দদিকে অঙ্গুলি নির্দেশপূর্ববক বলিলেন, এ দেখ বুন্ধ- 
দেব, এবং নিম্মদিকে অঙ্গুলিনির্দেশপূর্বক বলিলেন, এই দেখ 
চৈতন্যদেব । বুদ্ধদেব মহাকাশ এবং চৈতন্তদেব মহাসমুদ্র । ছুইই 
মহান্‌্, ছুইই অসীম ও অগাধ। কিন্তু একজন স্থির ধীর নিশ্চল, 
জ্ঞান প্রেমের প্রশান্ত মৃত্তি, আর একজন তরক্গময়, প্রেমে মাতোয়ারা, 
হাসে, কাদে, নাচে গায়। সমুদ্র আমাদের নিকটে, ইহার মধ্যে 
ডুব দেওয়] যায়, সাতার কাটা যায়, ঢেউএর সাথে সাথে ভাসা! যায়, 
ওঠ নামা যায়, হুড়াহুড়ি করা যায়, স্ফত্তি করা যায়, ঠাণ্ডাও হওয়া 
যায়। আকাশের মাধুর্য বুঝিতে হইলে, তাহার সঙ্গে প্রাণের 
স্পন্দন মিলাইতে হইলে, ধ্যানে বসিতে হয়, দেহেন্দ্রিয়মন সংযত 
করিয়া বুদ্ধিকে প্রশান্তবাহিনী করিতে হয়। সমুদ্রকে নিয়! খেল। 
যায়, আকাশকে দূব হইতে সসন্ত্রমে প্রণাম করিতে হয়। 

আদিনাথ দর্শন করিয়। পুনরায় জাহাজে চড়িয়া কক্স বাজার গমন 
করিলাম) কক্স বাজারে বৌদ্ধদের প্রতিষ্ঠানসমূহ দেখিয়া খুব আনন্দ 
হইল। সে দিন বিষুবসংক্রান্তি উপলক্ষে বৌদ্ধদের একটি বিশেষ 
উত্সব ছিল। দোলপুণিমার রংখেলার অন্গরূপ জল-খেলায় সে দিন 
বৌদ্ধ ছেলেমেয়েদের স্ফৃত্তি দেখিয়া বিশেষ আনন্দ লাভ হইল। 
কিন্ত আচাধ্যদেবের বাঁলকভাব প্রকাশ পাইল সমুদ্রন্নানে। জাহাজে 
সমূত্র দর্শন মাত্রই হইয়াছিল, তাহার সঙ্গে মাখামীখি হয় নাই। কক্স 
বাজারে সেই স্থযোগ লাভ হইল। আ্রানে যাইবার পথে দূর হইতে 
সমুদ্র দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্র তাহার সহিত সাক্ষাৎ অব্যবহিত 
মিলনের সম্ভাবনাতেই আচার্ধদেব আনন্দের আতিশয্যে বালকের ন্যায় 

৭ 


(৯৮) 


চীৎকার করিয়া উঠিলেন--“অগ্ধ মে সফলং জন্ম” ॥ তাহারভাবাতি- 
ব্যক্তিতে সমুদ্র ষেন আমাদের নিকট আরও সুন্দর হইয়া দেখা দিতে 
লাগিল। তীরে পৌছিয়াই প্রণাম করিয়! সকলেই ঝাঁপাইয়া পড়িলাম। 
আচাধ্যদেবের নিউরাল্জিয়া-গ্রস্ত দেহে অবগাহন-ন্নান সাধারণতঃ 
সহ হইত না। কিন্তু সমুদ্রাবগাহন হইতে বঞ্চিত হওয়। যে তদপেক্ষাও 
অসহ্া। তিনিও নামিয়! কতক সময় তরঙ্গের দোলায় ছুলিয়া লইলেন । 
আমাদের সে আনন্দ ত্যাগ করিয়া উঠিতে অবশ্যই কিছু বেশী সময় 
লাগিল। তীরে উঠিবার পরেও সেই গভীরাত্ম! পুরুষের সারা দেহের 
ভিতরে যেরূপ একটা চাঞ্চল্য লক্ষিত হইতে লাগিল, তাহাতে মনে 
হইল যে, তিনি অতিশয় সংঘমের সহিত নাচিবার প্রবৃত্তি দন 
করিতেছেন। এক একবার দৌড়িয়া আসিয়া! গা আলিঙ্গন করিয়! 
বলিতেছেন, “কেমন লাগে! তাহার যেন ইচ্ছা হইতেছিল যে, তাহার 
আনন্দের তরঙ্গগুলি আমরা নাচিয়া দৌডিয়া গড়াগড়ি করিয়া, 
চীৎকার করিয়া বাহিরে প্রকাশ করি। 

মাঝে মাঝে তিনি বলিতে লাগিলেন, যে, আজ কেবলই জগন্নাথের 
কথা স্মরণ হইতেছে । হাত বাঁড়াইয়৷ বলিলেন, দেখ, ঠিক এই সোজা 
জগন্নাথক্ষেত্র । কি মনে হইতেছে, জান? “এভবসাগর, হবে বালুচর, 
হাটিয়া হইব পার”$। আমর! এক একবার তরঙ্গান্দোলিত আকাশা- 
লিঙ্গিত অনন্তপ্রসারিত মহাসাগরের মহীয়সী শোভ। নিরীক্ষণ করিতে 
লাগিলাম, আবার একএকবার এই ভাবান্দোলিত, জগন্নীথালিঙ্গিত 
বিশালহদয় মহাপুরুষের গাম্ভীধ্যসংযমিত আনন্দহিলোল আম্বাদন 
করিতে লাগিলাম। আমার মনে হয় যে, তাহার এই দ্বিনের ভাবমাধুরী 
দেখিবার সৌভাগ্য যদি না হইত, তবে তাহার হৃদয়ের একটা 
দিকের পরিচয় পাওয়। যেন বাকী থাকিত। কারণ, সেই দিনের সেই 


( ৯৯ ) 


ঝনরীয়ান্‌, থালকটার সঙ্গে এমন ভাবে আর কখন আমার সাক্ষাৎ 
ঘটে্লাই। 

সমুদ্র তরঙ্গের একটি বৈশিষ্ট্যের দিকে তিনি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ 
করিয়াছিলেন । দূর হইতে এক একটি প্রকাণ্ড অখণ্ড তরঙ্গ সবেগে 
তীরের দিকে ধাবিত হইয়া আসে, এবং নিকটে আসিয়া ভাঙ্গিয়া 
পড়িয়া, তিন খণ্ড, চারি খণ্ড বা পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত হইয়া, তীরের 
সহিত সংঘর্ষ করিতে থাকে । পাচ খণ্ডের বেশী কখন হয় না । এইটাই 
মায়াপাগরের স্বভাব । মায়াসাগরের অখণ্ড বিষয়তরঙ্গ আমাদের 
পঞ্চেন্িয়ের সমীপব্তী হইয়াই, শব্বম্পর্শরূপরসগন্ধ এই পঞ্চবিষয়রূপে 
বিভক্ত হইয়া আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং চিত্তের ভিতরে বিক্ষোভ 
উত্পাদন করে, কখন কখন পঞ্চেক্দ্রিয়েরই বিষয় ন! হইয়া কম্ও হয়, 
কিন্তু বেশী হয় না। তরঙ্গাধাতে যাহাদের স্থিরভৃমি হইতে পদস্থমলন 
হয়, তাহার! হাবুডুবু খাইয়। নানাপ্রকার রেশ পায় এবং কখন কখন 
অগাধ জলে পড়িয়। গিয়া প্রাণ হারায় । স্থিরভূমিতে দৃঢ়ভাবে দ্রাড়াইয়! 
মায়াসাগরের খেল। নস্তোগ করিতে পারিলে বেশ হয়। এসনন্ধে তিনি 
যে একটি চিত্র বর্ণন করিয়াছিলেন, পূর্বেই প্রসঙ্গক্রমে তাহার আভাস 
দিয়াছি। 

এইরূপে সেই এক সপ্তাহের ভ্রমণে আচাধ্যদেবকে দেখিয়া ও 
তাহার কথা শুনিয়। নানা প্রকার শিক্ষা লাভ হ্ইয়াছিল। এই 
উপলক্ষে যাহা দেখিয়াছি, শুনিয়াছি ও অনুভব করিয়াছি, তন্মধ্যে 
অনেক জিনিষ্জীবনের চিরসম্বল হইয়া রহিয়াছে । কিঞ্চিৎ আভাস 
মাত্র এখানে দেওয়! হইল। 

অতঃপর আচাধ্যদেবের ধশ্মোপদেশের ধারা সম্বদ্ধে কিঞ্চিৎ 
আলোচনা করিয়া প্রসঙ্গের উপসংহার করিব। এতৎসম্পর্কে ছুইটি 


(১০০ ) 


বৈশিষ্ট্য আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়াছি, এবং এ ছুইটি 
আমাকে চিরকাল বিশেষভাবে আকর্ষণ করিয়াছে । প্রথমতঃ উহার 
উপদেশের মধ্যে কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক সন্বীর্ণতার লেশমাত্রও 
ছিল না। তিনি নিজেও কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের অস্তভূক্ত 
ছিলেন বলিয়া জানা যায় নাই। শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, ব্রাহ্ম, 
বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমান--সকল মত ও সকল সাধনপ্রণালী তাহার 
নিকট আদর পাইত । সকল সম্প্রদায়ের ধাম্সিক লোকই তাহার 
উপদেশ শুনিয়া, তাহার সহিত আলোচনা করিয়া, আপ্যায়িত ও 
উপকৃত হইতেন। তাহার বাক্যে কাহারই নিজ নিজ গুরুপরম্পরাগত 
ভাবধারা ও সাধনধারায় বিক্ষোভ সৃষ্টি হইত না। মানব প্রকৃতি 
ও তাহার বিচিত্রর্ূপে অভিব্যক্তি, মানবমন ও তাহার বিচিত্র রুচি, 
শক্তি ও সংস্কার, পরম সত্য বস্তু ও বিভিন্ন মানবচিত্তে তাহার 
বিচিত্রভাবে প্রকাশ, মানব জীবনের চরম লক্ষ্য ও বিচিত্র ধারায় 
বিচিত্র স্বভাবান্বিত মানবের সেইদিকে জীবনের গতি, সনাতন 
মানবধশ্ম ও তাহার বাহ্াকৃতির উপর দেশ, কাল, পারিপাশ্বিক 
অবস্থা, মানসিক সংস্কার, বুদ্ধির বিকাঁশ প্রভৃতির বিভিন্নতার 
প্রভাব এইরূপ একের টৈচিত্র্য ও বিচিত্রের এঁক্য তিনি এমন 
গভীর ও ব্যাপকভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন, যে, তাহার চিন্তার 
মধ্যে কোন বিরোধের অসমাধান থাকিত না। তিনি এক একটি 
সমস্যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা অবলম্বনে সমাধান করিতেন, 
এবং মূলতত্বের আলোকে তাহাদের এক্য সন্ধ্শম করিতেন। 
সেই হেতু তাহার নিজের প্রাণের ভিতরেও কোন সন্কীণণতা 
বা গৌড়ামি ছিল না, এবং তাহার উপদেশের মধ্যেও কোন 
প্রকার সঙ্থীর্ঘতা বা! গৌড়ামি প্রকাশ পাইত না। তিনি শৈবের 


( ১০১ ) 


সহিত .শৈবদৃষ্টিতে, বৈষণবের সহিত বৈষ্ঞবনৃষ্টিতে, শাক্তের সহিত 
শাৃষ্টিতে, খৃষ্টান ও মুসলমানদের সহিত তাহাদের দৃষ্টিতে সাধা- 
সাধনতত্ব আলোচনা করিতেন ; এবং মূল সাধ্যতত্ব যে সকলেরই 
এক ও অভিন্ন, এবং মূল সাধনতত্বও যে শ্বরূপতঃ এক ও অভিন্ন 
ইহা প্রতিপাদন করিয়া প্রত্যেকেরই আধ্যাত্মিক জীবন বিকাশের 
অস্তরায়স্বরূপ সঙ্ীর্ণতা ও গৌঁড়ামি দূর করিতে প্রয়াসী হইভেন। 
প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকের সঙ্গেই সমানভূমিতে দীড়াইয়া৷ অকপট 
সহানুভূতির সহিত আলোচনা করিতেন বলিয়া তাহার উপদেশ 
গ্রহণ করিতে কাহারও দ্বিধাবোধ হইত না। বিশেষতঃ, যুক্তি 
প্রমাণ ব্যতীত তিনি কোন কথা বলিতেন না, নিজের মত বা 
'অনুভূতি বলিয়া কোন সিদ্ধান্ত খ্যাপন করিতেন না, তাহার 
ব্যক্তিত্বের খাতিরে কিংবা তাহার প্রতি অদ্ধাবশতঃ কোন বথা 
মানিয়া লইতে বলিতেন ন|। 

অন্যদিকে বর্তমান ধরন্মসম্প্রদায়সমূহের মতবাদ, সাধনপদ্ধতি, ও 
আচারব্যবহারের মধ্যে যে সব কুসংস্কার, গৌড়ামি, অনাচার, 
ব্যভিচার, বাহ্ান্ুষ্ঠানসর্ধন্বতা, সার পরিত্যাগপূর্বক খোসা লইয়া 
ব্যস্ততা, প্রভৃতি দোষ প্রবেশ করিয়াছে, সেইসব দোষ প্রদর্শন 
করিতেও তিনি কুন্তিত, লজ্জিত বা ভীত হইতেন না। বিভিন্ন 
সম্প্রদায়ের লোকের কাছে তাহাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের 
আগন্তক দোষগুলি সেই সেই সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ও আচাধ্য 
মহাপুরুষগঞ্জেরই উপদেশের তাৎ্পধ্য অবলম্বনে এবং মানবীয় 
ধশ্মের সনাতন আদর্শের আলোকে এমনভাবে তিনি দেখাইয়! 
দিতেন, যে, প্রত্যেকেই তাহাকে নি নিজ সম্প্রদায়ের একজন 
শুভাকাজ্ষী সর্বজনপ্রেমিক আচার্য বলিয়া অনুভব করিতেন, 


(১০২ ) 


কেহই তাহার প্রতি অন্ত কোনরূপ ভাব পোষণ করিতে গারিতে্ 
না। কোন ব্যক্তি জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বিন্দুমাত্রও ঘষ 
বা জর্ধ্যা না থাকায়, সকলের প্রতিই অকৃত্রিম প্রেম তাহার 
হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, তাহার গাল।গালিও অনেকটা মিষ্ট বোধ 
হইত, এবং প্রত্যেক কথার মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি নিহিত 
থাকিত। 

একদিন আমাদের সম্মথে একজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ খুষ্টধম্ম- 
যাজক আচাধ্যদেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন। বিভিন্ন 
দেশীয়, বিভিন্ন জাতীয় ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ান্বর্তী বিশিষ্ট ধন্মাথিগণ 
এইরূপ অনেকেই আসিতেন। ধাহাদের ধশ্ম সম্বন্ধে বিশেষ অন্ু- 
রাগ আছে, এমন কোন নবাগত ব্যক্তি বরিশালে আপিলে 
্বভাবতঃই আচার্ধ্য জগদীশের নাম ও প্রশংসা শুনিতেন, এবং 
এরূপ মহাত্সাকে দর্শন করিতে ও তাহার সহিত ধশ্শীলোচন। করিতে 
স্বভাবতই আগ্রহান্বিত হইতেন। পূর্বোক্ত সাহেব আসিয়া বারান্দীয় 
তক্তাপোষের উপর বসিলেন, এবং আচার্যদেব তাহার সেই ভাঙ্গ। 
মোড়ায় বসিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিলেন । খুষ্টানধম্দ ও বৈষ্ণব- 
ধম্ম এবং থৃষ্টের জীবন ও উপদেশ ও কৃষ্ণের জীবন ও উপদেশ 
সম্বন্ধে তুলনামূলক আলোচনা আরম্ভ হইল। সাহেব তাহার 
স্বাভাবিক ও অজ্জিত সংস্কার অনুসারে খুষ্ট ও খুষ্টানধন্মের প্রাধান্য 
সম্বন্ধে চিরপ্রচলিত যুক্তিসমূহের উতাপন করিলেন। আচাধ্যদেব 
বাইবেল, গীতা ও অন্যান্য শান্তর হইতে প্রমাণ উদ্ধৃত ক্ষরিয়া, সেই 
সব প্রামাণিক বাক্যের তাৎপর্য্য ব্যাখা করিয়া, তত্সঙ্গে দার্শনিক 
ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির অবতারণ! করিয়া উভয় ধর্মের ভিত্তিগত এক্য 
ও আকারগত বৈশিষ্ট্য নিব্পণ করিলেন। যাহারা খৃষ্টধর্্মাবলম্বী 


( ১০৩) 


বা নয়া পারচিত, তাহারা যে অনেক ক্ষেত্রেই খুষ্টকে অনুসরণ 
করে লা, খুষ্টের উপদেশের তাৎ্পধ্য অন্রধাবন করিতে ঘথোচিত 
চেষ্টাও করে না, খুষ্টের প্রতি বিশ্বাসের যথাথ মশ্ম উপলব্ধি 
করিতে পারে না, ইহাও তিনি ঘুক্তিলহকারে দেখাইয়া দিলেন। 
পক্ষান্তরে টৈষ্ণচব সম্প্রদায়ের বর্তমান আচারব্যবহার, সক্কীণভ!, 
গৌড়ামি প্রভৃতি দেখিঘ! বৈষ্ণব্ধশ্ম সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণের ধশ্ম ও চৈতন্থের 
ধশ্ম সম্বন্ধে--কোন ধারণা করিলে যে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত হইবে, বৈষ্ণব 
ধন্ৰের স্বরূপ বোঝ! যাইবে না, তাহাও তিনি প্রদর্শন করিলেন। 
বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভিতরে যে সব গলদ ঢুকিয়াছে, লাহেবের 
নিকটে তাহা স্বীকার করিতে তিনি কুষ্ঠিত হইলেন না। বৈষ্ণব 
ধর্মের যথার্থ স্বরূপ সাহেবকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। বেষ্ণব- 
ধন্ম ও খুষ্টানধন্ম্ উভয়েরই যে বিশেষ সংস্কার আবশ্যক, তাহা 
ঘোষণা করিয়া তিনি বলিলেন--0 €৮1) 00701508101 1795 60 
195 10011115019,101500 2170 ৬৫15171121577] 11875 69 102 16- 
ড0151)1791500. 

আচাধ্যদেব অনেক সময় কালীবাড়ী যাইতেন এবং কালীমুস্তির 
সম্মুখে বহুক্ষণ স্থিরভাঁবে বসিয়। থাকিতেন। কালীবাড়ীর সিদ্ধ 
মহাপুরুষ পৃজ্যপাদ সোনাঠাকুর যত দিন স্থল দেহে ছিলেন, ততদিন 
ত প্রায়ই যাইতেন। উভয়ের মধ্যে এমন প্রেমের আকর্ষণ ছিল, যে, 
জগদীশকে ছু একদিন দেখিতে না পাইলে ৫সই সর্বত্যাগী মহা 
পুরুষের যেন "অন্বস্তিবোধ হইত এবং তিনি তাহার সংবাদ জিজ্ঞাসা 
করিতেন ও সংবাদ পাঠাইতেন, এবং জগদীশেরও তাহাকে না দেখিলে 
যেন চিত না, তাহার নিকটে প্রায়ই গিয়া কতক্ষণ সঙ্গ করিতেন। 
্রাঙ্মমূমাজের সঙ্গেও আচাধ্যদেবের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল, পূর্বে আরও 





(& ১০৪ ) 


বেশী ছিল। ব্রাঙ্গবন্ধুগণ তাহাকে তীহাদেবই একজন মনে কবিতের্। 
আচার্ধ্যদেবেব মুখে শুনিয়াছি যে, তিনি কালীবাঁডীতে বোজ£বোজ 
যান কালীমৃহ্টিব দিকে চাহিয়া বসিয়া থাকেন, সেই মন্তিব নিকটে 
ভূলুষ্িত হইয়া প্রণাম কবেন, ইহা তাহাব ত্রাক্মবন্ধদেখ দষ্টিতে 
নিতান্ত বিসদৃশ বোধ হইত। কেহ কেহ তাহাকে জিজ্ঞাসা কবিয়াছেন 
যে, তাহাব মত একজন 7২৭190011 ( অর্থাৎ কুসংক্কাবমুক্ত 
যুক্তিবাদী ভ্রানী লোক ) এরূপ কবেন কেন, ইহাঁতে তাহাঁব আধ্যাত্মিক 
জীবনে কি উপকাব হব? তিনি বলিযাছেন যে, এই প্রকার 
প্রশ্নেব উত্তবে তিনি কাঁলী সম্ন্ধে তাহাৰ ভাব এইবপ ব্যক্ত কবিতেন। 
তন দেখেন যে, একটি প্রক'গড মেয়ে ১ উপঙ্গ--কাবণ কোন কাপ 
তাহাকে বেষ্টন কবিতে “বে না, তাশাব আদি অন্ত মধ্য কিছুই 
পগযা যাঁধ শা, অনবব-হ চলাই তাহাব স্বভাব, শ্াতাব ৮লাব 
ভিতবেই সব শক্তিব অভিব্যন্তি ১ তিনি মুহর্তে মুত্র প্রসব 
করিতেছেন, ৮কালে তুলিষ। কিছুক্ষণ লাপন পালন কবিতেছেন, 
আবাব গ্রাস কবিযা 'ফলিতেছেন » তাহাব এই স্বভাবসিদ্ধ কম্ম 
হইতেই বিশ্বেব সব কিছুব উৎপত্তি স্থিতি ধ্বংস, আবাব, এই 
কম্মের সঙ্গেই তিনি বাম হস্তে স্বপ্রস্থত অশুভ শক্তিগুলিব বিনাশ 
সাধন কবিতেছেন ও দক্ষিণ হস্তে অভয় শান্তি মঙ্গলের প্রতিষ্ঠা 
কবিতেছেন , তীহাব নিত্া আশ্রষফ সচ্চিদানন্দম্ববপ শিব ম্বযং 
নিক্ষিয নির্ব্বিকীৰ থাকিয়া তাহাকে ধাবণ কবিয়া আছেন, এবং 
তাহ[বই বুকেব উপব দ্রীভাইয়া এ মেষেটা নিত্যকাল নাঁচিতে নাচিতে 
তাহাব বিশ্বম্য খেলা খেলিঘ্না চলিয়াছেন। এ মেয়েটাকে মা বলিয়া 
তাহার শবণাগত হইলে, নিজেব ভিতবেব অন্থব নাশ হয়, অভয় 
অমৃত ক্ষেম লাভ হয়, এবং তীহাঁব কার্যেব প্রতি উদাসীন হয়! 


০) ৮: / 0১৯ 01 
রর 1 
30 


লিসা 


১ 
0৬৬৬ 





(১০৫ ) 


তাহার চবণতলে পতিত হইতে পারিলে শিবের সঙ্গে মিশিয়! যাঁওয়া 
যায়। *এই প্রকাব ব্যাখ্যা করিয়া তিনি তাহার প্্রশ্নকারীদিগকে 
পাণ্টা জিজ্ঞাসা করিতেন, যে দেখুন দেখি, এর মধ্যে কিছু 170001791 
আছে কিনা? কালীমৃত্তির ভিতরে ব্রহ্ম ও তাহার অঘটন-ঘটন- 
পটীয়সী মহাশক্তির স্বরূপটী এমন ভাবে পরিস্ফুট, ইহা তাহার মুখে 
শুনিয়া ব্রাহ্মবন্ধুগণ অবাক্‌ হইয়া গেলেন । তীহার কথা শুনিয়া 
কালীমৃদ্তির ভিতরে তিনি কি দেখেন এবং আমরা কি দেখি, তাহ! 
চিন্তা করিয়া, তীহাঁর চক্ষু যে কিরূপ ভিন্ন উপাদানে গঠিত হইয়া 
গিয়াছে, বিন্ময়াভিভূত চিত্তে তাহা ভাবিতে লাগিলাম। এইবপে, 
কোন্‌ দেবমু্তিতে কি প্রকার ভাগবত ভাব প্রকটিত এবং কিরূপ 
দৃষ্টি লইয়া দেবমূন্তি দর্শন করিতে হয়, তাহা আচার্্যদেবের নিকটে 
নানা উপলক্ষে শিক্ষা পাইয়া ধন্য হইয়াছি। 

আচাধ্যদেবের আশ্রমে শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের যুগলমৃত্তি উপাস্যরূপে 
সর্ধোপরি প্রতিচিত হইয়াছে । তিনি এ ক্ষেত্রে এরূপ সাম্প্রদায়িকতার 
প্রশ্রয় কেন দিতেছেন, এ সম্বন্ধে তাহাকে প্রশ্ব করা হইয়াছিল। 
এ বিষয় তাহার মত যাহা বুঝিয়াছি, তাহা এই । তত্বতঃ কৃষ্ণ, 
কালী, শিব, দুর্গা, গণেশ, সৃর্য্য প্রভৃতি সব উপাস্য দেবতাই এক, 
কোন ভেদ নাই। পার্থক্য নামে ও রূপে, স্বরূপে কোন পার্থক্য 
নাই । রাম, নৃসিংহ, বৃদ্ধ, জিন,যে নামেই ভগবান্কে স্মরণ 
করা হউক ও যে রূপেই তাহাকে ধ্যান করা হউক, বস্ততঃ ধ্যেয়,স্মরণীয়, 
আশ্রঘনীয় এক সর্ধনামাতীত সর্বরূপাতীত অদ্ধিতীয় ভগবান্‌। আমরা 
নামরূপের অধীন, সেই হেতু নামরূপ অবলম্বনেই নামরূপাঁতীতের সহিত 
আমাদের চিত্তে যোগসাঁধন করিতে হয়। বিভিন্ন নাষে, বিভিন্নরূপে 
ভগবানের আরাধনা মহাপুরুষগণ কর্তৃক মানব সমাজে প্রচারিত হইয়াছে, 


( ১০৬ ) 


এবং তাহার ফলে বিভিন্ন সাধনার ধারা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ত্ি 
হইয়াছে। মানুষ নিজের রুচি বুদ্ধি প্রকৃতির অনুকুল এবং দেশকাল 
পারিপাশ্থিক অবস্থার অনুকুল এক একটি ধারা অবলম্বন করিয়া, 
ক্রমশঃ দেহ মন বুদ্ধির বিশুদ্ধি সম্পাদনপূর্বক ও জ্ঞানভক্তির 
বিকাশসাধনপূর্বক, চরমে সকল সাধনধারার লক্ষ্য এক অভিন্ক 
ভগবত্ৃত্বে পৌছিতে পারে। তখন কোন সাম্প্রদায়িকতা থাকে না, 
ভেদবুদ্ধিও থাকে না, ভিতরে বাহিরে সর্বত্র সকল নামরূপের 
মধ্যে এক অদ্বিতীয় সচ্চিদানন্দঘন ভগবানেরই সাক্ষাৎকার 
লাভ হয়। 

এক একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে, এক একটি সাধনধারার মধ্যে 
ভাগবতভাবের এক একটি দিক বিশেষরূপে পরিস্ফুট ও বিকাশপ্রাপ্ত 
হইয়াছে । ভগবত্তত্ব, জীবতত্ব, জগত্তত্ব, ভগবানের সহিত জীবজগতের 
সম্বন্ধ, সাধ্যের সহিত সাধকের সন্বন্ধ'_ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্যেকটি 
সম্প্রদায়ের চিন্তাধারার মধ্যে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সেই বৈশিষ্ট্য 
তাহাদের দূষণ নয়, ভূষণ) তৎ্সম্বদ্ধে গৌঁড়ামি ও সঙ্ীর্ণতাই 
দূষণীয়। 

এই সব বিশিষ্ট চিন্তাধারা ও ভাবধারার বৈশিষ্ট্য বিচাঁর করিলে, 
শ্রীমদ্‌ ভাগবত ভগবত্ত্বটী ক্রমাভিব্যক্তির পদ্ধতিতে ক্রমশঃ ইহার 
আবরণের পর আবরণ উন্মোচন করিতে করিতে বুন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণ- 
তত্বের ভিতরে যেমন পরিপূর্ণব্ূপে অভিব্যক্ত করিয়াছেন এবং 
বাংলার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্ত নিজের গভীরতম অনুভূতির প্রকাশ দ্বারা 
এই তত্ব্টা যে ভাবে নিজের অন্তরঙ্গ ভক্তদের হৃদয়ে ফুটাইয়] 
তুলিয়াছেন, তাহার মধ্যে সকল ভাব ও চিন্তার পরাকাষ্ঠা আচার্ধ্য 
জগদীশ দেখিতে পাইয়াছিলেন। ভাগবত ও চৈতন্যাদেবের শ্রীকৃষণ- 


( ১০৭ ) 


প্রেমের মধ্যে সকল কম্মসাধনা, জ্ঞানসাধনা ও ভক্তিসাধনার চরম 
পরিপূর্ণত্বা তিনি অনুভব করিয়াছিলেন। 

সর্বভাবাতীত অবাঙমনসগোচর কেবলাদৈত ভগবানকে আমর 
ধারণার বিষয়ীভূত করিতে পারি না, স্থতরাং তাহার আরাধনাও 
সম্ভব হয় না। ভাব অবলম্বনেই তাহার ধারণা ও আরাধন। সম্ভব 
হয়। ভাবের মধ্যেই তিনি ব্যক্ত হন, বিশেষ আকার পরিগ্রহ 
করেন, বিশেষ গুণগণে ভূষিত হন। ভাবের দৃষ্টিতেই তিনি 
লীলাময়রূপে আম্বাদা হন, শক্তি এশ্বধ্য জ্ঞান কশ্মাদির আধাররূপে 
গ্রাহ হন। ভাবসমষ্টিই তাহার দেহ, তাহার আত্মপ্রকাশক্ষেত্র, 
তাহার আত্মাস্বাদনক্ষেত্র । ভাবের সঙ্গে ষোগেই তাহার সকল সম্বন্ধ 
এবং সকল গুণ ও কম্ম। যে ভাবের মধ্যে ইন্দিয়গ্রাহ্হ বিশ্বজগৎ 
একটা প্রকাণ্ড সত্য বলিয়া প্রতিভাত হয়, সেই ভাবের ভাবুক এই 
জগতের সম্বদ্ধে তাহাকে স্বগ্িস্থিতিপ্রলয়কর্তীরপে ধারণা করিয়। 
তাহার আরাধনা করেন। আবার, যে ভাবের মধ্যে এই জগৎ- 
বৈচিত্র্য মিথ্যা বলিয়! প্রতিপন্ন হয়, সেই ভাবের ভাবুক তাহাকে 
মায়াতীত সংসারাতীত অশব্দ-অস্পর্শ-অরূপ-অব্যয় প্রভৃতি নিষেধাত্মক 
ভাবের সাহায্যে ধারণ! ও ধ্যান করেন। তীহাকে সচ্চিদানন্বস্বরূপ 
ভাবি, বা দয়াময় প্রেমময় মহিমময় ভাবি, তাহাকে সর্বজ্ঞ 
সর্বশক্তিমান সর্বেশ্বর্ধ্যসম্পন্ন ভাবি, কিংবা জ্ঞানাতীত ভাবাতীত 
শৃক্ত্যশ্বর্যবিবঙ্জিত ভাবি, তাহাকে সগ্ডণ ভাবি বা নিগুণ ভাবি, 
সাকার ভাবি বা*নিরাকার ভাবি,_সবই ত আমাদের ভাবনা, সবই 
ত ভাব-অবলম্বনে ও ভাবাহ্গরূপ সম্বন্ধ-অবলম্বনে তাহার ধারণা ও 
চিন্তা। খখন তাহাকে ভাবাতীত বলি, তখনও ভাবাশ্রয় করিয়াই 
সকল বিশেষভাবের নিষেধ দ্বারা তাহার স্বন্ধে একটা অস্ফুট ধারণ! 


(১০৮ ) 


করিবার চেষ্টা করি। ভাব ব্যতীত ভগবানের স্বূপোপলব্ধি জীবের 
পক্ষে ত সম্ভব নয়ই, তাহার নিজের পক্ষেও সম্ভব বলয় জীব 
কখন ভাবিতে পারে না। 

ভাবই যখন জীবের ভগবৎ্-স্বরূপোপলন্ধির ক্ষেত্র, তখন ভাবের 
বিকাশের উপর ভগবানের স্বরূপ প্রকাশের তারতম্য নির্ভর করে। 
ভাব যত নিম্মল হয়, ধত গভীর হয়, যত পূর্ণবূপে বিকসিত হয়, 
ভগবানের শ্বরূপও ততই নিশম্পল ও নিরাবরণ হইয়া, উজ্জ্লতর ও 
পূর্ণতররূপে আত্মপ্রকাশ করে। ভাবের উত্কর্ষ সাধনদ্বারাই ভগবৎ- 
স্বরূপ প্রকাশের উৎকর্ষ নিরূপিত হয়। ভাব যেমন এক এক ভূমি 
হইতে উন্নত ও উন্নততর ভূমিতে আরোহণ করিতে থাকে, ভগবানেরও 
তেমনি নৃতন নৃতন শক্তি ও এশ্বধ্য, সৌন্দর্য্য ও মাধুর্য, জ্ঞান ও 
প্রেম তাহার মধ্যে প্রকটিত হইতে থাকে । নিম্নতর ভাব ভূমিতে 
ভগবানের যে স্বরূপ বা প্রকাশ উপলদ্ধি করিয়া, শত্ত্য্বর্য্যের পরাকাষ্টা, 
সৌন্দর্য মাধুর্যের পরাকাষ্ঠা ও জ্ঞানপ্রেমের পরাকাষ্ঠা বোধ হইত, 
উন্নততর ভাবভূমিতে তাহার পূর্ণতর স্বরূপের প্রকাশ দেখিয়া! পূর্বের 
অন্ুভূতিই অপূর্ণ প্রতিপন্ন হয়। ভাব যখন পরম পরাকাষ্ঠায় উপনীত 
হয়, ভগবৎস্বরূপেরও তখন পূর্ণতম প্রকাশ হয়। স্থতরাং ভগবানকে 
ভাবিতে হইলেই ভাবকে পার্থ রাখিয়া ভাবিতে হয়। ভগবানের 
বিশেষ বিশেষ রূপ, গুণ ও মাহাত্ম্য চিন্ত। করিবার সময় কোন্‌ 
জাতীয় ভাবের আশ্রয়ে সেই সেই রূপ গুণের ও মাহাত্ম্যের আবির্ভাব 
তাহা পরিজ্ঞাত থাকা উচিত। নচেৎ প্রকাশ বিশেষকেই পুর্ণস্বরূপ 
বোধ করিয়া সঙ্কীর্ণতা ও গোৌঁড়ীমির অধীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; 
এই হেতু ভক্ত ও ভগবানকে একসঙ্গে চিন্তা করিতে হয়, কারণ 
বিশিষ্ট ভক্তের বিশিষ্ট ভাবের দর্পণে ভগবানের বিশিষ্ট প্রকাশ। 


( ১০৯ ) 


ঞব প্রহনাদ, জড়ভরত, অজামিল, গজেন্দ্, বলি, বৃত্রাস্থর, অন্বরীষ, 
নারদ, উদ্ধব, অজ্জুন প্রভৃতি এক এক ভক্ত এক এক জাতীয় ভাবের 
প্রতিমূত্তি, এবং তাহাদের প্রত্যেকের নিকটে ভগবতস্বরূপ প্রকাশের 
বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আবার, এক এক জন ভক্তের সাধনজীবনে 
ভাবের ক্রমবিকাশে ভগবানের আবির্ভাবও নৃতন নূতন রূপে হইয়া 
থাকে । ভাবের পরিপূর্ণতা ব্যতীত ভগবানকে পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি 
ও আস্বাদন কর! সম্ভব নয়। 

ভাবের পরম পরাকাষ্ঠার নাম মহাভাব। যে অবস্থায় পৌছিয়া 
ভাব পরিপূর্ণরূপে বিকাশপ্রাপ্ত হয়, যে অবস্থায় উন্নীত হইলে সকল 
ভাবের সম্যক সার্থকতা হয়, ভাবের সেই নিত্য আদর্শ অবস্থাই 
মহাভাব নামে আখ্যাত । মহাভাব “নিঃশেষ-ভক্তগণ-ভাবসমূহ-মুত্তি” | 
স্থতরাঁং মহাভাবের মধ্যেই ভগবংস্বর্ূপের পূর্ণ তম প্রকাশ । অতএব 
মহাভাব-প্রতিফলিত ভগবানই চরম আরাধ্য তত্ব। শ্বকীয় ভাবের 
ক্রমোৎকষ সাধনদ্বারা মহাঁভাবে উন্নীত করিতে পারিলে, ভক্তের 
সাধনার পরিসমাপ্তি, এবং তখনই আরাধ্য ভগবানের পরিপূর্ণ তম 
অন্গভূতি ও আশ্বাদন। মৃহাভাবই ভক্তের সাধনার চরম আদর্শ । 
প্রত্যেকটি ভাবই মহাভাবের এক একটি অঙ্গবিশেষ, এবং প্রত্যেক 
ভাবের আধারে সেই মহাভাবাস্বাদ্য পরমারাধ্যেরই আংশিক প্রকাশ 
হইয়! থাকে। 

ধাহার মধ্যে এই মহাভাব নিত্য পরিপূর্ণ ভাবে বর্তমান, বঙ্গীয় 
বৈষ্ব পরিভাতঘায় তাহারই নাম শ্রীরাধা। শ্রীরাধা মহাঁভাবময়ী 
মহাভাবস্বরূপা। স্থতরাং শ্রীরাধ! ভক্তের নিত্য পরিপূর্ণ আদর্শম্বরূপা। 
শ্রীরাধার পরম প্রেমময় ভজন ও আস্বাদনক্ষেত্রেই সর্বারাধ্য 
ভগবানের নিত্য পরিপূর্ণ প্রকাশ । এই ক্ষেত্রেরই পারিভাষিক নাম 


€ ১১০ ) 


মধুর বৃন্দাবন । অতএব শ্রীরাধালিঙ্গিত শ্রীরাধারাধিত শ্ীরাধা- 
স্বাদিত শ্রীভগবানই পরমারাধ্য ভগবত্তত্বের সম্যক পরিপূর্ণ প্রকট 
মৃ্তি, এবং তীহারই নাম শ্রীরাধারুষ্জ। এই শ্রীরাধারষ্ণ তত্বের 
সম্যক উপলব্ধি হইলে ভগবানের পূর্ণ তম স্বরূপের অনুভূতি হইল 
এবং এই অনুভূতির চরম অবস্থায় সাধকের দেহ মন প্রাণ সম্পূর্ণ- 
রূপে প্রেমরসভাবিত হইয়া পূর্ণতম ভগবৎস্বূপের সহিত অভিন্ন 
ভাবে মিলিত হয়। আরাধ্য ও আরাধকের ভগবত্বত্ব ও জীব- 
তত্বের এই পূর্ণ তম প্রকাশ ও পূর্ণতম বিকাশের অবস্থায় যে অভেদ 
ভাবান্ভৃতি, এই যে আস্বাগ্যান্বাদক ভেদবজ্জিত আম্বাদনমাত্র 
স্বরূপে বিরাজমানতা, এই যে ত্রষ্রদৃশ্-ভোক্তভোগ্যাদি ভেদলেশ- 
বিহীন আনন্দস্বূপে অবস্থিতি, তাহা সকল ভাবের অতীত, 
জ্ঞানের অতীত, ধারণার অতীত। 

মহাভাবন্বূপা শ্রীরাধা যেমন একদিকে জীবসাধনার নিত্য 
পরিপূর্ণ আদর্শ, তেমনি অন্যদিকে ভগবানের নিত্য পূর্ণতম আত্মা- 
স্বাদন ক্ষেত্র। রসন্বূপ ভগবানের আত্মাস্বাদনই শ্বভাব। তিনি 
আপনার বহিরঙ্গা মায়াশক্তি, তটস্থ। জীবশক্তি ও অন্তরঙ্গ চিচ্ছক্তির 
বিচিত্র বিলাসদ্বারা আপনাকেই আপনি বিচিত্রভাবে আস্বাদন 
করিতেছেন। মায়াশক্তি-বিলসিত বিচিত্র জগতের মধ্যে আপনার 
স্বরূপ আপনি আবৃত করিয়া একজাতীয় বিভিন্ন ভাবে তিনি 
আপনাকে সম্ভোগ করিতেছেন। তটস্থা শক্তির বিলাসে ক্রম- 
বিকাশমান নানাশ্রেণীর জীবরূপে আপনাকে বনুধা "বিভক্ত করিয়। 
তাহাদের বিচিক্র ভাবের সহিত বিচিত্র সম্বন্ধে আপনাকে তিনি 
প্রকারাস্তরে বিচিত্ররূপে সম্ভোগ করিতেছেন। জড় অপেক্ষা জীবের 
ভিতরে তাহার পূর্ণতর আত্মপ্রকাশ ও আত্মসভোগ। জীবের মধ্যে 


( ১১১ ) 


মান্গষ ও মান্থষের মধ্যে ভক্ত ক্রমশঃ তাহার উজ্জলতর ও পূর্ণতর 
আত্মপ্রকাশ ও আত্মান্বাদনের ক্ষেত্র । জড়ের ভিতরে বিচিত্র ব্যক্তিত্ব 
৪ শক্তিরূপেই তাহার প্রকীশ ও আন্বাদন, কিন্ত জীবের ভিতরে 
এই বিচিত্র শক্তি চেতনভোক্ত1 ও কর্তীরূপে অভিব্যক্ত। মানুষের 
ভিতরে যে ইচ্ছা, জ্ঞান ও ভক্তির ক্রমবিকাশ, ইহা তাহার 
তটস্থা শক্তির কম্মক্ষেত্রে অন্তরঙ্গা শক্তিরই প্রভাব বিস্তার, এবং 
তাহার স্বরূপ প্রকাশ ও স্বরূপাস্বাদনের ক্ষেত্রের নৈম্মল্য 'ও গজ্জল্য 
সম্পাদন। অন্তরঙ্গ! শক্তির বিলাসের মধ্যে--ইচ্ছা জ্ঞান ও ভক্তির 
প্রকাশের মধ্যে-তিনি ক্রমশঃ নিরাবরণ ও পরিপূর্ণভাবে আপনাকে 
আপনি সম্ভোগ করেন। ক্রমবিকাশের পথে ইচ্ছা ও জ্ঞান ক্রমশ: 
ভক্তির মধ্যে আপনাদের স্বাতন্ত্য মিলাইয়া দেয়, সন্ধিনী শক্তি 
ও সম্থিৎশক্তি হলাদিনীশক্তির অঙ্গীভূত হইয়' অন্তরঙ্গা শক্তির 
পৃৃস্বরূপ প্রকাশ করে। অন্তরজা শক্তির সারভূৃতা হনাদিনী শক্তি 
বিচিত্র ভাববিলাসের ভিতর দিয়া মহাভাবরূপে আপনার পরিপূর্ণ 
স্বরূপ প্রকাশ করে। স্থতরাং মহাভাবস্বরূপা শ্রীরাধা ভগবানের 
অন্তরঙ্গ সচ্চিদানন্দময়ী শক্তির পরিপূর্ণ প্রকাশরূপা, এবং স্বকীয়। 
শক্তির এই পরিপূর্ণ প্রকাশের মধ্যেই ভগবান আপনাকে পরিপূর্ণ- 
স্বরূপে প্রকাশ ও আশ্বা্দন করেন। শ্রীরাধাকৃষ্ণের উপাসনা এই 
পূর্ণতম আত্মগ্রকাশময় ও পূর্ণ তম আত্মাম্বাদনময় ভগবানেরই 
উপাসন।। 

শ্ররাধাকষ্ণতত্ব সম্বদ্ধে এইব্প বিচার ও অনুভূতির ফলে আচার্য্য 
জগদীশ স্বীয় আশ্রমের ভজন মন্দিরে শ্রীরাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ সর্বোপরি 
স্থাপন করিয়াছেন। কিন্তু যাবতীয় তত্বই এই পূর্ণতত্বের অঙ্গীভূত 
বলিয়া, সেখানে সকল দেবতারই আরাধনা আছে, সকল মহাপুরুষেরই 


€( ১১২ ) 


সন্বর্ধনা আছে, এবং বিচিত্র দেবমু্তি ও মহাপুরুষ মৃদ্তিতে গৃহটী ভরপৃর 
হইয়া আছে। তিনি আমাদিগের চিত্তে দৃঢরূপে এই আদর্শটী অস্কিত 
করিয়া দ্রিতে চেষ্টা করিতেন যে, এই ভজনালয়টা এম্ন ভাবে রক্ষা 
করিতে হইবে, যাহাতে হিন্দু মাত্রেই এখানে আসিয়া সনাতন ধর্মের 
একটি পূর্ণীবয়ব মৃত্তি দেখিতে পায়, সকল সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িক ধর্ধের 
যথার্থ সমন্বয়ের চেহারাটা এখানে ফুটিয়া উঠে, মহাজনদের প্রবস্তিত 
ও প্রচারিত কোন ভাব, মত ও সাধনার এখানে বিন্দুমাত্রও অবমাননা 
বা উপেক্ষা না হয়, কেহ এখানে কোনরূপ আঘাত না পায়, এবং 
সকলেই এখানে আসিয়া নিজ নিঙ্গ সাধনায় উৎসাহ, উদ্দীপনা ও 
আস্থা লাভ করে। এই আদর্শটী যথাযথভাবে পোষণ করিতে না 
পারিলে, বস্ততঃ শ্রীরাধারুষণ তত্বেরই অবমাননা হইবে, মহাভাবারাধিত 
রসরাজের পরিপূর্ণ স্বরূপটার আবরণ সৃষ্টি করা হইবে। 

আচাধ্যদেব নিজের উপদেশের মধ্যে জনসাধারণকে-_সাধারণ 
অধিকার সম্পন্ন লোকসমূহকে--বিশেষভাবে শ্রীরাধাকৃষ্ণের উপাসনার 
কথা! বলিতেন না, অন্যান্ত আরাধ্যদেবতাসকল অপেক্ষা তাহার 
শ্রেষ্ঠত্ব প্রখ্যাপন করিতেন না। যেহেতু, তাহা করিলে তাহাকে 
সর্ব্বোচ্চ আমন হইতে নীচে নামান হইত, তাহাকে সাম্প্রদায়িক 
দেবতা বিশেষে পরিণত করা হইত, তাহার অন্তহ্র্দয়ের আদর্শ 
শ্রীরাধাকৃষ্ণের একটী বিশেষ প্রকাশরূপে তাহাকে পরিগণিত কর! 
হইত। সকল দেবতার উপসনাকেই তিনি শ্রীরাধাকৃষ্ণের বিশেষ 
বিশেষ ভাবের উপাসনা বলিয়া শ্রদ্ধা করিতেন, উপাস্কর ভাবান্গ্যায়ী 
শ্রীরাধাকৃষ্ণের বিশেষ গ্রকাশ বা বিগ্রহ্রূপে প্রত্যেক উপাস্তমৃত্তিকে 
গ্রহণ করিতেন । সুতরাং কোন দেববিগ্রহই তাহার উপেক্ষণীয় ছিল 
না, কোন সম্প্রদায়ই তাহার ন্বসম্প্রদায়বহিভূর্ত ছিল না, কোন; 


( ১১৩ ) 


সাম্প্রদায়িক আচাধ্যই তাহার বিরুদ্ধবাদী হইভে পারিত না। 
সকলকেই, তিনি আপনার বলিয়া বরণ করিয়া লইতে পারিতেন, 
সকল মতেরই সারবস্তা তিনি উপলন্ধি করিতে পারিতেন, সকল 
মৃতাবলম্বী লোৌককেই তিনি তাহাদের নিজ নিজ ভাবপোষক 
উপদেশ দিতে পারিতেন। বর্তমান যুগের যুবকদিগকে তিনি 
সাধারণতঃ গীতার শ্রীকৃষ্ণের ভাবটাই গ্রহণ করিতে উপদেশ দিতেন । 
মহাপ্রভূ শ্রীচৈতন্যের গভীরতম অনুভূতির প্রত্তীকটাকে যেমন 
তিনি সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন, তেমনি মহাপ্রভৃর 
জনসাধারণের জন্য প্রচারিত ভগবৎ্-নাম সাধনার প্রতীকটা-_'নামত্রহ্ম” 
--তাহারই অব/বহিত নিম্নে স্থাপন করিয়াছেন। গুরুর একাস্তিক 
আন্গত্যে গুরুদত্ত ইষ্টনামের সান্গরাগ ভজনই যে ভগবৎ প্রেম- 
বিকাশ ও ভগবৎস্বূপোঁপলন্ধির সোপান, এই সাধন রহস্টী তিনি 
সমুজ্জলরূপে নামত্রন্ম প্রতিষ্ঠা দ্বারা ব্যক্ত কবিয়াছেন। সকল 
সম্প্রদ্ারপ্রবর্তক মৃহাপুরুষগণের প্রতিই তাহার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা 
ভক্তি ছিল তাহা বলা বাহুল্য । কিন্তু যুগাবতার শ্রীচৈতন্তের 
প্রতি তাহার প্রাণের গভীরতম প্রদেশে একটা প্রেমপুর্ণ 
মমতা ছিল মাঝে মাঝে তাহার পরিচয় পাওয়! যাইত। 
বুদ্ধ, শঙ্কর, রামানুজ, রামানন্দ প্রভৃতি মহাপুরুষগণের জ্ঞান, তপস্থা, 
শক্তি, প্রেম, ভক্তি, উদ্বারতা, মহান্থভবত৷ প্রভৃতি সদ্গুণ রাশির 
মাহাত্ম্যকীর্তনে তাহার ভাবাবেশ দেখা যাইত, তাহার বাক্যেরও 
ফোয়ারা ছুটিস্। কিন্ধ বাংলার অব্তার শ্রীচৈতন্যের সম্বন্ধে কথ! 
উঠিলেই বোঝা যাইত যে, নিতান্ত আপন জনের কথ! হইতেছে । 
তাহার ভিতরে তিনি সকল ভাবের পরিপূর্ণতা দেখিতেন । 
মানবীয় সাধনার এত উচ্চ আদর্শও আর কেহ জীবনে প্রতিফলিত 
৮ 


( ১১৪ ) 


করিয়! দেখান নাই, ভগবত্বত্বের এমন পরিপূর্ণ জ্ঞানও আর কাহারও 
নিকট হইতে পাওয়৷ যায় নাই, এবং তৎসঙ্গে এমন সহজ সাধনার 
পথও আর কেহ দেখাইয়া দেন নাই, ভগবানকে এমন আপন 
করিয়া আমাদের সম্মুখে আর কেহ উপস্থিত করেন নাই। 
মানবের দেহেন্দ্রিয়ের দাবী, হৃদয়ের দাবী, বিচার বুদ্ধির দাবী, 
সামাজিক ও রাস্ত্রীয় আবেষ্টনীর দাবী, সব স্বীকার করিয়া জীবনের 
সকল বিভাগের সহিত সামগ্তস্ত রক্ষা করিয়া, সমগ্র জীবনটাকে 
সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিকতামণ্ডিত ও ভগবতপ্রেমরসাভিযিক্ত করিবার 
যে অপূর্ব কৌশলটি আমাদের এই বাংলার ঠাকুরটা দেখাইয়' 
গিয়াছেন, জগতের ইতিহাসে ইহা অতুলনীয় । আচাধ্যদেব কখন 
কখন ছুঃখের সহিত বলিতেন যে, আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ 
ধদি এই ঘরের ঠাকুর চৈতন্যদ্েবকে চিনিতে ও সর্বতোভাবে গ্রহণ 
করিতে পারিত, তবে অশ্পৃশ্ততানিবারণ, হিন্দুমূদলমান মিলন প্রভৃতি 
আজ এমন জটিল সমস্যা হইয়া দঈীড়াইত না 

আচাধ্যদেব আর একটি কথ মাঝে মাঝে বলিতেন ষে, চৈতন্ত 
বুদ্ধ প্রভৃতি অনন্যসাধারণ মহাপুরুষদিগকে ভগবদবতার বলিয়া 
প্রচার করায় আমাদের কিছু লোকসান হইয়াছে, তাহাদের সঙ্গে 
আমাদের ব্যবধান অনেকটা বৃদ্ধি পাইয়াছে। আমরা এখন 
তাহাদিগকে পূজা করিয়া, সম্মান দেখাইয়া, দণ্ডবৎ্ দিয়াই তৃণ্চ 
হই, তাহাদের মহিমা কীর্তন করিয়া ও তীহাদের কৃপা প্রার্থনা 
করিয়া কর্তব্য শেষ করি? তাহাদিগকে জীবনের আদর্শরূপে গ্রহণ 
করিতে সাহস পাই না, তাহাদের সাধনার অন্থপরণ করা আমাদের 
ন্তায় সাধারণ মানবের পক্ষে সম্ভব মনে করি না, এবং সেইহেতু 
তাহাদের প্রদশিত পথে জীবনটাকে পরিচালিত করিতে ষথোচিত 


€( ১১৫ ) 


পুরুষকারও' প্রয়োগ করি ন1। তাহাদিগকে যি আদর্শ মানুষ, 
আদর্শ দাধ্ক, আদর্শ প্রেমিক ভক্তরূপে আমাদের জীবনের মধ্যে 
গ্রহণ করিতে পারিতাম, তাহাদের ভিতরে প্রকটিত ভগবদভাবের 
উপর জোর না দিয়া পূর্ণমানব-ভাবের উপর জোর দিতাম, তাহা 
হইলে সাধন জীবনে আমাদের অধিকতর কল্যাণ হইত, তাহাদের 
সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কম হইত, এবং তাহাদিগকে মানবতার 
আদর্শ রূপে সম্মূথে রাখিয়া আমরা অগ্রসর হইতে পারিতাম। 
করুণানিধান ভগবান্‌ যে উদ্দেশ্টে আমাদের এত নিকটে চোখের 
সামনে এতাদৃশ আদর্শ জীবন সকল উপস্থিত করিয়াছিলেন, "বং 
আচরি ধশ্ম জীবেরে শিখাইতে” মানুষ হইয়া আসিয়াছিলেন-- 
তাহাদের ভগবত্ত(র.দিকে বেশী নজর দিয়! আমরা সেই উদ্দেশ্যই 
যেন অনেকটা ব্যর্থ করিয়। দিয়াছি। 

আচাধ্যদেবের জীবন ও উপদেশের অন্য যে দিকটি আমাকে 
বিশেষভাবে আকর্ধণ করিত, সেটি হইতেছে কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির 
সমন্য়। তিনি যে কোন বিষয়েরই উপদেশ করিতেন, তাহার 
মধ্যেই এই তিনটি ধারার যোগ দেখ! যাইত। কি ব্যবহারিক 
বিষয়, কি আধ্যাত্মিক বিষয়, কোথাও এই যোগস্থত্র ছিন্ন হইত 
না। তাহার দৃষ্টিতে জীবনের কৌন কর্ম, কোন জ্ঞানচচ্চা, কোন 
দয়াদাক্ষিণ্য স্বেহমমতা শ্রদ্ধাগ্রীতি অধ্যাত্মজীবনের সাধনা হইতে 
বিচ্ছিন্ন হইত ন1। তাহার নিজের ব্যবহারিক জীবনের সকল 
বিভাগেরই কেন্রী ছিল ভগবদারাধনা, এবং ভগবদারাধনার অর্জ- 
প্রত্যঙ্গরূপেই তীহার জীবনের সকল ব্যাপার সংসাধিত হইত। 
তাহার উপদেশও তদমুরূপ ছিল। ধাহারা বিজ্ঞানের গবেষণা 
করেন, ,স্বাহাদের সম্বন্ধে অতিশয় শ্রদ্ধার সহিত তিনি বলিতেন 


(১১৬ ) 


যে, তাহারা ভগবানেরই প্ররৃতিরাজ্য তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়! 
এক একটি সত্য আহরণপূর্বরক ভগবানেরই চরণে পুপ্পাঞ্জলি প্রদান 
করিতেছেন। ইহা ত অতি অন্দর সাধনা । ধাহারা ইতিহাস 
আলোচনা করেন, তাহারা মানবজগতে ভগবাঁনেরই বিচিত্র লীল| 
অনুসন্ধান ও আস্বাদন করিয়া! তীহারই মহিমা! কীর্তন করিতেছেন । 
ধাহারা দার্শনিক তত্বালোচনায় নিরত, তাহার! জ্ঞানের অনুশীলন 
দ্বারা তাহারই স্বরূপ উপলদ্ধি করিবার জন্য সাধন করিতেছেন । 
সাহিত্য ও কল! বিদ্যার অন্ুশীলনের মধ্যে ত সেই রসম্বরূপেরই 
প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুভূতি । 

ধাহারা জাতি ও সমাজের পেবা করিতেছেন, ভগবান্ই জাতি- 
রূপে, সমাজরূপে তাহাদের সেবা গ্রহণ করিতেছেন। গৃহস্থ পারি- 
বারিক কর্তব্য নিষ্ঠা ও প্রেমের সহিত সম্পাদন করিতেছেন, 
তাহাও ত তাহারই সেবা। ভগবান্ই আমাদিগকে বিচারশক্তি, 
ইচ্ছাশক্তি, ক্রিয়াশক্তি, প্রেমশক্তি প্রভৃতিতে শক্তিশালী করিয়া 
এবং সেই সব শক্তির বিকাশ ও প্রয়োগের সৃবিধা দিয়া, তাহারই 
জগতে তাহারই সেবার জন্ত পাঠাইয়াছেন, আবার তিনিই 
পিতামাতারূপে, ভ্রাতাভগ্রীব্ূপে, পুত্রকন্তারূপে, সাধুভক্তরূপে, দীন- 
দুঃখীরূপে, জাতিসমাজরূপে, জীবজন্তরূপে, আমাদের সত্যান্থুরূপ ও 
অবস্থান্থরূপ সেবা গ্রহণ করিয়। আমাদিগকে কতার্থ করিবার জন্য 
আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হইতেছেন। তাহারই সেবায় ভাঁহারই 
দেওয়া শক্তি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পাঁরিলেই আম্র! 
কৃতার্থ হই। সকল প্রকার কর্ম যখন ভগশৎসেবাঁয় পর্যবসিত হয়, 
তখনই কর্মের সম্যক্‌ সার্থকতা, এবং সেই কর্ম বন্ধন হ্যষ্টি ন| 
করিয়|! বরং পূর্বের সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া দেয়, দেহমনবুদ্ধিকে 


&8 ১১৭ ) 


বিশুদ্ধ ও .ভগবদৃ্ভাবভাবিত করে এবং জ্ঞান প্রেমের বিকাশ 
করিয়া! ভূগবৎস্বরূপ সাক্ষাৎকারের যোগ্যতা সম্পাদন করে। তেমনি 
সর্বপ্রকার জ্ঞান যখন ভগবত্বত্বজ্ঞানে পর্যবসিত হয়, তখনই 
জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পাদন হয়, এবং সর্ধত্র ভগবত্ম্বরূপান্থুভৃতি হয় 
ও ভগবৎস্বূপের ক্রমশঃ পূর্ণতর প্রকাশ উপলব্ষিগোচর হয়। 
সকল ন্েহমূমত। ভালবাসা যখন একীভূত হইয়া ভগবৎপ্রেমে 
পর্য্যবসিত হয়, তখনই হৃদয়ের সম্যক সার্থকতা । তখন সমস্ত 
প্রাণ যেমন একনিষ্ভাবে ভগবানেই মিলিত হয় ও ভগবান্কেই 
আস্বাদন করে, তেমনি সকল জীবের মধ্যে সেই এক ভগবানকেই 
দর্শন করিয়া সকলেরই প্রতি বিশুদ্ধপ্রেমসম্পন্ন হয় এবং সকলের 
সেবাতেই ভগবৎসেবানন্দের সম্ভোগ হ্য়। সমস্ত জীবনটিকে 
ভগবস্ভাবভাবিত ভগবদ্রসরসাল করিয়া! তুলিতে হইবে, ইহাই 
সাধনা, এবং এই ছুই সাধনায় কম্ম জ্ঞান ভজন সকলেই আহ্ক- 
কূল্য করিবে। এই ভাবেই জীবনটিকে সর্বাঙ্স্থন্দররূপে পরিচালিত 
করিতে হইবে । আচাধ্য জগদীশ কোন একদেশদর্শী মতবাদ 
অবলম্বন ন। করিয়া জীবনের সব্বাঙ্গীন উতৎকর্ষবিধানেরই উপদেশ 
করিতেন । গীতাই তাহার পথপ্রদর্শক ছিল, এবং তাহার নিজের 
জীবনটাও গীতারই একখানা জীবন্ত ভাষ্য ছিল। আচাধ্যদেবের 
অতিশয় প্রিয় একটি শ্লোক দ্বারা প্রসঙ্গের পরিসমাপ্তি করি_- 

নৈষ্বম্ম্যমপ্যচ্যুতভাববজ্জিতং 

ন্‌ শোভতে জ্ঞানমলং নিরগুনম্‌। 

কুতঃ পুনঃ শশ্বাদভদ্রমীশ্বরে 

ন চার্পিতং কর্ম তদপ্যকারণম্‌ ॥ 





শিষ্য সঙ্গে (৩) 


জ্ঞানে, প্রতিভায় বাহার! শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিতে ধাহারা আমাদের অপেক্ষা 
অনেক উদ্ধে, তাহাদের যখন অভাব ঘটে, তখন আমরা সত্যই 
ক্ষতিগ্রস্ত হই, বেদনা অনুভব করি, শ্রদ্ধায় ও শোকে অশ্রু নিবেদন 
করি; কিন্তু যে মহাপুরুষ নীরবে ও গোপনে আপন প্রাণের সঙ্গে 
পার্খব্তী প্রাণগুলিকে আকর্ষণ করিয়া টানিয়া লন, সকলের আনন্দে, 
বেদনায়, শোকে, উৎসবে, প্রশ্বে, সমস্তায় যিনি আপনাকে নিঃশেষে 
বিতরণ করেন, এমনি হাসিয়া-ভালবাসিয়া--ঘিনি আমাদের 
জীবনের সঙ্গে জড়াইয়৷ যান, শিক্ষায়, শাসনে ও মধুরতায় ধার 
আসন আমাদের হৃদয়ে অচলপ্রতিষ্ঠ হইয়া যাঁয়, তাহাকে যখন 
আমবা হারাই-বড় তীব্র হইয়া সে অভাব আমাদের অন্তরে 
আঘাত করে, শুন্ততার বেদনায় হৃদয় হাহাকার করিয়া ওঠে! 


জীবনের গতি যাহাদের মুহুমু্ুঃ বিপর্যস্ত হয়, সংসারের মলিনতা 
ও প্রলোভনের কত ব্যথা, কত জালা অহরহঃ তাহাদের জর্জরিত 
করে। প্রকাণ্ড ফাকির বোঝা লইয়া তাহার! জীবন নদীর পাড়ি, 
জমাইতে তরণী ভাসায়। কত ঝড়, কত ঝঞ্চা সে জীর্ণ তরণীর 
ক্ষীণগতিকে ওলট পালট করিয়া দেয়। এমন অকৃলে পড় মানুষকে 
যদি তার এই দৈন্য বিপদের মাঝখানে কেহ হাঁত বাড্ডাইয়া টানিয়] 
তোলে, তার নিরাশার অন্ধকারে আশার আলো! জ্ঞালিয়! দেয়, 
তবে পেই হয় তার সব চেয়ে বড় বাগ্ধব, জীবনের আশ্রয় ও 
সান্বনা। পিঠের ভারী বোঝাট। তারই চরণতলে নামাইয়। দিয়] 


(১১৯ ) 


যেন একটু হাঁফ ছাড়িয়া সে দ্রাড়াইতে পারে । ভয়ে, শঙ্কায় শুফ 
বুকখানা৷ যেন তার সবল হইয়া ওঠে, নিশ্চিন্ত আনন্দে আবার 
সে পথ "চলিতে আরম্ভ করে। আচাধ্যদেব ছিলেন বরিশালবাসীর 
এমনি প্রাণ, এমনি আশ্রয়, এমনি বান্ধব। তীহাকে হারাইয়া 
বরিশাল আজ সত্যই নিঃস্ব, নিরাশ্রয় | 

শিশুবয়ল হইতেই আচার্ধ্যেবকে দেখিয়াছি । তখন অবাক হইয়া 
থাকিতাম--এত সৌম্য, এত হ্থন্দর কি মানুষ হয়! দেখিতাম-- 
আমার দিদিমা, মা, দিদি সবাই লুষ্তিত হইয়া তাহাকে প্রণাম 
করিতেন, আমিও তাই শ্রদ্ধীয় প্রণাম করিতাম কিন্তু তিনি 
মহাপুরুষ কি দেবতা তাহার সন্ধান করি নাই। তিনি সাধক, 
তিনি জ্ঞানী, তিনি গম্ভীর অথচ শিশু বৃদ্ধ কেহই তাহার সঙ্গে 
কথা বলিতে অপাত্র বলিয়। বিবেচিত হইত না। যার যতটুকুতে 
অধিকার তার সঙ্গে ততটুকু লইয়াই তার বেশ আলাপ চলিত। 
একটু বড় হইলে আমার সঙ্গে তাহার প্রথম আলাপ হইল অস্ক 
লইয়া । হঠাৎ একদিন একটা 4১1৫০৮:৪র £9700012 জিজ্ঞাসা 
করিয়া ফেলিলেন। সেটা তখনও শেখা হয় নাই, কাজেই হা 
করিয়া তাঁকাইয়া রহিলাম। বলিয়া গেলেন “শিখিয়া রাঁখিও, 
আবার জিজ্ঞাসা করিব । পরম উৎসাহে শিখিলাম ও পরীক্ষা 
দিয়া তবে নিষ্কৃতি । সেই অবধি শেষ পর্য্যন্ত লেখাপড়ায় কত 
উৎসাহ দিতেন, কত আনন্দ প্রকাশ করিতেন। কাহারও ভিতরে 
সামান্য গুণ* দেখিলে তাহা প্রশংসায় ও উৎসাহে বাড়াইয়৷ তুলিতে 
কতই না চেষ্টা করিতেন। আমার রচনা লেখায় তার ছিল পরম 
আগ্রহ এবং প্রশংসাও করিতেন অত্যন্ত বেশী। স্কুলে কাজ করি, 
তাই আমাকে ভাকিতেন 'পতণ্তিত মশাই' বা "পণ্ডিত দিদি । কি 


( ১২০ ) 


পড়াই, কি পরিমাণ পরিশ্রম করিতে হয়, আমার কষ্ট হয় নাকি, 
শরীর খারাপ হয় নাকি এ প্রশ্ন যে কতবারই করিতেন। এম্‌, এ 
না পড়িয়া কাজে ঢুকিতে হইল--তাহাতে ছিল তার কত ছুঃখ। 
শেষ পধ্যস্ত বলিয়া গিয়াছেন_-“তোমীকে এম, এ, পড়িতে হইবে? । 
স্কৃত বি, এ,তে পড়িলাম নাঁ- ছুই একবার নিতে বলিয়া শেষে 
বলিলেন--দিদি এখন কথা শুনলে না, বড় হ'লে এই বুড়োর কথা৷ 
মনে পড়বে, তখন কিন্ত দুঃখ হবে। যাকৃ-_শেষে পড়ে নিও ।, 
চ171109599175র জন্য বলিতেন “তোমার যখন দরকার হয় আমার 
কাছে আসবে । আমি কিন্তু একদিনও যাইতে পারি নাই--এমনি 
করিয়া সকল বিষয়ে উত্সাহ দিয় সুযোগ স্থবিধার ব্যবস্থা। করিয়া 
দিতে তাঁর সর্বদাই চেষ্টা ছিল। আমার দিদি ভাল সেলাই জ!নেন, 
তাই তিনি নাম দিলেন “দবজী মশাই” । যে যাহা সেলাই করিবে 
দরজী মশাইর পরামর্শ নিতে পাঠাইয়া দিতেন। দিদি গান ভাল- 
বাসেন, তাই ভাকিতেন “গানের কুমীর' | স্থন্দর নৃতন গান কোথাও 
পাইলে অমনি তাহাকে ভাকিয়া দেখাইয়! শিখিয়া লইতে বলিতেন। 
ঠাকুরমন্দিরে দিদির সেবাপৃজ!1 দেখিয়া ভাকিতেন “গৌসাই দিদি? । 
কত আনন্দ, তৃপ্তিই তাহাতে প্রকাশ করিতেন । এমন করিয়। 
সব কাজে সব জায়গায় যিনি প্রবেশ করেন, ছোট খাট বিষয়ও 
ধার চিন্তা ব! দৃষ্টি এড়াইতে পায় নাই, তিনি কি শুধু পুজ্জার 
দেবতা? এ ষে প্রতি পদে দরদভরা মায়ের দৃষ্টি। তাই তো 
প্রতি পদে সবাই এত অভাবগ্রস্ত। 

ন্েহ ভালবাসা খুব বড় জিনিষ, বড় কথা, কিন্তু কত্রিমতাও 
এই জিিশিষটির ভিতরেই ধরা পড়িয়া যায় বেশী, স্সেহ যেখানে 
ন্রেহের পাত্রের সামান্য তুষ্টির ওন্য আপনার উচ্চপদ, উচ্চমান সমন্ত 


( ১২১ ) 


তুলাইয়া দেয় সেইথানেই ফুটিয়া উঠে মায়ের প্রাণ, সেইখানেই 
নেহের পূর্ণতা । আচার্ধযদেবের ছিল এই স্ষেহ। আমি খুব চালিতা 
ভালবাসিতাঁম জানিয়া প্রায়ই নিজ হাতে বাঁপার চালিতাগুলি 
কুড়াইয়া! চৌকির নীচে রাখিঙ্তা দ্রিতেন। আমি গেলে বলিতেন__- 
“দিদি, এ তোমার জিনিষ নিয়ে যাও । আর যদি ২১ দিনে 
আমি ন1! যাইতাম তবে সে গুলিকে চাদরের নীচে কাবিয়া বাসায় 
নিয়া আসিতেন। আমি যেন লজ্জায় মরিয়া যাইতাম, তেমন 
ভাবিতাম_-এ কেমন মানুষ! স্সেহ তো কতই পাই কিন্তু এত 
তুচ্ছ বিষয়েও তার এত বড় প্রকাশ কই দেখিনা তো! তখন 
ভাবিয়াছি বিষয়টা! তুচ্ছ, কিন্তু আজ ভাবি স্বেহ যতক্ষণ এমনি 
তুচ্ছ বিষয়েই ধর! না দেয়, যতক্ষণ বিচারে বিবেচনায় সীমাবদ্ধ 
থাকে, ততক্ষণ তার সরল রূপটি ফোটেন1। সে স্সেহ মন্তরমুগ্ধের মত 
আকর্ষণও করিতে পারে না, জীবনের কাজেও আসে খুব অল্লই। 
আধ্যাত্মিক জীবনের প্রয়োজন মানুষের অনেক সময় শাস্ে, গ্রন্থে, 
বসু সাধু সঙ্জনের উপদেশে মিটিতে পারে কিন্তু প্রাণভরা ন্মেহের 
অভাবে জীবন আমাদের অনেক সময়ই শুষ্ক ভারাক্রান্ত হইয়! ওঠে । 
শুধুমাত্র আত্মিক কল্যাণ কামনায় যদি এ স্েহ নিঃশেষ হইয়া যায় 
তবে ক্ষুধ! তৃষ্তার জীব আ'মরা_-সে ন্েহ আমাদের তৃপ্তি দিতে 
পারে কই? অন্তর বাহিরের সকল প্রয়োজনেই যদি তার ব্যাকুল 
দৃষ্টি না পাই তবে প্রাণে সরদত! জাগে কোথায়? বাহিরের 
প্রয়োজনগুলিকে তো ছোট বলিয়া উড়াইয়। দেওয়া চলে না। বড় 
কথা জীবনে অনেক সময়ই ব্যর্থ হইয়া যায়.কিন্ত এ ছোট জিনিষ- 
গুলির প্রতিটা ম্থতি যে অন্তরে দাগ কাটিরা যায়, তাহাকে তো ক্ষুদ্র 
বলিয়া উপেক্ষা করিতে পারি না, জীবনের পরম সম্পদ বলির! 


( ১২২) 


্বীকার না করিয়া তো পারি না। হয়ত বা এইগুলিই আমাকে 
অন্তরের পথে আস্তে আস্তে ঠেলিয়৷ লইয়া চলিবে । এমন, স্ষেহটিই 
আচাধ্যদেবের নিকট হইতে পাইয়াছি, তাই বুঝিতেও পারিয়াছি-_ 
ন্নেহ মানুষের জীবনে কত বড় প্রয়োজন। জিনিষের বা কাজের 
বড় ছোট বোধ তাহার মেহকে কোনদিন মাপ দিতে দেখি নাই। 
আমার দিদি একটা গান চাহিয়াছিলেন, সেটা নিজে হাতে লিখিয়া 
নিজের হাতে বাসায় পৌছাইর। দিয়া তবে তাহার ছুটী। আমাদের 
রুগ্ন শরীর সে যে তার কত কষ্ট, কতই যে ওুঁধধ পথোর ব্যবস্থা 
করিতেন তাহার স্থৃতি আজ চক্ষের জলেরই পরিমাণ বাড়ায় | 

কিন্ত এ ন্সেহ শুধু তার খাওয়াইয়। খুপী করিয়াই শেষ হইত 
না। আমাদের চলাফেরা বাঁ ইচ্ছা আকাজঙ্ষা তাহার মনোমত এবং 
আমাদের মঙ্গজলজনক না হইলে তাহাও বলিয়া দ্রিতেন। মেয়েদের 
সাজ পোষাকের বিলাসিতাটুকু লক্ষ্য করাইয়। দিতে ছাড়িতেন না। 
হঠাৎ আমাকে একদিন বলিয়া ফেলিলেন-__-“মণি, তুই তে 
একেবারে মণিবাবু হয়ে গেছিস, না?” আম তো অবাক্‌, বলিলাম, 
কেন? আমার হাতখান! টানিয়া লইয়া সোনার চুড়ীগুলি নাড়িয়া 
দেখাইয়া বলিলেন “এই যে চুড়ী, হার কত কি,কত টাকা, কত 
পয়সা তোর গায়ে দেখিস্‌ না, তবে তুই বাবু না তে। কি?” লজ্জায় 
সন্কচিত হইয়া গেলাম। একটু পরে বলিলেন, “দিদি, এগুলো 
তুই ছাড়বি কবে বলতে পারিস?” কি উত্তর দিলাম মনে নাই । 
পরে বলিয়াছিলেন, "মনথেকে ছেড়ে দিও, আর অল্প কন্তর+ গয়ন। দিও ।” 
আমার মাথার অনেক চুল তার একট! যন্ত্রণার সামগ্রী ছিল। 
মেয়েদের চুল স্বভাবতঃ একটা সৌন্দধ্য বা লক্ষবীপ্রী বলিয়া 
সকলেই মনে করেন। কিন্তু শুধু মাত্র যন্ত্রণা বোধ করিতে আমি 


(১২৩ ) 


এই একটি মানুষকেই দেখিয়াছি । আমার প্রকাণ্ড খোল! চুল চোখে 
পড়িলেই বলিতেন--'এগুলো কেটে ফেল্তে পারিস্না। কেন 
মিছেমিছি বোঝা বয়ে কষ্ট পাও? আমি বল্তাম--'লে।কে বল্বে 
কি? বলিতেন, “তাতে কি? লোকের কথায় কি হয়?» 
ভাবিতাম ইনি কি জানেন না আমাদের মেয়ে জাতট! এই চুলের 
জন্যই কত পয়সা খরচ করে? বড় পাড়ের কাপড় পড়িয়া গেলে 
অমনিই তাহা লক্ষ্য করিতেন। বলিতেন “দিদি, তোমরা কাপড় 
পরনা, পাড়ই পর বুঝি?” এই সব কথা অন্যে বলিলে হয় তো' 
রাগ করিতাম কিন্তু তাহার কথা তীব্র হইয়া মনকে কখনও বিদ্রোহী 
করে নাই; মিষ্টি হইয়া! তাহাকে সহজেই পরিবদ্তিত করিয়াছে । 
মেয়েদের অদ্ভুত লজ্জা তিনি পছর্দ করিতেন না। রৌদ্র বৃষ্টিতে 
ছাত! লইয়৷ যাইতে আমরা লজ্জা বোধ করিলে--বলিতেন, “এতে 
তোমাদের লজ্জা! নিজে ছাতা দিয় “যাও, বলিয়া পাঠাইয়। 
দিতেন, দ্বিরুক্তি করিবার সাধ্য থাকিতনা। মাকে একদিন 
বলিয়াছিলেন-_“মা, বুকের ভিতর ভগবানকে রেখে, তার কথা ভাবতে 
ভাবতে রাস্ত। দিয়ে চলে যাবে, তাহলে দেখবে আর লোক 
লাগবে না। ভয় কিসের ? 

এই হাসি, আনন্দের মেশামিশির মধ্যেও তার এমন একটা 
গাভীষ্য, এমন একটা ব্যক্তিত্ব হিমাচলের মত দৃঢ়প্রতিষ্ঠ থাকিত, 
মাতৃন্সেহের সঙ্গে এমন একট বিরাটত্ব মিশ্রিত থাকিত যে, সেখানে 
সাহস করিয়া ঞ্গব কথা বল। চলিত না। অনেক দিন অনেক কথ! 
বলিব বলিয়। ভাবিয়া গিয়াছি কিন্তু ছুই একটি কথাতেই আমার সব 
চুরমার হইয়া যাইত। তিনি কেন খাওয়া দাওয়ায় অত শুচিতা 
বজায় রাখিতেন এই লইয়া ঝগড়া করিতে আমরা প্রস্তত হইয়া 


( ১২৪ ) 


যাইতাম কিন্তু ধারাল যুক্তিগুলি নিক্ষেপ করিবার আগেই আমার 
মুখ বন্ধ হইয়া যাইত। দিদি তবু কিছু বলিতে পারিত্ে কিন্তু 
উত্তরে তিনি এমন কবিয়াই হাসিতেন যে, তারপরে আমাদের আর 
কিছু বলার থাকিত না। মাকে মাঝে মাঝে বলিতেন, “আমি সবই 
পারি কিন্ত তোমাদের দশজনের জন্যই আমাব এ সঙ্কোচ 1? 

এমন গম্ভীর পুরুষ আবার যখন হাসি গল্প করিতেন তখন বালকের 
মতই মধু হইয়া যাইতেন। আমার দিদিকে একদিন বলিলেন, ন্দুঃ 
বলতো স্বর্গ কোথায় ? দিদি বলিলেন, “এই কাছেই, দেহটা সুস্থ 
থাকলেই স্বর্গ ।» বলিলেন, “ঠিক বলেছ, রোগের যন্ত্রণাই বলতে 
পাবি-নবক যন্ত্রণা। দিদি, মারও এক জায়গায় স্বর্গ আছে, আমি 
বলতে পারি। এই বরিশ।লের নদীর 'তীরের বড় রাস্তায় যখন 
বেড়াই, পাশে ঝাউবন থাকে, তখন কিন্তু স্বর্গেব মতই লাগে ।” আর 
একদিন বলিলেন, হইন্দু তোমারও দীতে বাথ, আমারও দাতে 
ব্যথা, তৃমি আমার দাতাল ভাই ।” সবাইকে বলিলেন, “তোমরা সব 
চুপ কর, আমি আর ইন্দু এখন শুধু দীতের কথাই বলব, আর কোন 
কথাই নয়” সবাই তে হাসিয়া অস্থির । এমনি সরল হাসির ঝরণা 
যে কতই বহিয়া যাইত ! 

কিন্ত সব আলাপ আলোচনার মধ্যে ভগবৎ আলোচনাতেই 
ছিল তার পরম আগ্রহ ও অফুরস্ত আনন্দ । যদি কিছু প্রশ্ন করিতাম বা 
কোন কিছু বুঝিতে চাহিতাম তবে কত আহে, কত আদরে, কত 
রকমেই যে সে জিনিষটিকে বুঝাইয়া দ্রিতেন, যেন কিছুতেই তাঁহার 
তৃপ্তি হয় না। একবার গীতা বুঝাইতে বলায় রোজ নিয়মিত সময়ে 
গীতাখান! হাতে করিয়া বাসায় আসিয়া উপস্থিত হইতেন, তাহাতে 
একদিনও ভূল হইত না। এই সকল আলোচনার ভিতরে দেখিয়াছি, 


€( ১২৫ ) 


শ্রীরুষ্ণের, কথা বলিতে গিয়! উচ্ছৃসিত আনন্দে যেন শতমুখ, শতকণ্ঠ 
হইয়া যাইতেন। মাঝে মাঝে ক রুদ্ধ হইয়া আদিত। অপূর্ব শ্রী 
মুখমগ্ুলে ফুটিয়া উঠিত। বুঝিতাম ভগবান শ্রীরুষ্ণ তাহার জীবন । 
একদিন প্রশ্ন করিলাম গীতার পরে ভাগবতের আর প্রয়োজন কি? 
গীতায় তো! অপূর্ণতা কিছু নাই। প্রেম ভক্তির সাধনার পরাকাষ্ঠ। 
কি গীতায় নাই? ভগবন্লিদিষ্ট পন্থার পরে আর ভক্তের অনুভূতির 
কি প্রয়োজন ? অনেক করিয়া! আমাকে বুঝাইলেন কিন্তু কিছুতেই 
বখন স্বীকার করিয়া লইতেছিলামনা তখন একটা ধমক দিয়া 
বলিলেন, "দাত ওঠে নাই তো, কচি আমের আস্বাদ কি বুঝবে? 
আগে দাত উঠুক পরে দেখবে । সে ধমকের পরে, সে দৃপ্ত 
চোখের সামনে আর আমার কথা বলিবার সাহস ছিল না। কিন্তু 
এই মেরুদগুহীন বাঙ্গালী জাতির বাচিবার জন্য তিনি ঘষে বস্তর 
প্রয়োজন বোধ করিয়াছিলেন, তাহার প্রকাশ পাইলাম আর একদিনের 
কথায়। ঢাকায় তখন হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা চলিতেছিল, সেই 
সময় একদিন আমাদের বাসার মন্দিরের সন্মুখে বপিয়৷ বলিতেছিলেন, 
"রাত্রে ঘুমাইতে পারি না”। কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, “ষে 
সমস্ত সংবাদ রোজ কাণে আসে তাহাতে আতঙ্ক হয় ।” জিজ্ঞাসা করা 
হইল, এই মৃত জাতির বাঁচিবার জন্য আপনার জীবনব্যাপী সাধনায় 
কি অমৃত লাভ করিয়াছেন তাহাই বলুন। বলিলেন--€ত্তান্নন্া 
এখনন বীশীল্ কুম্দও ছেড়ে দেও৩১ পার্থ আন্থিক্স 
উপ্পাসন্গ কুল ॥” সে দিন বুঝিলাম, জাতির জন্য কি পুঞ্তীভৃত 
বেদন। তাহার অন্তরে ছিল, আর জাতির শক্তিই বা তিনি কোন্‌ 
জায়গ।য় খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। 

আচার্য দেব বড় ছিলেন, উচ্চ ছিলেন, দেবতার মত সকলে 


€( ১২৬ 


স্বাহাকে দেখিত, কিন্তু দেবতা হইয়া মানুষের অঞ্জলি তিনি কোনদ্িনই 
গ্রহণ করেন নাই। মা অনেকদিন তাহার পায়ে ফুল দিতে তিনি 
হাত পাতিয়া সে ফুল লইয়া ভগবানের চরণে অপনিই নিবেদন 
করিয়া দ্রিতেন। মানুষের সবটুকু শ্রদ্ধা প্রকীশের স্থযোগ তিনি 
কাহাকেও দিতেন না। আপনার গৌরবে, আপনাঁর মর্যাদায় তিনি 
সাধারণের ধরা ছোওয়ার সীমানা ছাড়াইয়৷ নিজেকে কোথাও প্রতিষ্ঠিত 
করিবার চেষ্টা করেন নাই । দিদি একদিন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, 
“আচ্ছা, লোকে যে গুরুপূজ। করে আপনার তাতে মত কি?” 
বলিলেন, “তোমার আমার তাতে কি প্রয়োজন, তুমি যা করিতেছ 
তাই করিয়! যাও।, জোর করিষা জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, “দিদি, 
ভগবানের আসন আর নাই, পৃথিবীতে ভগবানের আসন উঠে গেছে ।" 
জানিনা, হয়তো। কেহ আবার তাহার চরণে অঞ্জলি দিয় তাহার 
আরাধ্য দেবতার অগ্জলিকে লঘু করিয়া ফেলিবে এই জন্তই আচার্য- 
দেবের এত শঙ্কা, এত দ্রীনতা। মাকে বলিতেন, “মা, মনটা শুদ্ধ 
কর, তা হলেই সব হবে, আর কিছুর প্রয়োজন নাই । ভগবানকে 
দূরে রাখিয়! তাহার কোন কথাই ছিলনা । মা জিজ্ঞাস করিয়াছিলেন, 
পরলোকে কি প্রিয়জনকে আবার পাওয়া যায়”? উত্তর দিলেন, 
“ভগবানের ভিতর দিয়ে পাবার চেষ্ট। করবে, তা”হলেই পাবে, নতুবা 
নয়।? আপনার থাকিবার দালানটিকে উৎসর্গ করিলেন শ্রীর্ণের 
নামে । দালানের গায়ে “গোপাল গোবিন্দ লেখ! দেখিয়া মা 
তাহার অর্থ জিজ্ঞাস! করায় বলিয়াছিলেন-__-“গোপাল অর্থ ভগবানের 
জীব এবং গোবিন্দ অর্থে ভগবান শ্রীকষ্ণ। এই ছুইএর সেবার 
জন্তই এ বাড়ী থাকবে” । আচাধ্যদেব সমুদ্র, তাহাকে পরিমাপ 
করিবার শক্তি তো আমার নাই কিন্তু তাহার ন্বেহের আকর্ষণ 


জগদীশাশ্রম, বরিশাল 








€( ১২৭ ) 


বিদ্রোহীকে. বশীভূত করে এবং তীহার শ্রীকষ্ণবিশ্বাস অবিশ্বাপীকে 
শুদ্ধ করে- এইটুকু বুঝিয়াছি। 

দেবতা, তুমি কি ছিলে কাহাকেও জানিতে দেও নাই। নিজেকে 
শুধু গোপনই তুমি কর নাই, বিলোপ করাই ছিল তোমার চেষ্টা । 
বিলোপ তুমি করিয়াছ কিন্তু সে বিলুপ্ত প্রাণের মধুগন্ধ যে সকলকে 
পাগল করিয়া চতুদ্দিকে জনসমূদ্রের স্থগ্টি করিয়াছে, তাহাকে তো 
প্রতিরোধ করিতে পার নাই! আপন প্রাণের অন্তরালে বসিয়া 
জীবনস্থ্ধা আপনি পান করিবে, দানের অহস্কারে প। বাড়াইবেনা, 
এই ছিল তোমার সঙ্কল্প, কিন্ত সবাই যে তোমাকে লুটিয়া নিল, 
কই, ঠেকাইতে তো পার নাই! তোমার এ বিলোপের সাধন 
যে মধুচক্র স্থট্টি করিয়া সকলকে আকর্ষণ করিয়া লইত। এত 
মধুরতা, এত স্নেহ, এত আনন্দ, এত প্রেম, এতবড় মাতৃত্ৃদয় যদি 
তোমার ভিতরে না পাইতাম তবে তোমার এ বিশাল স্বর্গীয় 
হৃদয়ে আমাদের প্রবেশের পথ ছিল কোথায়? তোমাকে বুঝিতে 
পারি নাই, বুঝিবার ক্ষমতাও নাই কিন্তু জীবনে তোমার স্নেহ, 
তোমার আশীর্বাদ, তোমার স্পর্শ আমার বড় সম্পদ। তোমার 
গোপনের সাধনা শেষ করিয়া আজ তুমি চক্ষুর অন্তরালে, কিন্তু 
সেখান হইতেও তোমার স্পর্শের সম্পদে যেন বঞ্চিত না হই। 
তোমার ক্ষমা-স্ন্বর, ধ্যান-গম্ভীর মুত্তির আকর্ষণ যেন এখনও আমাকে 
পাগল করে। 


অন্তরঙ্গ সঙ্জে 


পরম পুজ্যপাদ শ্রীমদ্াচাধ্য জগদীশ মুখোপাধ্যায় গত ১৩৩৯ 
সনের ২৪শে কাত্তিক বৃহস্পতিবার, ইংরাজি ১৯৩২ সনের ১০ই নবেম্বর 
বেলা অপরাত্ু ৩-২০ মিনিটের সমর মানবলীলা সম্বরণ করিয়া 
স্বর্গলোকে গমন করেন। এই মহীাপুকুষকে আমরা জগদীশবাবু 
ন| বলিয়া “317? বলিয়া সম্বোধন করিতাম সুতরাং এখনও সেই 
সম্বোধনই করিব | 

ইংরাজি ১৮৮৫ সনের শেষভাগে চাকরীর অনুসন্ধানে বরিশাল 
যাই। তংপুর্বেই বোধ হয় ১৮৮৪ সনে 51 বরিশাল আসেন । এ 
সময় আমার জ্ঞাতিন্রাতী স্বগীম্ম কালীপ্রসন্ন ঘোষ মহাশয়ও বি, এম, 
স্কুলে মাষ্টার হইয়া যান, তিনি 5?এর সহিত একবাসায় থাকিতেন । 
কালীপ্রসন্ন বাবুর উপলক্ষেই তাহাদের বাসায় যাইতাম। ক্রমে 
জগদীশবাবুর সহিত ঘনিষ্ঠ আলাপ হইতে থাকে ও বন্ধুভাব 
জন্মে এব, শীঘ্রই তাহা সখ্যভাবে পরিণত হয়; সৌভাগ্যক্রমে সেই 
সখ্যভাবের উপর গুরুশিষ্তভীব আসির1 দাড়ায় । তিনি হলেন গুরু, 
আমি হইলাম শিষ্বা। সেই সমর বি, এম, স্কুলের নিকটেই ২।৩ 
জারগায় জগদীশবাবু বাসা পরিবর্তন করেন। আমিও এ স্কুলের 
নিকটব্ন্ভতী এক বাসায় থাকিতাম এবং সন্ধ্যার পরই আহারাদি 
সমাপন করিয়া 5এর নিকট-হাঁজির হইতাম অথবা, কোন দিন বা! 
বড়কর্তা পেরন পুজনীয় ৬অশ্বিনীকুমার দত্ত) ম্হাশয়ের নিকট যাইয়া 
নান! সংপ্রসঙ্গ শুনিতাম। 

এই সময় নববিধান সমাজভুক্ত ৬কালীকুমার বস্থ ঠাকুর বরিশাল 


€ ১২৯ ) 


কালেক্টুরীর হেড ক্লার্ক ছিলেন এবং তাহার একটা নববিধানের 
ব্রাঙ্মঘমাজ ছিল | সেই সমাঁজে বি, এম, স্কুলের শিক্ষক কালী গ্রসন্ন- 
বাবু, জগদীশবাবু, এবং রাখালবাবু, নিয়মিতরূপে রবিবার সন্ধ্যার 
পর যাইতেন, স্ৃতরাং আমিও যাইতাম, এবং শীত্রই এ সমাজের 
সঙ্গীতের দলে প্রবেশ করিলাম। এই ভাবে কিছুকাল কাটিয়া 
গেল এবং কালীপ্রসন্নবাবু কাঁউনিয়াতে পৃথক বাস! কবিলেন। 
এই সময় সাধারণ ব্রাহ্ষনমাঁজভূক্ত স্বনাম্ধ। স্বর্গীয় মনোরঞ্জন 
গুহঠাকুরতা মহাশয়ের উদ্যোগে কালীপ্রসন্নবাবুর বাসায় প্রতি 
রবিবার ছুপুরের সময় কালীপ্রসন্নবাবু, জগদীশবাবু, রাখালবাবু 
এবং মনোরঞ্জনবাবু একত্রিত হইয়া পঞ্চদশী প্রভৃতি ধর্শগ্স্থ 
আলোচনা করিতেন। মনে হয় মাষ্টার এঅক্ষয়কুমার সেনও এই 
সামতিতে যোগ দিতেন । 

আমি এ সমবেত লোকদের মধ্যে বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, বয়সে এবং 
সর্ধপ্রকারেই নিম্মশ্রেণীর লোক হইলেও এক কিনারায় যাইয়া বসিতাম 
এবং দ্রেখিতাম যে সমিতি ভঙ্গ হইলেও 51 আমার সহিত স্সেহভরে 
কিছু আলাপ ব্যবহার করিতেন। ৬1এর সহিত আমার বেশী 
ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ পরিচয় হইতে থাকে এ সব সমাজ এবং সমিতি- 
ভঙ্ষের অনেক পর। এদিকে আবার মহল্লার কালীবাড়ীতে সিদ্ধ 
মহাপুরুষ সনাতন ঠাকুরের খ্যাতি খুব প্রকাশিত হইয়া পড়ে। 
স্বর্গীয় মোক্তার শ্রদ্ধেয় ৬প্যারীমোহন গুহ মহাশয় প্রথম আমাকে 
&ঁ ঠাকুরের নিকট নিয়া আলাপ করাইয়। দ্রেন। তদবধি প্রায় 
প্রত্যহই কাছারীর পর কালীবাড়ীতে এক বৈঠক দিতাম । মাঝে 
মাঝে 913 তথায় যাইতে লাগিলেন । এইরূপে কতককাল কাটিয়া 


গেলে পর শেষে প্রায় প্রত্যহই সন্ধ্যার পর ৪;:এর বাসায় যাইতে 
্ে 


( ১৩০ ) 


লাগিলাম এবং এ সময় ওখানে মস্ত এক বৈঠক বসিতে লাগিল। 
যার যে বিষয়ে সংশয় হইত 51: তাহা মিটাইয়া দিতেন। এই 
আনন্দের হাট মন্ধ্যা হইতে রাত্রি ৯1১০টা পধ্যস্ত থাকিত। 
কোন কোন দিন রবিবার প্রাতে যাহা পাঠ করিতেন তাহারই 
আবার বিস্তৃত আলোচনা! হইত। কালীবাঁড়ীর ঠাকুরের কথা ৪8 
বলিতেন যে “ইনি নিরক্ষর মান্ষ কিন্তু ইনি যা বলেন তা পাই 
শেষে বেদাস্ত উপনিষদে |” 

আমি পেনসন নিয়া আসিলে প্রত্যেক বৈশাখ মাসে একবার 
বরিশাল যাইতাম এবং কালীপ্রসন্নবাবুর লোকান্তর গমনের পর 
ওএর বাসায়হই যাইয়া! থাকিতাম, তাহাতে তিনি বড় 
আনন্দিত হইতেন। একস্থানে সাম্নাসাম্নি আহার করিতে 
ৰসিতাম, তাহাতে ১৭৮ প্রায়ই বড় আনন্দ প্রকাশ করিতেন। 
আবার প্রায়ই এটুক ওটুক যত্ব করিয়া! খাওয়াইতেন। বলিতেন 
“ধর ধর অন্নদা! একটু তুমি খাও”। ২১ দ্রিন ধমক দিতাম-- 
বলিতাম “আপনি এত বড় লোক হইয়া কিরূপে প্রয়োজনতিরিক্ত 
আহার গ্রহণ করিতে বলেন?” তখন বলিতেন “আরে খাও, 
অস্থখ করিবে না” আমিও নিঃশঙ্কচিত্তে খাইতাম, কোন উদ্বেগ 
হইত না। ইহার পব আমিও 51 দুপুর বেলায় বাসায় ফিরিবার 
পূর্বেই আহারকাধ্য সমাধা করিতে লাগিলাম কিন্তু তা'হলেও 
এড়াইবার যো নাই, কারণ বাহির হওয়ার কালেই কেহকে বলিয়া 
যাইতেন “অন্নদাকে এটুক ওটুক দিও” । 

এদিকে ভালবাসিতেন এত কিন্তু সামান্ক একটু অন্যায় দেখিলে 
তাহ! পছন্দ করিতেন না। একদিন ছুপুরবেল! বাসায় ফিরিয়া 
জিজ্ঞাসা করিলেন-_-"অন্নদ আহার হয়েছে?” আমি উত্তর 


( ১৩১ ) 


করিলাম--"আজ্ঞে হা, সেবা হয়েছে ।” $%য বল্লেন “কার সেবা 
কল্পে?” আমি বলিলাম “এই দেহটার অথবা দেহ মধ্যে যিনি 
আছেন।” প্রশ্ন--সত্য মত্যই কি তাহার সেবা! করেছ? উত্তর-- 
আজ্ঞে না। তিনি বল্লেন, তবে এই নিরেট মিথ্যাটা কেন বলে? 
উত্তর--একটু রগড় করিয়া বলিয়াছি, আর বলিৰ না। একদিন 
আমর! কয়েকজন ১1:এর অনুপস্থিতিতে সন্ধ্যার পর বসিয়া নানা 
গল্প গুজব করিতেছি, তন্মধ্যে একজন এ যে একটা গান আছে 
“কেন বঞ্চিত হব চরণে, আমি কত আশা করে বসে আছি পাৰ 
জীবনে না হয় মরণে” এ গানটার অন্নুকরণে মাঝে মাঝে 
হাস্তোদ্দীপক পদ বসাইয়া--য্থা “কেন বঞ্চিত হব ভোজনে”-- 
বেশ আমোদ করিতেছিলেন। আমি কিন্তু এ আমোদে ষোগ 
দিতে না পারিয়া চুপ করিয়াছিলাম। অল্প সময় মধ্যেই ৪1: 
বাসায় আমিলে এ গানটা গাওয়া হইল কিন্তু 9% মন্দ বলিলেন। 
বলিলেন একি? অমন একট! শ্ুন্দর গানের সর্বনাশ করা হচ্ছে, 
আর কি এঁ গানটা গাহিয়। কেহ আনন্দ পাবে? 

51 কালীবাড়ীর ঠাকুরের খুব ভক্ত ছিলেন। সেই ঠাকুরেৰ 
একটা দৌষ ছিল-_বাসায় বসিয়া যাহা করিতাম অথব। তাহার 
ওখানে যাইয়। যাহা মনে ভাঁবিতাম, ঠাকুর তাহা জানিতে 
পারিতেন, কাজেই কিছু চিন্তা করিতেও ভয় হইত। অতি দুরেও 
একজন কেমন আছে, কি করিতেছে, তাহা বলিতে পারিতেন। 
তবে তাহার *এই বিদ্ভা বেশী লোকে টের পায় নাই। 5:এরও 
সেই দোষটুকু জন্নিয়াছিল, তাহা আমি বেশ টের পাইয়াছি, আর 
কেহ পাইয়াছেন কিনা জানিনা । সাধকগণ এ সকল বিভূতি অতি 
সাবধানে গোপন করেন। লোকে জানিলে ত্যক্ত করে বিশেষতঃ 


(১৩২ ) 


অনেকে এ সকল বিভূতির মোহে পড়িয়া খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠাঁকুর 
এবং 91 দয়! করিয়া আমাকে জানিতে দিয়াছিলেন বলিয়! জানিতে 
পারিয়াছিলাম। 

কালীবাড়ীর ঠাকুর দিন তারিখ সময় ঠিক করিয়া দেহত্যাগ 
করিয়াছিলেন। যে রাত্রির শেষভাগে দেহ রক্ষা করেন সেই 
রাত্রিরই প্রথমভাগে ১১টা পধ্যন্ত আমরা তিনজন ঠাকুরের 
নিকট ছিলাম কিন্তু এ রাত্রিশেষেই যে দেহত্যাগ করিবেন তাহা 
বুঝিতে পারিয়াছিলাম না । 

১৩৩৮ সনের বৈশাখ মাসে যখন 51:এর নিকট বিদায় 
নিয়া আমি বাড়ী যাই, তখন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, 1 আবার 
কি দেখা হবে? তিনি উত্তর করিলেন “হবে|” এই কথ! 
বাড়ীতে আসিয়া মেয়েলোকদের নিকট বলিয়াছিলীম। এ ৯৩৩৮ 
সনের শ্রাবণ মাসে আমাব সঙ্কটীপন্ন পীড়া হয়। আমি রোগমুক্ত 
হইয়। শুনিলাম আমার দ্বিতীয় পুত্রবধূটা বলিয়াছিল, “এবার 
ঠাকুরের কিছু হইবে না কারণ জগদীশবাবু যখন বলিয়াছেন যে 
আবার দেখা হ'বে, তখন তার সঙ্গে আবার দেখা না হইতে 
ঠাকুরের কিছু হইতে পারে ন1।” আমার পুত্রবধূটার বিশ্বাসের 
দৃঢ়তা দেখিয়া পরম আনন্দ লাভ করিলাম । ১৩৩৯ সনের বৈশাখ 
মাসে আবার বরিশাল গিয়াছিলাম, আসিবার দিন সন্ধ্যা বেলা 
51কে বলিলাম “আজ বাড়ী যাব।” ৩31 বলিলেন “কেন? 
আজ হঠাৎ বাড়ী যাওয়ার কি দরকার হইল 1” আসার 
সময় যখন শেষ পায়ের ধূলা নিলাম তখন একটা দীর্ঘনিশ্বাস 
ফেলিলেন। জিজ্ঞাসা করিলাম “আবার কি দেখা হবে?” কিছুকাল 
চুপ করিয়! থাকিয়া বলিলেন, “তা কি করিয়া বল! যায়, শরীরটা! ত 


€ ১৩৩ ) 


মোটেই ভাল থাকিতেছে না” । এই বলিয়াই পাশ ফিরিয়া শুইলেন। 
আমার চোখে জল আসিল, এঁ ভাবেই চলিয়। আসিলাম। 58 
এর প্রেম এবং ভালবাসার কথা৷ বলিয়া! বুঝানও যায় না, শেষও 
করা যায় না। 
একদিন বড়কর্তীর (পৃজ্যপাদ ৬অশ্বিনীকুমার দত্ত ) নিকট ১1: 
( জগদীশবাবু), আমি এবং আরও যেন কে বসিয়। কথাবার্ত! 
বলিতেছি এমন সময় ২টী বৈরাগী আসিয়া গোপীষন্ত্র এবং মন্দির! 
বাজাইয়৷ গান ধরিল-_ 
ঝাপ দিয়ে রসের সাগরে, কেউ ভাসে কেউ ডুবে মরে । 
রতন থাকে অগাধ জলে, ডুবুরিতে ডুবে তোলে, 
তাও কি মিলে যার তার কপালে; 
সাতার ভুলে ডুবলে পরে দ্রম্‌ ঠেকে বুক ফেটে মরে । 
সাপ্‌ খেলাতে জানে যারা, তারা জানে ফণী ধরা, 
মণি পেয়ে ধনী হয় তারা; 
বেনু স যার! পায়ন। তারা, দংশনে ঢলে পড়ে । 
নামে প্রেমে মাথা যেমন, কামে প্রেমে মাথা তেমন, 
রসিক জানে রসের আস্বাদন ; 
রাজহংস হ+লে, কলে কৌশলে, জল ফেলে দুধ পান করে । 
বেহার বলে সেই জলে, ত্রিবেণীতে স্নান করিলে, 
জন্ম মৃত্যু যায় এককালে; 
সে যে গুক্ূপদে নেহার দিয়ে বসে থাকে আর রূপ নেহারে। 
বৈরাগীদ্বয় বিদায় হইলে পর বড়কর্তাকে জিজ্ঞাসা করিলাম--কেউ 
বা ভামে কেন, আর কেউ বা ডুবে মরে কেন? বড়কর্তা 5কে 
বলিলেন “জগ, তুই বল্‌” । 51 বলিলেন “আপনি বলুন”। বড়কর্তা 


( ১৩৪ ) 


বলিলেন “আরে তুই বল্‌ দেখি শুনি; বাঁশের থেকে এখন কঞ্চি 
দড় (দৃঢ়) হইয়াছে” অর্থাৎ গুরু অপেক্ষা শি্তই অধিক শক্তিশালী 
হইয়াছে । তখন 9 বলিতে আরম্ভ করিলেন, (যতদূর মনে হয় 
তাই লিখিতেছি ) “যাহার! সর্পাকৃতি কুগুলিনী শক্তির জাগরণ- 
প্রণালী সম্যক অবগত আছেন তাহারাই মণি লাভ করিতে পারেন, 
তা না হলে যারা অজ্ঞ তার! মণি লাভ করা দূরের কথ। আরো 
বিপরীত ফল লাভ করে। কুগুলিনী শক্তি নাভিমূলে মণিপুর 
পল্প পধ্যস্ত উঠিয়া স্থষম্নার মধ্যের স্থক্ নালদ্বারা বিছ্যতের মত 
সহম্নীরে যদি উঠে তবেই সাধক কুতার্থ হইতে পারে । আমার মনে 
হয় তখনই সাধক গাহিয়। উঠেন প্রভু মহারাজ একি সাজে এলে 
হৃদয়পুর মাঝে । তখনই সাধক অন্থভব করেন “কেবলই শুধু আনন্দ 
স্বন্দর বিরাজে। কিন্ত মণিপুর হইতে বক্রগতিতে যাওয়ারও 
বেশ স্থগম পথ আছে, যদি শক্তি সেই পথে যায় তবেই মুফিল, ত। 
হলেই পতনের আশঙ্কা, কারণ তা হলেই কাম উদ্দীপন হয়। কাজেই 
নামের সহিত প্রেমের যেমন সন্বদ্ধ তেমনই প্রেমের সহিত কামেরও 
সম্বন্ধ আছে।” এ কথার অনেক পর $ একদিন আমাকে চুপ 
করিয়া বলিয়াছিলেন যে কোন একজন ভক্ত তাহাকে নাকি 
বলিয়াছিলেন যে “কীর্তনান্তে অনেক সময় কামের উদ্রেক হয়” ৪1 
বলিলেন ইহাই শক্তি বিপথগামী হওয়ার ফল। 

একদিন বৈকালে খুব বৃষ্টি হইতেছে, 9 তাহার খাটখানার 
উপর শুইয়া আছেন, আঙ্ি ছোট চৌকীখানার স্উপর বসিয়া 
নানা কথা জিজ্ঞাস করিতেছি । শেষে শ্বাসের ক্রিয়া বিষয়ে অনেক 
কথা হইতে 51 বলিলেন “আরে দেখ এ রকমও হইতে পারে” 
এই বলিয়া আমার হাত টানিয়া নিয়! পেটের উপর রাখিলেন। 


( ১৩৫ ) 


দেখিলাম নাভিমূলের নীচ হইতে শ্বাস উঠানামা করিতেছে। নাভির 
উপরি ভাগে কোন ক্রিয়া নাই। আমি ত অবাক। কেমন আত্ম- 
গোপন করিয়া চলিতেছেন তাহা! বুঝিলাম। ভগবানের কৃপায় 
সাধু সন্ন্যাসী কিছু যে না দেখিয়াছি তা নয়, এমন প্রেমিক বৈরাগী 
ত আর দেখি নাই! তাই এক একবার মনে হয় অশ্বিনীকুমার, 
জগদীশ, কালীপ্রপন্ন, কাঁলীশ, রাখাল প্রভৃতি শ্রীগৌরাঙ্গের নিত্যানন্দ 
অদ্বৈতাচাধ্য, শ্রীবাঁস প্রভৃতির অভিনয় করিয়া গেলেন নাকি ? 

৭7 আপোষ ঝগড। করিতে বেশ আমোদ পাইতেন। কড়া জবাব 
পাইলেই খুসি হইতেন এবং চুপ করিতেন। কড়া জবাব দিতে 
পটু ছিলেন শশী চাটাজ্জাঁ, তার পর আমিও নিতান্ত কম নহি। কুরধ্য- 
বাবু ধমকও দিতেন। একদিন ভোর হওয়ার একটু পূর্বে আমি 
গাহিতেছিলাম--“আমি সকল কাঁজের পাইহে সময় তোমাকে ডাকিতে 
পাইনে, আমি কতই কি খাই ভম্ম আর ছাই তোমার প্রেমামৃত 
খাইনে” ইত্যাদি । প্রাতে যখন চ। খাইতে বসিয়াছি তখন আমি 
বলিলাম আজ $1:এর উঠিতে একটু বিলম্ব হইয়াছে । অমনি 
বলিলেন “না-_তুমি যখন ছাই তম্মগুলি খাইতেছিলে তখনই ত 
আমি বাহিরে গিয়াছি।” তৎপব চাএর সঙ্গে 91 যাহা খাইতেছিলেন 
তাহার একটু নিয়া বলিলেন “অন্নদী! ধর ধর একটু খাইয়া! দেখ 
দেখি, আমার পাকট! কেমন হইয়াছে ।” আমিও হাত পাতিয়। নিয়! 
বলিলাম তবে এখন একটু প্রেমামৃত খাওয়া যাক । 

৩1:এর স্তরহিত ঠা! বিদ্রপ ইয়ারকি যথেষ্ট ছিল, শেষকীলে আমার 
উপবীত তিনিই দিয়াছিলেন। শাসনের ক্রটি ছিলনা । একদিন 
পৈতা গাছটী মালার মত গলায় রাখিয়াছি। 3::এর নজর ওদিকে 
গিয়াছে । বল্লেন “অন্নদা তোমার গলায় ওটা কিহে? আমি কি 


৬ ১৩৬ ) 


তোমার গলায় একটা মালা পরাইয়া দিয়াছিলাম? তখন আর 
কি করি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৈতাটা সমান করিয়া গলায় দিলাম 
এবং তদবধি আর পৈতাটী মালার মত রাখি নাই। বরিশাল থাকিতে 
একদিন 51কে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করিয়াছিলাম। এদিন পণ্ডিত 
মহাশয়ের বাসা হইতেও নিমন্ত্রণ হইয়াছিল কিন্তু বন্দোবস্ত হইল যে 
এ&ঁদ্দিন আমার বাসায়ই খাইবেন, তৎপর দিন পণ্ডিত মহাশয়ের বাসায় 
থাইবেন। খাওয়ার দিন বেল! বারট। বাজে তবু ৪1 আসেন না। 
তখন আমি আমার এক ছেলেকে বলিলাম খবর নিতে যে ব্যাপার 
কিহইল। এমন সময় 317 আসিয়। বলিলেন “বেলা হওয়াতে তোমা” 
দের কষ্ট হইয়াছে । একখানা বই পড়তে পড়তে আর বেলার খেয়াল 
ছিল না11” আমি বলিলাম “বইখানা বোধ হয় বেদান্ত ।” 51 বলিলেন 
“ঠিক ধরেছ।” শেষে শুনিলাম 51:এর দুর্দশা । বেশী বেলা হয়েছে 
হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে তাড়াতাড়ি স্নান করিয়। পাকের ঘরে গিয়াছেন, 
তখন পাচক চায় চাকরের মুখের দ্বিকে, চাকর চায় ঠাকুরের মুখের 
দিকে । পাচক বলিল “আপনারত পণ্ডিত মহাশয়ের বাসায় খাওয়ার 
নিমন্ত্রণ ছিল।” অমনি পণ্ডিত মহাশয়ের বাসায় গিয়াছেন, সেখানে 
তাহারা বলেন “আজত অন্নদা বাবুর বাসায় খাবেন” । তখন আবার 
আমার বাসায় ছুট । আদত কথা মাথায় এ বেদান্তের ঝোকই ছিল। 
51৮ গোপনে গোপনে যে কত ভালবামিতেন তাহা ত বলিয়া 
শেষ করা যায় না। একবার সপরিবারে কাশী গিয়াছিলাম। ৬অশ্বিনী- 
কুমার বলিরাছিলেন, জগদীশের মায়ের মত অমন একটা মেয়ে লোক 
আর দেখি নাই স্থৃতরাং কিসের বিশ্বেশ্বর অন্নপূর্ণ! দর্শন, আগেই 
91:এর মাকে দেখ। দরকার । কাশী যাওয়ার পর দিনই $1:এর 
মাকে দেখিতে গেলাম। যাইয়া নাম বলিয়া প্রণাম কর! মাই 


€॥ ১৩৭ ) 


বলিলেন "তুমি অস্নদা, তুমি বরিশাল হইতে আসিম়্াছ?” আমি 
বলিলাম, আজ্ঞে আমি সম্প্রতি বাড়ী হইতে আসিয়াছি। “আচ্ছা 
খোক! বস, তোমার কথা জগদীশ লিখিয়াছে”? আমি ত অবাক। 
“খোকা ধর এই আমটি খাও”, আমি আমটা নিয়া উঠিয়া একটু দুরে 
যাওয়ার উপক্রম করা মাত্রই বলিলেন “না! খোকা এখানে বসিয়া 
খাও, একটু ফেলবে ত মার খাবে।” মায়ের কাশী প্রাপ্তির 
খবর 51£ ৭1১২৪ তারিখে কাশী হইতে লিখিতেছেন “মা ১০ই পৌষ 
১০ট1 বেলায় মৃহাপ্রস্থান করিয়াছেন। তিনি বলিতেন আমি 
উত্তরায়নে যাইব। একদিন পৌষের প্রথমে জিজ্ঞাসা করেন এ 
কোন্‌ মাসের কোন্‌ তারিখ? আমি বলিলাম ৯ই পৌষ মঙ্গলবার 
উত্তরায়ন হইবে । সেই দ্িন হইতে উদর ভঙ্গ হয় এবং পরদিনই 
প্রস্থান করেন। মৃত্যুর পূর্বে প্রায় ১৫ দ্রিন আর কাহারও সহিত 
বড় একটা সম্পর্ক রাখিতেন না। সর্বদা বসিয়া ধ্যানে নিমগ্ন 
থাকিতেন। মৃত্যুর প্রায় ৮১০ মিনিট পূর্বে আমাকে কাছে বসিতে 
বলেন। আমি ভাল আছি কিনা ও পেটের ব্যথাঁটি ভাল হইয়াছে 
কিন! জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি সময় নিকট বলিয়া কানে গু নাম 
শুনাইতে লাঁগিলাম, তিনিও আমার সঙ্গে বলিতে লাগিলেন। গলা 
কাপিতে লাগিল, ক্রমে বিলথ্ধে কীপিল, শেষে দীপ নির্বাণের মৃত 
আর কাপিল না। যখন গীত৷ পড়িয়। শুনাইতাম তখন হইতে গও 
নামের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হইয়া পড়েন। শারীরিক বেদনার 
মধ্যে উন বন্ধিয়া না কৌকাইয়! "৩৮ বলিয়া কৌকাইতেন। আমি 
বলিয়! দিয়াছিলাম “মা! বেদনার অর্থ এই যে তোমার অন্নপূর্ণা মা 
তোমার প্রাণটাকে আন্তে আন্তে হাড় মাম হইতে খসাইয়া৷ বাব! 
বিশ্বনাথের হাতে দ্িতেছেন*। তিনি সেই কথাই ভাবিতেন | * * * |” 


( ১৩৮) 


5: যখন প্রাতে ধ্যান করিয়! আসিতেন তখন মুখ আরক্তিম 
হইয়া উঠিত। একটী বিধবা মেয়ে 5:এর নিকট গীতা অধ্যয়ন 
করিত। একদ্দিন আমাকে জিজ্ঞাসা করেন অন্রদাঁ এই মেয়েটাকে 
চেন? আমি বলিলাম আমি কি করিয়া চিনিব? তখন পরিচয় 
দিলেন “এইটী তোমার ২য় পক্ষের গুরুভগ্নী”। আমি কথাটা 
বুবিতে পারিয়াও পরিষ্কার করিবার জন্য বলিলাম ইহাকে বলে 
কোন্‌ দেশীয় পরিচয়? তখন বল্লেন এইটি অমুক এবং তোমার 
দ্বিতীয় গুরু শ্রীমৎ তীর্থ স্বামীজীর শিষ্তা। আমি বললাম তাহলে 
৩য় পক্ষের গুকুভগ্রী বলেই ক্ষতি কি? এ মেয়েটি হলো 91এর 
ছাত্রী এবং 51 হইলেন আমার ৩য় গুরু। কাজেই ৩য় পক্ষের 
গুরুভগ্রীও বলা যায়। 

আমার অভাব বা প্রয়োজন আমাপেক্ষা 51: বেশী বুঝিতেন। 
একবার হুক] কন্ধি নিয়াছিলাম না। যাওয়া মাত্রই অনুসন্ধান । 
অমনিই বলিলেন অমুক স্থানে হুকা কন্ধি আছে, কিছু তামাক টাক! 
আনিয়া নেও। আমি বলিলাম প্রয়োজন হবে না”। সে কথা 
কে শোনে? তামাক খাওয়ার সব যোগাড় হইলে পর তবে 
ঠাণ্ডা । 

একদিন দুপুর বেলায় কায়স্থ কনফারেন্সে যাব। ১ বল্লেন 
খাওয়া দীওয়ার পরই এই রোদের মধ্যে যাইতে হইবে, একখান! 
গাড়ী করিয়া যাও। আমি বলিলাম “হাটিয়াই যাইতে পারিব।” 
কনফারেন্সে যাওয়ার অল্প পরই মাথা ঘুরাইতে এবং বনি বমি করিতে 
আরম্ভ হইল। গাড়ী করিয়া বাসায় আসিলাম। তখন কথ! অমান্ 
করার জন্য একটু মিষ্ট ভসনা করিলেন এবং আমার সেই গুরু- 
ভগ্নী এবং আর একটা মেয়েকে বলিলেন “তোমরা যাইয়া অক্নদাকে 


(॥ ১৩৯ ) 


একটু বাতাস দেও, একটু ঘুম হইলেই সারিয়] যাইবে 1” 5£এর কথা 
অমান্য করিয়৷ যে কাজ করিয়াছি তাহ'তেই আমার অশুভ হইয়াছে । 

বরিশালের সিবিল সার্জন রায় আনন্দ লাল বস্ত্র বাহার এবং 
কলিকাতা হইতে আগত এক জন [0০৪] ৪0010: এই দুই জনই 
আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়৷ বলিয়াছেন, আপনার! জগদীশ বাবুব আশ্রিত 
আপনাদের খুব সৌভাগ্য বশতঃই এই সঙ্গ লাভ করিয়াছেন। জগদীশ 
বাবুর আশ্রিত বিধায় আমরা আনন্দ বাবুর নিকট যথেষ্ট অনুগ্রহ 
পাইয়াি | 

ক্রমান্বয়ে ২৩ জন লোকের নিকট শুনিলাম যে 5৪1 শ্রীমতস্বামী 
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী হইতে স্বপ্পে সাধন পাইয়াছেন বা মন্ত্র 
পাইয়াছেন; তাই আমি একদিন ওকে জিজ্ঞাসা করিলাম 
“অমুক অমূকে বলে যে আপনি গোস্বামী মহাশয়ের নিকট স্মাপ্পে মন্ত্র 
পাইয়াছেন_-কথাটা সত্য কিনা?” ৪ বলিলেন “কৈ আমিত কিছু 
জানিনা ।” আমি বলিলাম “তবে লোকে বলে কেন?” উত্তর 
হইল “ তাহারা কেন বলেন তা আমি কি করিয়া বলিব ?” 

51 এর বিবাহ সম্বন্ধে বলিয়াছেন “আমার বিবাহের কথা হইলেই 
পলাইতাম। একবার একটী ত্রাঙ্ষণ কন্যাদীয়গ্রস্ত হইয়া আমার 
নিকট অনেক কান্নরাকাট করাতে বলিয়াছিলাম, যদি এত দিনের 
মধ্যে আপনার মেয়ের বিবাহ না হয় তবে আমি বিবাহ করিতে পারি, 
কিন্তু মেয়ের ভরণপোষণ আপনারই করুতে হবে ।” কিন্তু ভগবানের 
কপায় যে সমম্মের কথা বলিয়াছিলাম এ সময় মধ্যেই মেয়েটার অন্যত্র 
বিবাহ হইয়া! গেল । আর একবার কাশীতে বসিয়া! মাকে বলিলাম, মা 
একবার বাড়ী চলনা? মা বলিলেন, সকলের পুক্রবধূ থাকে, নাতি 
পুতি থাকে, সেই টানে তারা যায়, আমার কে আছে? আমি কোন্‌ 


(৬ ১৪০ ) 


টানে যাব? তখন মাকে বলিলাম আমি বিবাহ ন। করাতে যদি 
তোমার মনে কষ্ট হইয়া থাকে তবে আগামী কল্য মধ্যে তুমি বল, 
আমি বিবাহ করিব। কথাটা বলিয়া আমার মাথ। দিয়া যেন 
আগুন ছুটিল, তখন মনে হইতে লাগিল, এ কি করিলাম? কাশীতে 
বনিয়! মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা । যদি মা বলেন তবে বিবাহ করিতেই 
হইবে । বিধির বিধান চমত্কার! পরদিন মীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, 
মা কি আদেশ কর? কিন্তু মা বল্লেন “দেখ, লোকে ছেলে বিবাহ 
করায় ছেলের স্থুখের জন্য, সেই বিবাহে তোর যদি অস্থখ হয় তবে 
তাতে আমার কোন্‌ স্থখ হবে? আমি তোকে বিবাহ করতে 
বলতে পারিনা” । ডঃ বলিলেন “মায়ের কথ। শুনিয়া আমি হাফ 
ছাড়িয়া বীচিলাম।৮ এখানে আমর! বলিতে পারি যে অমন মায়ের 
পেটেই এবপ ছেলে হয়। 

947 বলিয়াছেন ইন্দুর মৃত্যুর পর ম!কে লিখিলান মা, এখনত 
তুমি আর আমি, হয় তুমি বরিশালে আমার নিকটে আপ, না হয় 
আমাকে তোমার নিকট কাশীতে যাইতে অন্রমৃতি দেও, আমর! 
একস্থানে থাকি । তাহার উত্তরে মা লিখিলেন-- বরিশালের লোক 
তোমাকে চায়, তুমি ব্রিশাল ছাড়িয়া আমসিলে তারা বড় 
ব্যথা পাইবে। স্থতরা২ তোমীর কাশীতে আপার দরকার 
নাই। আমি বিশ্বেশ্বরের পাদপদ্মতলে যেমন আছি তেমনই 
থাকিব। 

ব্যক্তিগত চিঠি পত্রের কথা আর না লিখিয়। ,51 রবিবার 
এবং বাপায় অন্য সময় যাহা বলিয়াছেন তন্মধ্যে যাহা মনে 
আছে অথবা লিখিত আছে তাহারই ২।৪টা কথা উল্লেখ করা 
যাউক। 








১ 
. 


১38 
টম 


মী 





আশ্রমে জগদীশ 








(॥ ১৪১ ) 


শ্রীমস্তাগবতে গজকচ্ছপের আখ্যায়িকা আছে তাহার আধ্যাত্মিক 
ব্যাখ্যায় বলেন যে গজ আর কেহই নহে, কেবল জীবের অহঙ্কার মাত্র । 
জীবের মোহকেই কুস্ভীর রূপে বর্ণনা করা হইয়াছে । জীব অহঙ্কার 
বশতঃই মোহগণ্ডে পতিত হয়, কিছুতেই নিস্তার নাই কিন্তু যখন 
ভগবানের শরণাপন্ন হয় তখনই তাহার উদ্ধার, নচেৎ নিজের বলে 
বলীয়ান মনে করিলে তাহ হয় না। ভগবানের কৃপ। ভিন্ন কিছু 
হওয়ার নয়। 

১৩১৭ সনের ৮ই শ্রাবণ রবিবার । 51: শ্রীমস্তাগবত হইতে বস্ত্র 
হরণ পাঠ করিয়! বুঝাইলেন যে এমন একটী শ্লোক নাই যাহাতে 
কোনরূপ কাম গন্ধ আছে। কেবল ভগবানের প্রতি গোপীগণের 
ভক্তির পরাকাষ্ঠাই ইহাতে প্রকাশ পায়। দেহ মন সমস্তই ভগবানের 
এবং সমস্ত তাহাকে অর্পণ করিলেই তাহার হওয়া যায়। 51 বৈকালের 
সান্ধ্য সমিতিতে বলেন, শ্রীকুষ্ণ স্বয়ং যোগেশ্বর, মহাদেব অমন নিফলক্ক 
কিন্তু ইহাদের চরিত্রে নাকি কত দোষারোপ হইয়াছে। শ্রীকৃষ্ণ জীব 
উদ্ধার করিতে আসিয়া নাকি লাম্পট্যের শেষ সীমা দেখাইয়! 
গিয়াছেন। আর মহাদেব যিনি কটাক্ষে মদন ভম্ম করিয়াছিলেন 
তাহার নাকি কুৎসিৎ ব্যাধি পর্য্যন্ত হইয়াছিল। বাস্তবিক লোকে 
আপন প্রকৃতি ও রুচি অন্থসারে দেবতা গঠন করিয়া লয়। 

প্রশ্নভগবান নিরাকার অথচ হিন্দু ব্রাহ্ম সকল সমাজেই 
ভগবানের চরণ উল্লেখ করা হয় কেন? 

উত্তর+-চল্লণ উল্লেখ করিলেই ভগবানের প্রতি দাস্ত ভাব প্রকাশ 
পায়। ৬৫ 

১০ই শ্রাবণ রাত্রি-_বিহারীবাবু মাষ্টার প্রভৃতি উপস্থিত; ৪: 
প্রশ্ন করেন সর্বত্রই যদি ক্রন্ধ দর্শন হয় এবং ব্রান্ধীস্থিতি হয় তবে 


( ১৪২ ) 


বিরহ ব্যাপার কিরূপে সম্ভবে? সেদিন এ কথার কোন উত্তর হয় না। 
২ বলেন “চক্ষু বুজিলেই অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণার মত জ্যোতি দেখা 
যায়, পরে শরীর মন স্থির হইলে দপ করিয়া উজ্জল আলো! জ্ঞলিয়া 
উঠে। সে আলোর উপমা নাই |” বিহারীবাবু বলিলেন “একথ। 
এখন শুনিলাম, যদি এই ধারণ হইতে কল্পনাতেই আলো! দেখি ?” 
১; বলিলেন “সত্য আলো! পৃথক, তার গায় ছাপ মারা আছে। 
কল্পনার আলো এবং প্রকৃত আলো বুঝা যায়। অন্তকোষ তৈলাধার, 
বীধ্াই তৈলম্বরূপ, স্ক্্ম শিরারূপ শলীতা দ্বারা এ তৈল আকর্ষিত 
হইয়া সহত্রারে উঠিলেই দিব্য আলো! দেখা যায়। দে আলোর তুলন। 
নাই, অতি অিপ্ধ, অতি নিম্মল।” 


আর একদিন বলেন--“স্হম্ররে যে ক্ষ্য উদয় হয় তন্মধ্যেই 
নিজ ইট মুস্তি দেখা যীয় ৮ 


১৬ই শ্রাবণ রাত্তি 


১ বলেন “প্রজাদের নিকট হইতে টাকা পাইলাম না, কি অমূক 
আমার কতক ভূমি নিয়াছে বলিয়া আক্ষেপ করিতে নাই । চাহিয়! যাহ 
পাওয়া বায় দানে তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক পাইয়ছি। মায়ের 
কপা অজন্ত্র বর্ষণ হইতেছে । যেরূপ রাখিয়ছেন, বেশ রাখিয়াছেন 
এবপ মনে করিতে হয়, অনেক বিষয় উপেক্ষ। করিতে হয় নচেৎ শাস্তি 
আসে ন।। কেহ যদি কিছু নেম, কি পাওনাটা না দেখ তবে মনে 
করিতে হইবে পাওন! রহিল অথব। দেন! শোধ দিলাম ।৮ 

যাহাতে শ্বাসে প্রশ্বাসে নাম হয় তাহাই করিতে হয়। আসন 
প্রাণায়াম ন। করিলে অভ্যাস দৃঢ় ও স্থায়ী হয় না। তাহার উপর 
আনম্মোক্তারনাম! দিতে হয়, নচেৎ শান্তি কোথায়? 


( ১৪৩ ) 


২৯শে শ্রাবণ রবিবার, ১৩১৭ 


প্রাতে বাসলীল। পাঠ হয় তাহাতে গোপীদের ভগবানের প্রতি 
প্রেম ব্যাখ্যা হয়। ভগবান প্রত্যেকের হৃদয়ে আবিভূ্ত হইয়া ভক্তের 
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। কিন্ত যখনই অহঙ্কারের উদ্রেক হয়, তখনই 
তিনি অন্তদ্ধীন হন। রাসলীলা কেবল আধ্যাত্মিক ব্যাপার মাত্র 
কারণ গোপীরা সেই সময় নিজ ঘরেই শয়ান ছিলেন। ভগবান 
যোগমায়। আশ্রয় করিয়! তাহাদের সহিত এই লীল! করেন । 


বৈকালে 51ঃএর সহিত কথা হ্য়। শীক্ত ৫েষ্চব সকল সাধন 
মধ্যেই দেখা যায় তিনটা থাক আছে যথ! ভগবান, গুরু এবং 
জীব (সাধক)। ঈশ্বর, খৃষ্ট এবং খৃষ্টান । লোকে গুরুর ধ্যান করে 
কারণ ঈশ্বরকে দেখিতে পায় না। নিজে মলিন কিন্তু গুরু আদর্শ 
স্ব্ূপ। এই প্রণালী হইতে খুষ্টের উপাসনা হ্য। যদ্দি ভগবানের 
নিকট প্রার্থনা কর! হয় যে আমাকে ভাল কর তবে কি বুঝাবে? 
একটা আদর্শ থাকিবে ঘে অমুকের মত কর। বৈষ্ণবদের মতে 
শ্রীরাধিকাই আদর্শ, স্থৃতরাং তিনিই গুরু । তারপর অন্থভাবে দেখা 
যায় যখন কোন সাধকের চিত্ত ভগবানের প্রতি আসক্ত থাঁকে 
তখন এক অবস্থা, আবার যখন বিষয় ব্যাপারে মগ্ন থাকে তখন 
এক অবস্থা । তখন এ পূর্বাবস্থার জন্য লালসা হয়। এখানে ভগবান 
ও জীবের শুদ্ধ ও মলিন ২টী অবস্থা ধরিয়া তিনটা অবস্থা দেখ 
যায়। মোগ্রটির উপর জিনিষ তিনই এক, কেবল অবস্থার ভিন্নতা মাত্র । 


৪ঠ1 ভদ্র শনিবার রাত্রি 
7। বলেন যে বন্ধন তিন্‌ প্রকার । ১ম--পরিবারের প্রতি এমন 
আসক্তি যে এ সকল স্ত্ীপুত্র না থাকিলে পর অভাব বোধ হয়, ইহা 


0১৪৪ ) 


তামস। ২য়--এরূপ বোধ যে আমি না থাকিলে কে ইহাদের প্রতি 
দৃষ্টি করিবে, ইহা! রাজস। ও৩য়--এ সকল পরিবার হইতে একটু 
স্বতন্ত্র থাকিতে না পারিলে কিছু হবে না, একটু আলগা হইতে 
হয় ইত্যাদি--৩য় বন্ধন। প্রথম ও দ্বিতীয় বন্ধন অতিক্রম করিতে 
না পারিলে তৃতীয় বন্ধনকে বন্ধন বলিয়া মনে হয় না বরং ইহাই 
মুক্তি বলিয়া মনে হয়। যদি এরূপ বোধ হয় যে স্ত্রী না থাকিলে 
কে আমার উপযোগী আহারাদি বন্দোবস্ত করিবে, কে আমার 
তত্বাবধান করিবে, যদি এরূপই হয় তবে স্ত্রীর প্রতি মাঁতিভাব 
হইয়াছে মনে করিলেই হয় এবং তাহার সহিত এ পধ্যস্ত সম্পর্ক 
রাখিলে হয় । 

চুপ করিয়া থাকাই ভাল। শুনা অনেক হইয়াছে। কেবল 
শুনিলে কি হয়, একটু হজম করা দরকার । 

একটী পণ্ডিতের নিকট কেহ খণ চাহিতে গিয়াছিল। পণ্ডিত 
বলিলেন, আমি ৫০ টকা ধার দিতে পারিব কিন্তু ॥* আনার 
বেশী স্ুুর্দ দিতে পারিৰ না। তাহার বিশ্বাস ছিল যে ধার দিলে 
দক্ষিণা স্বরূপ কিছু স্দও দিতে হয়। 


৬ই ভাদ্র সোমবার রাত্রি 


577 বলিলেন €টা ইন্দ্রিয়, যথা শ্রদ্ধা, বীধ্য, স্বৃতি, সমাধি ও 
প্রজ্ঞা । শীল্্বাক্য এবং গুরুবাক্যে বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা বনে, এবং এই 
বিশ্বাসের বলে সাহস হয়। বিশ্বাস থাকিলে যে কোন ক'র্যে সাহস 
হয়, ইহীকেই বীর্য বলে। তারপর নিজের জীবনে কি কান্লাম না 
করিলাম, ইহা! পর্যালোচনা করার নাম শ্থতি এবং নিগৃঢ চিন্তা 
হইলেই সমাধি আসে। সমাধি লাভ হইলেই আর একটা জ্ঞান 


( ১৪৫ ) 


খুলিয়। যায়, তখন নৃতন ব্যাপার অন্তরে জাগরিত হয়, তখনই 
প্রজ্ঞা লাভ হয়। মনে নানা বাসন! কামন। আসে কিন্তু প্রজ্ঞা সেই 
সকল বাসন! কামনা সমূলে উতৎপাটিত করিয়া ফেলে। এই সমাধি 
ও প্রজ্ঞা! দৃঢ় হইলেই অভীষ্ট বস্ত লাভ হয়। 


১৯শে ভাদ্র রবিবার ( বৌদ্ধ গ্রন্থ ) 


কর্্মই আত্মার পুনর্জন্মের হেতু । আমের আঠি হইতে যেমন 
গাছ হইয়া আম হয় তদ্রপ যে কম্মগুলি সঞ্চিত থাকে তাহ 
হইতেই আবার জন্ম হয়। 

না জানিয়া যে পাপ করে, তাহা অপেক্ষা জানিয়া যে পাপ 
করে সে উত্তম, কারণ এ কাধ্যে পাপ জানিলে অনুতাপ আসে কিন্ত 
যেজানে নাযে এ কার্যে পাপ তাহার উহা জানিতেই কতক 
সময় লাগিবে স্তরাং যে জ্ঞানকৃত পাপ করে তাহার সংশোধনের 
উপায় শীঘ্র হয়। 

নাগসেন বলেন অতীত বিষয়ের জন্যও শোক করিবেনা, 
ভবিষ্যতের জন্যও নয় এবং বর্তমানের জন্যও নয় কিন্ত বর্তমানে 
এরূপ কোনও কার্য করিবে না যাহাতে ভবিষ্যতে ক্লেশ হয়। 

প্রস্তর অপেক্ষা কাষ্ঠট হাল্কা । প্রস্তর নিজে নদী পার হইয়া 
যাইতে পারে না কিস্ত নৌকার সাহাঁষ্যে পরপারে অনায়াসে যাইতে 
পারে। এরূপ গুরুর সাহায্যে পরপারে যাওয়। সহজ । | 

গল্প-একজন এক্টী পন্মফুল বিষুণচরণে দিয়াছিল, তাহার জীবনে 
এ এক্ট্রা মাত্র পুণ্য ছিল। ম্বৃত্যুর পর যখন জিজ্ঞাসা করা! হয় তখন 
চিত্রগুপ্তের পরামর্শানুসারে সে বলে ষে প্রথমে পুণের ফলভোগ 


করিবে । তদনুসারে স্বর্গে নিয় যাওয়ার সময় রাস্তায় একটা পদ্মবন 
১৩ 


( ১৪৬ ) 


দেখিয়া অসংখ্য পদ্ম বিষুচরণে দিতে লাগিল সৃতরাং তাহার আর 
নরকে যাওয়৷ হইল না । 

পাঁচটা উপায় দ্বার! পাপ নষ্ট করা যায়--(১) ভোগ (২) প্রায়শ্চিত্ত 
(৩) অনুতাপ (৪) উপাঁসনা (৫) ব্রহ্মজ্ঞান। 

51 পাঠ করেন_-ভগবানের মায়াতেই জীব আবদ্ধ আছে। 
সেই মায়ার অধীশ্বরকে ভজনা করিলেই সেই মায়া কাটান যায় 
নচেৎ অন্য উপায় নাই। পুজ্যপাদ অশ্বিনীকুমার বলেন যে তিনি 
এমন মায় দিলেন কেন? এখনই বা তাহার ভজনা করিব কেন? 
পরে ঠিক হয় যে তাহার ( অশ্বিনীকুমারের ) সহিত পরামর্শ না করিয়! 
কাধ্য করাতেই এরূপ ভূল হইয়াছিল । 


১ল। আশ্বিন রবিবার রাত্রি 

প্রথম আসার সময় শ্বাসপ্রশ্বাস প্রাণরূপে দেখা দেয়। যাওয়ার 
সময়ও শেষ পধ্যন্ত ইহার সহিতই দেখাশুনা থাকে। বাক্য লয় 
হয় মনে, মন লয় হয় প্রাণে । শ্বাসরূপে এই প্রাণ বহির্গত হয়। 
মৃত্যুর সময় একটা অজ্ঞানতা আসে স্থৃতরাং শ্বাস প্রশ্বাসে নাম 
নেওয়ার অভ্যাস হওয়া খুব ভাল। অজপা চলিতেছে, ইহার সহিত 
নাম যোগ করিয়! দ্রিলেই হয়। 


উত্তম ভাগবত যিনি, তিনি সকলের যধ্যে ঈশ্বর দর্শন করিবেন। 
স্থৃতরাং ভিক্ষার্থী বৈরাগী বৈষ্ণবদ্দিগকে কটু বলা দূরে থারুক অবজ্ঞাও 
করিবে না। বিশেষতঃ পঞ্চস্ুনাজনিত পাপ ক্ষালনার্থ '“ঞ্চ যজ্ছের 
বিধান আছে। ত্রহ্গধজ্ঞ, দৈবধজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ, পিতৃযজ্। কিছু 
দেওয়া কি খাওয়ান নৃযজ্জের মধ্যে । ব্রাদ্ষণও ক্ষত্রিয় হয়, ক্ষত্রিয়ও 
ব্রাহ্মণ হয় যথা দ্রোণাচাধ্য, বিশ্বামিত্র । 


(১৪৭ ) 
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩ 


৯7 কথাপ্রসঙ্গে বলেন- হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, ব্রাঙ্গ, সকল ধর্া- 
বলম্বীই জপ করিয়| থাকেন, স্থতরাং নাম জপটী সকলের অনুমোদিত 
এবং ভাল সাধন বল! যায়। নাম জপের প্রণালী কি তাহা দেখিতে 
হইবে। যখন কোন প্রস্তর ইত্যাদি জিনিষে তৈয়ারী মুক্তিতে ঈশ্বর- 
বুদ্ধি স্থাপন কর! যায়, তখন তাহাতে আরোপ বলা যাঁয়। ইহা! 
ভিন্ন নিরাকার প্রতীকও হইতে পারে, তাহাকে অভিধান বলে, 
তাহা ছুই প্রকার যথা সন্তণ ও নিগুণ। যখন ভগবানকে পিত। 
মাতা সখ! ইত্যাদি বলিয়। ভাক। হয়, তখন সগুণভাবে ডাকা হয়। 
তৎপর নিগুণকে ডাকিতে যাইয়াও প্রতীক অবলম্বন এবং প্রতীক 
ভিন্ন হইতে পারে। য্থা ওঁ প্রণব উচ্চারণে তাহাকে ভাকা গেল। 
(১ম) ওক্কারই ব্রঙ্ম এপ মনে করিয়া যে প্রণব উচ্চারণ করা 
হইল তাহাতে প্রতীক অবলম্বন করা হইল। এখানে প্রণবই তাহার 
প্রতীক হইল। (২য়) যখন এইটা মনে করা হয় ষে প্রণব উচ্চারণে 
সেই ত্রিগ্তণাতীত অথণ্ড সচ্চিদানন্ন ব্রহ্ধকে ডাক! হইল, প্রণব সেই 
অখণ্ডের একটা নাম মাত্র, এই সময় প্রতীক অবলম্বন করা হইল 
না, কারণ প্রণব উচ্চারণ করিলে উহার অতিরিক্ত অন্ত আর একটা 
জিনিষ বুঝ্িতে হইবে। জগদীশ বলিয়া ভাকিলাম, মনে করিলাম 
ঘে জগদীর্খই আমার লক্ষ্য, তিনিই সকল। ইহাতে জগদীশ প্রতীক 
হইল । রর জগদীশ বলিলে যদ্দি আর একজন মানুষ লক্ষ্য থাকে 
তবে জগদীশ শব্দটা তাহাকে ডাকার অবলম্বন মাত্র হইল কিন্ত 
প্রতীক হইল না৷ 


( ১৪৮ ) 


বৃহদারণ্যক ব্যাখ্য। 


আত্মাকে প্রতীক করিয়। যে ডাকা হয় অথবা ধ্যান ধারণা কর 
হয় তাহা! মোক্ষের অনুকুল এবং ইহাকে প্রতীক উপাসন। বলা যায় 
না, কারণ আত্মা নিজেই চিন্ময় পদার্থ । 


২১শে শ্রাবণ, ১৩৩৩ 

মনুস্তত্ব, মুমুক্ষুত্ব এবং মহাপুরুষের আশ্রয়, এই তিনটা জীবনের 
সার। অজ্ঞান, অরুচি, অনিচ্ছা এবং অক্ষমতা, এই চারিটা মৃত্যুব 
লক্ষণ। অশ্বম্ধেষজ্ঞকাঁরী ব্যক্তি হুর্ধ্য চন্দ্র ইত্যাদি লোক ভেদ 
করিয়। অন্ধকারের পরপারে অপর লোকে বাযুতে মিশিয়া যাইয়া 
ব্রহ্দ লাভ করে। সাধারণ দেহকে অশ্ব ( অর্থাৎ কল্য যে থাকিবে না ) 
জ্ঞান করিয়া তাহ দ্বার যজ্ঞ করিয়া অর্থাৎ ত্রচ্মে অর্পণ করিয়াই 
অশ্বম্ধ যজ্ঞের ফলভাগী হইতে পারে । 

গাছের যেমন বীজ পোড়াইয়া ফেলিলে এবং যে গুড়ি উঠে তাহ! 
নষ্ট করিয়া ফেলিলে আর গাছের জন্ম হয় না, তেমনি মানুষেরও বাসনা- 
বীজ নঈ হইলে আর পুনর্জন্ম হয় না। বাসনাই পুনর্জন্মের বীজ। 

সগুণ ব্রন্ষের উপাসন। করিয়। নিগুণ ত্রন্ধে পৌছিতে না পারিলে 
মান্য জন্ম বৃথা । নিগুণ ব্রন্মের উপাসনা করিতে হইলে মন, প্রাণ, 
বাষু, অগ্রি ইত্যাদি কোন প্রতীক অবলম্বন করিতেই হইবে । কিন্তু 
এই প্রতীকই ব্রহ্ম নহেন তাহাও মনে রাখিতে হইবে । 

পরোপকার ইত্যাদি কাধ্য করিলে খুব আনন্দময় বান লাভ হয়, 
যিনি ব্রহ্ষকে আশ্রয় করেন তিনি তাহাকেই পান। এখন «ব সমস্ত 
কাধ্য ও চিন্তা করা হইতেছে তাহা আদিত্যগণ সঞ্চয় করিয়া রাখিতে- 
ছেন, এই অনুযায়ী ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্মিত হইবে 1 


( ১৪৯ ) 


২র। ভাদ্র, ১৩৩৩ 


34: কথাপ্রসঙ্গে বলেন ষে সংযমই প্রধান সাধন। হিন্দু মুসলমান 
খৃষ্টান সকলের মধ্যেই সংযমের ব্যবস্থা । মুসলমানেরা ৩* দিন রোজ! 
করে, থৃষ্টানের! ৪০ দিন সংযম করে। হিন্দুরা সকল কার্য্যেই সংঘমের 
ব্যবস্থা করে। শ্রাদ্ধাদি কার্যের পূর্বদিন সংযম করিতে হয়। সংঘ্মী 
লোক স্থৃস্থ এবং দীর্ঘজীবী । যখন কোন জাতির মধ্যে সংযমের 
অভাব হইয়! বিলাসিতার প্রভাব হয়, তখনই সেই জাতির পতন 
হয়। কোন বদ্ধিষু পরিবারের প্রতি লক্ষা করিলে দেখা যাইবে 
তাহারা মিতব্যয়ী, সকল কার্যে সংযম আছে। যে পরিবারের 
অধঃপতন দেখা যায় তত্প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাক তাহারা 
বিলাসিতার শোতে গ ঢালিয়া দিয়াছে। নিজের সখ ভোগের 
প্রতিই লক্ষ্য, অন্যের প্রতি লক্ষ্যই নাই। তাহারা নিজের স্থার্থই 
দেখিবে, অন্তের দ্রিকে চাহিতে সময় হবে না। যাহারা সংযমী 
তাহারা সময়ের ব্যবহার জানে, কোন প্রলোভনের বস্তু উপস্থিত 
হইলে সংয্মী লোক পাশ কাটাইয়া চলিয়। যায় কিন্ত অসংযমী লোক 
তাহা পাইবার জন্য ব্যাকুল হয়। সংযমী লোক অন্যের দোষ 
দেখিলে মেত্রী, করুণ!, মুদদিতা, উপেক্ষা প্রভৃতি অবলম্বন করিয়া 
শান্তিলাভ করে। একটু চিন্তা করিলেই দ্রেখা যায় যে স্তম 
প্রত্যেক কাধ্যেই দরকার নচেৎ শাস্তি সখ লাভের আশা করা. 
যায় না।কেহ বলিবে এত বৎসর সাধন নিয়াছি, কিছু হইতেছে 
না। স:ঘষের অভাঁবই কিছু ন! হওয়ার কারণ। 


৫ 
উপনিষদে সঞ্চিত, প্রা এবং ক্রিয়মান--তিন প্রকার কন্মের 
উল্লেখ আছে। বহু জন্মের যে সংস্কার তাহ! সঞ্ষিত, ঠিক পূর্ব 


(১৫০ ) 

জন্মের কর্মফল প্রারন্ধ এবং বর্তমান জীবনের কন্মকে ক্রিয়মান 
বলা যায়। 

পৃজ্যপার্দ 91 বলিলেন একটী প্রকাঁওড হুদ আছে, তাহার জল 
স্থিরভাবে আছে। সেই হ্রদের এক পাশ দিয়া একটি খাল কাটা 
হইয়াছে। হ্ুদের মধ্য হইতে যে খালের মুখে জল প্রবেশ করিতেছে 
সেই স্থানের জলগুলি খালের মুখে আলোড়ন করিতেছে । খালের 
মধ্যে জল প্রবেশ করিয়া নানাগতিতে বেগে জলগুলি চলিতেছে । 
প্রকাণ্ড হুদের যে জলগুলি স্থিরভাবে আছে তাহ সঞ্চিত কম্ম । ঠিক 
খালের মূখে প্রবেশ করিতে যে জল নড়িতেছে ইহাই ঠিক পূর্বজন্মের 
কন্দ এবং প্রারধ বলা যায়। খালের মধ্যের জলগুলিতে তরঙ্গ 
এবং গতি আছে স্ৃতরাং তাহা ক্রিযমান বল! যাইতে পারে। 
্রন্ধজান হইলে সঞ্চিত এবং ক্রিয়মান কন্মের শেষ হয় কিন্তু প্রারন্ধ 
ভৌগ করিতেই হইবে । ইহাকেই বলে 'ভোগাদেব ক্ষয়: দুরে 
একটি ব্যান্্র দেখিয়া বাণ ছাড়া হইয়াছে, তৃণে আরও বাণ আছে । 
বাণ ছাড়িয়া দেখা গেল ওটি ব্যাপ্র নহে, গরু। এখন ওটা যে 
প্রকৃত গরু তাহার জ্ঞান হইল সত্য কিন্তু নিক্ষিপ্ত বাণ আর 
ফিরাইবার সাধ্য নাই । জ্ঞান প্রভাবে অন্য বাণ প্রয়োগ না করাতে 
ক্রিযমান কর্ধের শেষ হইল এবং সঞ্চিত বাণগুলিরও ব্যবহার 
হইল না কিন্তু নিক্ষিপ্ত বাণের ফল ভোগ করিতেই হইবে। 
স্থৃতরাং ব্রহ্মজ্ঞানী লোকেরও ক্যান্সার হওয়া কি শ্ন্য কোন 
ভোগ হওয়া আশ্চধ্য নহে। ব্রহ্মজ্ঞান হওয়া নিতান্ত প্রয়োজন 
নচেৎ মুক্তির আশা বৃথা । 

একটী বিষয় প্রথম পরম পুজাপাদ 51.এর নিকট অবগত 
হইলাম। যাহারা সাবিত্রীদীক্ষা গ্রহণ করে তাহাদের আর অন্য 


( ১৫১ ) 


দীক্ষার 'প্রয়োজন নাই । কিন্তু অনেক দিন পর আমার পত্বোত্তরে 
৯-৯-৩০ ভারিখে লিখিয়াছিলেন, “বেদান্ত ত্রদ্ধকে সৎ চিৎ আনন্দ 
স্বরূপ বলেন। সাংখ্যে এক ব্র্ধ স্থলে বহু যুক্ত পুরুষ স্বীকার 
করে এবং প্রত্যেক মুক্ত আত্ম ব্রদ্দের স্তায় ভূমা। তবে সাংখ্যের 
আত্মা কেবল চৈতন্ত মাত্র তাহাতে আনন্দ নাই। তন্ত্রনকলও 
সাংখ্যমত আশ্রয় করিয়া আনন্দ অংশ বদ্ধিত করিয়া ব্রদ্ম ভাবন! 
করে। সাবিত্রী দীক্ষায় যে ব্রন্মের উপাসনার উপদেশ আছে তাহ! 
বেদান্ত অনুযায়ী, স্থৃতরাং তিনি সচ্চিদানন্দরূপী, কিন্ত মোক্ষার্থা 
ইহারও পরে শ্রদ্ধ চিন্ময় আত্মার স্বরূপ লাভ করিতে গিয়া ২য় 
দীক্ষার প্রতীক্ষা করেন? । 

কাশীতে হিন্দু মহাসভায় এক মন্তব্য গৃহীত হয়_-“যে ত্রাক্ষণ 
ক্ষত্রিয় বৈশ্য সন্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করেন তাহাদের উচিত 
তাহাদের সম্ভতানগণের উপনয়ন শাস্তান্থসারে অষ্টম বর্ষেই দিবেন ।” 
আমি গকে জিজ্ঞাসা করি যে ৮ম বৎসরের বালক উপনয়নের 
কি বুঝে? তদুত্তরে ১17 ১৭-১-২৯ তারিখে লেখেন “বৃদ্ধ কামিনী 
পণ্ডিত মহাশয় গত ১২ই পৌষ স্বর্গারোহণ করিয়াছেন এখন বুঝি 
আমার পাল! ?-_-যখন অষ্টম বর্ষে উপনয়ন হইত তখন মাতৃভাষা 
সংস্কৃতই ছিল, বিশেষতঃ ত্রিবর্ণের । অত শৈশব হইতে প্রাণায়াম 
শিক্ষা ও শুদ্ধ আহার আচরণ হইতে থাকিলে দীর্ঘায়ু না হওয়ার 
কারণ নাই.॥ হিন্দুর সদাচার কেবল ইন্দ্রিয় নিধ্যাতন নহে, উহা 
ইন্দ্রিয় “যম, সেই সংযম যত শীগ্র আরম্ভ হয় ততই উদ্দেশ্ত সিদ্ধির 
অন্থুকৃ হয় | +% % ঈ ৯)? 

একদিন বলেন “বড় পরাধীন হইয়া পড়িয়াছি*। আমি বলিলাম 
“ক্সে এত পরাধীন মনে করেন?” অন্য লোক আদিল, আর 


(.১৫২ ) 


কথ হইল না। 91 যে কত ভালবাসিতেন তাহা কি আর 
লিখিয়া প্রকাশ করা যায়? 51এর নিজ হাতের লেখা শেষ পত্রখান। 
হইতে একটু লিখিয়া ক্ষান্ত করিব। 

বরিশাল, ২৫শে চৈত্র, ১৩৩৮ 

%* যে শরীর লইয়। কলিকাতা ও মধুপুরে গিয়াছিলাম তাহার 
বিশেষ কোন উন্নতি হয় নাই। লাভের মধ্যে ছুটা চক্ষুই প্রায় 
অন্ধ লইয়। ফিরিয়াছি। এই পত্র অতিকষ্টে লিখিতে পারিতেছি। 
*** তুমি যদি গ্রীষ্মের বন্ধে আসিতে পার তবে স্থুখী হই। 
তাহার পূর্বেও আমার কোন অস্থুবিধা নাই । **?? 

51 যে কি নিয় আনন্দ করিবেন ঠিক পাইতেন না, একদিন 
বলেন “এ বাসায় ননীই কেবল অন্নদার বন্ধু” । আমিও বলিলাম “তবে 
এখন হইতে বলব যে 51 আমার দুধটুক গরম করিয়! দেন, এটুক 
কি ওটুক করেন” তখন চুপ। শেষকালে লক্ষ্য করিয়াছি যে একটা 
গান 51 খুব ভালবাসিতেন। গানটা এই-“ম্রি হায় কি অপরূপ 
&ঁ কালরূপ আমি বড় ভালবামি।” এই গানটা করিলেই $%কে 
আর পাওয়া যাইত না, তিনি যেন কোথায় চলিয়া যাইতেন। 
এক এক জনের এক এক গান লক্ষ্য করিয়াছি--কালীবাড়ীর 
ঠাকুরের ছিল “মাগো মা জয় কালী নাম সেই তোমার*৯*১,, 
৬অশ্বিনী কুমারের ছিল “কত গুণের তুমি আমার প্রেমময় হরি” 
কাঁলীশ পণ্ডিত ম্হশিয়ের ছিল “জগৎ জোড়া হরির মেলা”। 51:এর 
ছিল “মরি হায় কি অপরূপ ইত্যাদি | 

1. একদিন হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিলেন--বল দেখি অন্নদা, ঈশ্বর 
আছেন এ কথার প্রমাণ কি? আমি ন! ভাবিয়! চিস্তিয়া বলিয়া ফেলি- 
লাম “আমি আছি” ইহাই বড় প্রমাণ। তখন বলিলেন, ঠিক বলেছ। 


( ১৫৩ ) 


একদ্রিন বলেন--তোমীর ছেলে সতীপদ ইংরাজীতে বড় কাচা, 
স্থতরাৎ মেটিকিউলেসন পাশ করা দূরে থাকুক এলাউ হইতে পারে 
কিনা সন্দেহ । আমি বলিলাম “ওকথা শোনে কে? ছেলে পাশ 
করাইয়া দিতেই হবে” । তখন বলেন “আচ্ছা গ্রীষ্মের বন্ধের সময় 
উহাকে প্রত্যেক দিন টৈকালে আমার নিকট পাঠাইয়া৷ দিও ।” 
তাহাই হইল এবং সতীপদ্দ ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হইয়া গেল। শ্্রীমান্‌ 
হরিপদ ৪র্থ শ্রেণীতে উঠিয়া কেমন হইয়া গেল। 51: তাহা টের 
পাইয়াছেন। পরিশ্রমও করে অথচ পরীক্ষায় ফল ভাল হয় না। তারপর 
১৫৮ বলিলেন “তুমি এক কাজ কর-_তুমি শ্রীশকে ধর, সে ২।১ মাস 
একটু দেখিলে উহীর দোষটুকু সারিয়া দিতে পারিবে ।” তাই হ'ল, 
শ্রীশবাবু ২ মস আন্দাজ সময় দেখিয়াই বলিলেন উহার ত্রুটি সারিয়া 
গিয়াছে, আর ঠেকিবে না। বান্তবিকও তাহাই হইয়াছে । এই 
শ্রীশবাবুই এখন বরিশালে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন । 

একবার আমার বড় ছেলে শ্রীমান্‌ শ্টামীপদ গুরুতর রোগাক্রান্ত হইয়! 
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিল। 5:এর এক ভাগিনেয় শ্রীযুক্ত 
যতীনবাবু তখন এ কলেজে ৫ম বাধিক শ্রেণীর ছাত্র । ৯1: যতীন বাবুকে 
লিখিলেন “আমার অস্থখ হইলে তুমি যতটুক যত্ব করিতে, আশা করি 
শ্তামাপদের জন্য তা অপেক্ষা একটুও কম করিবে ন11” 

কত যে প্রেম, কত যে ভালবাসা ছিল ত ত আর বলা যায় না। 
লিখিয়াত শেষ করা যায় না। এক পত্রে লিখিয়াছেন, এই 
জরাজীর্ণ দেহখানিকে সুস্থ ও সুখী রাখিবার জন্ত তোমার আগ্রহ 
দেখিয়া শেখে জল আসিতেছে। 

5?:এব ধারে বসিলে কি যে খাওয়াবেন তাহার ঠিক পাইতেন না। 
এক দিন বপিয়াছি 51 বলিলেন- অন্নদা! শোন শোন-- 


( ১৫৪ ) 


“নাহং দেহে জন্ম মৃত্যু কুতোমে। 
নাহং প্রাণঃ ক্ষুৎপিপাসে কুতোমে । 
নাহং চেতঃ শোকমোহে কুতোমে | 
নাহং কর্তী বন্ধমোক্ষৌ কুতোমে 1” 
আর এক দিন বলেন--তীরবথ মে সব পানীহৈ, হোয়ে নহী 
কুচ অহ্রায় দেখা । তারপর একটা গান বলিলেন-_ 
সাধু ভাই জীবতহী কর আশা 
তন ছুটে শিব মিলন কহত হৈ সো সব ঝুটী আশা, 
অবহু মিলা সো তবহু মিলেগে! নহিত যমপুরবাসা। 
সত্য গাহে সদগুরুকে। চিনহে সন্ত নাম বিশ্বাসা। 
কহৈ কবীর সাধন হিতকারী হাম্‌ সাধনকো দাস! । 
বুঝলেত? এখানে যদি মিল্তে পার তবেই সেখানে গিয়ে 
মিলতে পারবে নচেৎ যমপুরে বাসা, এই দেহ অস্তেই যে মিলন হবে 
ও সকল আশা মিথ্যা । 
একটা লক্ষ্য করিয়াছি, কোন রকম সাম্প্রদায়িকতা ছিলন1। যাহার 
মধ্যে যাহা ভাল পাইয়াছেন তাহারই প্রশংসা করিয়্াছেন। এক 
দিন ওকে জিজ্ঞাসা করি (ম্হাত্মার আবির্ভাবের অনেক পূর্বে ) 
১17) আপনার ঘরে কলসীতে খাওয়ার জল অথচ মুসলমান ছেলেরা 
আসে, ইহাতে আপনার জাত যায় না? ১ বলিলেন দূর পাগল, 
ওতে কি জাত যায়রে ? 
একদিন সতীশবাবুর (৬শ্বামী প্রজ্ঞানন্দ ) সহিত কথা হয়, 
তিনি বলেন ভগবান শুদ্ধবুদ্ধির গোচর এবং কেবল ধ্যানের গম্য। 
আমি বলি যে পরমহংস বলিয়াছেন “তাহাকে দেখা যায়, তুমি 
আমি যেরূপ কথা বলি এরূপ কথা বল! যায়।” সতীশবাবু তাহা 


€॥ ১৫৫ ) 


স্বীকার করেন না, তারপর 91এর কাছে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি 
বলেন--ভগবান যখন সর্বশক্তিমান তখন তিনি সকলই হইতে 
পারেন নচেৎ তাহার শক্তিকে সীমাবিশিষ্ট করিতে হয়। মৎস্য 
কুম্মরূপেও তাহার আসিতে হইয়াছিল” । তারপর আবেগের সহিত 
বলেন “আমাকে আনিয়া তিনিও পিপাকে পন্ডিয়াছেন। আমার 
ভাবনা তাহারই ভাবিত্ে হইবে । জীবের যখন যেরূপ অবস্থা তখন 
সেরূপ হইয়া আসিতে হইয়াছে । জীবের মন্লের জন্যই তিনি 
মস্ত কুশ্ম বরাহ রূপে আসিয়াছেন ।” 
গত বৈশাখ মাসে পরলোকগত সাধক পণ্ডিত শিবচন্দ্র বিছ্যার্ণব- 
কৃত গীতাঞ্জলি হইতে শুক সারীর বিবাদের মত একটি গান করি । 
তাহাতে 51এর আনন্দ দেখিয়া আমি অবাক হইলাম। ভিন্ন 
ভিন্ন সময়ে ৩৪ জন বিশিষ্ট ভদ্রলোককে আমার দ্বারা এ গানটা 
গাওয়াইয়। শুনাইলেন। কি যে জিনিষ 51 উহাতে পাইয়াছিলেন 
তিনিই জানেন। গানটার কিয়দংশ আমি নিক্সে লিখিলাম | 
তন্ত্র বেদের বিষম বিচার মাকে লয়ে 
মাকে লয়ে মাকে পেয়ে পেয়েও দেখি না পেয়ে ।-- 
১। বেদ বলেভ্রান্ত তন্ত্র মা বলিলে কারে? 
তন্ত্র বলে জন্মান্ধবেদ দেখতে না পায় যারে (তোমার অগোচরে) । 
২। বেদ বলে নিরাকার মায় কে দেখেছে কবে? 
তন্ত্র বর্পে নিরাকারে মা সাকার প্রসবে (তুমি কোথাকার কে)। 
৩। বেদ বন্দে আমি মায়ের নিঃশ্বাস নির্গত, (নিঃশ্বাস নিরাকারের ) 
তন্ত্র বলে তাইতে তোমার বিকাশ ও ভাই এত। 
৪। বেদ বলে মা যে বাক্য মনের অগোচরা।, 
তন্ত্র বলে, বলে থাকে কাজে কুঁড়ে যারা (সাধন পদ ন। পেয়ে)। 


( ১৫৬ ) 


৫ | বেদ বলে তন্ন তন্ন বুঝে ন! পাই ভবে ; 
তন্ত্র বলে যেখানে থাকে আপনি খুঁজে নেবে (খুঁজতে যাব কেন)। 
৬। বেদ বলে বৃথা চেষ্টা সকলই ভাই মায়া 
তন্ত্র বলে মায়ার মধ্যে হাসেন মহামায়া (এ যে মায়ের মায়া) । 
৭। বেদ বলে মা যে আমার নিগুণ স্বভাবা ; 
তন্ত্র বলে গুণের সীমা দিতে যাবেন বাবা (তুমি আমি কেবা)। 
৮ বেদ বলে ব্রন্দের আমার কোন ক্রিয়া নাই; 
তন্ত্র বলে পর ব্রহ্ম শবরূপ তাই (মায়ের চরণ তলে)। 
বেদ বলে কেন আর ভাই বিবাদ করি তবে, 
তন্ত্র বলে আর কি দাদা বিবাদ সম্ভবে (এ দেখ চেয়ে)। 
বেদ বলে আ মরি ভাই কি দেখিলাম এ 
তন্ত্র বলে যা দেখলাম তা বলতে পারি কৈ (ভুলায় কোলে লয়ে)। 
বেদ তন্ত্র চন্দ্র স্ধ্য দুটা কোলে নিয়ে; 
নব কাদঘিনী কান্তি কালী বসিলেন হাসিয়ে (ত্রদ্ষময়ী মেয়ে)। 
ঘুমাইল দুজন এখন ম। যে দেখি একা, 
এ দশাই ভাই ঘটবে যে তার যার সনে মার দেখা 
(শেষে মাবই আর নাই) । 
বিচার বিবাদ তার কি থাকে মধ্যস্থ যার শ্তাম। ; 
শিবচন্দ্র বলে বাজল তশ্ত্রের আনন্দ দামাম! (জয় জয় শ্যামা রবে) । 
51:এর ভাব হৃদয়ঙ্গম করা আমার সাধ্যয়াত্ত নহে । ডাঃ কাঞ্তিকচন্ত্ 
বন্ধুর অঙ্গীকার আছে “অপরের.মহত্ব উপলদ্ধি করিতে, হইলে নিজকে 
তাহার সমান মহত্বের এক ধাপে উঠিতে হয়”। 5৫ত বলিতে বুঝাইতে 
কম করেন নাই কিন্তু আমর! তা! ধবিতে পারি নাই । | 





জগদীশ-__“বিদ্ঠামন্দিরে 


পবা পালক 





বোলাতে াউরিত 








“পিতা নোহসি, পিতা নোহুসি” 


জন্ম জন্মান্তরের সঞ্চিত সৌভাগ্য ছিলই, তাহ! না হইলে কেমন 
করিয়া আচাধ্যদেবের পবিত্র আশ্রমে প্রবেশ করিতে পারিয়াছিলাম ? 
যে অধিকার লাভ করিয়াছিলাম, সে অধিকাঁর যে কত বড়, কত দুর্লভ, 
তাহা কি আজ এই জীবনের অপরাহেনেও উপলব্ধি করিতে 
পারিতেছি ? 


আশ্রমে স্থান পাইলাম। কিন্তু আচাধ্যদেবের পরিচয় পাই- 
লাম্নী। মহাসমুদ্রের বেলাভূমিতে দাড়াইয়া তাহার বিরাট গাভ্ভীষ্যে 
স্তব্ধ হ্ইয়া রহিলাম, “মৃত্তিকার শিশুদের” জন্য ঘে তাহার উদ্বেল 
উচ্ছ্বাস তাহা লক্ষ্য করিতে পারিলাম না। পারিবার বয়সও তখন 
ছিলনা । তাঁহীকে ভয় করিতাম, ভক্তি করিতাম, শ্রদ্ধা করিতাঁম, 
এমন কি, হয়ত পৃজাও করিতাম_কিন্তু ভালবাসিতে সাহস 
হইতনা। এ যেন শ্বেতমশ্মরে খোদিত দ্রেববিগ্রহ, রক্তমাংসে গঠিত, 
মনুযা নহে। 


কিন্তু একদিন পরিচয় মিলিল। ব্রজমোহন বিগ্যালয়ের ছাত্রা- 
বাসেই থাকিতাম। পরীক্ষার পড়ায় আচাধ্যদেবের সাহায্যের জন্ত 
গ্রীম্মাবকাঁশে আশ্রমে আসিয়াছিলাম। ছুটি শেষ হইলে আশ্রম 
ছাঁড়িয়। ছাত্রাবঠসে ফিরিয়া যাইবার আয়োজন করিতেছি, এমন সময়ে 
আচাধ্যদ্রেব আমাকে ডাকিলেন, আস্তে আন্তে বলিলেন, “তুমি 
যেওনা, তোমার জন্যে আমার একটু মায়া হয়েছে! আজ জানি 
কথাট। .মায়। নয়, দয়্া--এ একজনের প্রতি শ্রেহ নয়, সর্বভূতে ভাল- 


( ১৫৮ ) 


বাসা। তা সে মায়াই হউক আর দয়াই হউক, তাহাকে যেন 
চিনিলাম। প্রাণট] আমার জুড়াইয়া গেল। জগতের ছুঃখ তাহ। 
হইলে এ বুকে বাজে! এ প্রস্তরে খোদিত মৃত্তিমাত্র নয়। প্রস্তরের 
আবরণের অন্তরালে একট! প্রাণ আছে, যাহা জগতের ছুঃখে নিরস্তর 
গলিয়৷ গলিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে ! 

আশ্রমে থাকিয়া গেলাম, আচার্ধাদেবের কুটারেই থাকিবার 
স্থান হইল । তখন আমার সেই বয়স, যে বয়দে অজানার ছুনিবার 
আকর্ষণে মানবচিত্ত ব্যাকুল হইতে চায়, জানায়--তার প্রাণ পূর্ণ 
করিতে পরেনা। কেউবা জ্ঞানের পথে, ভক্তির পথে ছুঁটিয়৷ যায়, 
আবার কেহবা কনম্মের প্রবল শোতে ঝাপাইয়া পড়ে। আমি 
ভক্তির পথ বাছিয়া লইলাম। অতি প্রত্যুষে শধ্যাত্যাগ করিয়া 
পুষ্পচয়ন করিতাম, দেবমন্দির মাজ্জনা করিতাম, বিগ্রহের পাদমূলে 
পুষ্পাঞ্লি দিতাম, ভক্তিগ্রন্থ পড়িতাম, মত্ম্যমাংস খাইতামনা, 
নিরামিষ আহার করিতাম। একদিন ডাকিয়া বলিলেন, গরীবের 
ছেলে, এটা খাবনা, ওট। খাবনা, এরকম করিলে চলেনা । যাহ! 
মিলিবে তাহাই খাইবে, যখন সম্পূর্ণ স্বাধীন হইবে তখন যেরূপ 
ইচ্ছা খাইবে। আর একদিন বলিলেন, গোবর দিয়া ঠাকুরঘর 
লেপা--ও তোমার কাঁজ নয়। ও কাজ যাদের তার করিবে । 

আর একদিন ঘরের মধ্যে বসিয়। আছি, আচাধ্যদেবক আর 
আমি। আমার কাছে আনিকা দাড়াইলেন, ধীরে ধীরে বলিলেন, 
“তোমাকে আমি গায়ত্রী মন্ত্র দিতেছি, তুমি এই মন্ত্র জপ করিবে ।” 
গায়ত্রী মন্ত্র জপ! কায়স্থ বংশে আমার জন্ম, নিজেকে শূদ্র বলিয়াই 
জানিয়াছি, ভাবিয়া আসিতেছি, গায়ত্রীমন্ত্র শ্রবণ করিলেও যে 
আমার মহাপাপ, জপ করাত দুরের কথা! “না, সে আমার দ্বার 


€॥ ১৫৯ ) 


হইবে না।”, দৃঢ় কণ্ঠে আচার্ধ্যদেব কহিলেন, "আমি বল্ছি, তোমার 
কিছু মাত্র পাপ হবেনা” তারপর ধীরে ধীরে মন্ত্র উচ্চারণ ও 
ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন, আমি অভিভূতের মত শ্রবণ করিতে 
লাগিলাম। যুগ যুগান্তর ধরিয়া অধিকার-বঞ্চিত আজ আপনার 
অধিকার ফিরিয়া পাইল 

কিন্তু তথাপি চিত্ত শান্ত হয় না। কে আমাকে শান্তির পথ 
দেখাইবে? কোথায় গুরু, এই অন্ধকার পথে কোথায় আলো? 
আমার মনের এ অস্থিরতা আচাধ্যদেবের দৃষ্টি এড়াম্নাই । 
বার বার বলিয়াছেন, “দেখ, কালীশের কাছে দীক্ষা! লও । আমি চুপ 
করিয়া থাকিতাম। কালীশচন্দ্রকে দেবতা বলিয়া জানিতাম কিন্ত 
প্রাণের ভিতরে গুরুর যে ছবি তাকিয়াছিলাম, সে ছবি গৃহীর 
নহে, সন্্াসীর। আমার মনের কথ! তিনি পাঠ করিয়াছিলেন, 
বলিলেন, *দেখ, কালীশ সামান্য মান্থষ নয়, ও আমার চেয়ে 
অনেক ভাল, অনেক বড়।, 

মনের অস্থিরতা বাড়িয়াই চলিল। গভীর রাত্রে একদিন 
সতীর্থ সঙ্গে প্রায় নিঃসম্লে পুরীধামে পদব্রজে যাত্রা করিলাম । 
আঠার দিনে পুরীর সমুদ্রতটে জটিয়া বাবার আশ্রমে উপস্থিত 
হইলাম। মঠধারী সন্্যাসীকে প্রার্থন। জানাইলাম, “আমি দীক্ষা- 
প্রার্থী, আমাকে দীক্ষা দান করুন|” সন্গ্যাসী কহিলেন, “বাৰা, 
তোমার গুরু আগে হইতেই স্থির হইয়া আছেন। গুরুর 
জন্ত তোমাকে এখানে সেখানে ছুটাছুটি করিতে হইবেনা। 
তোমার যিনি গুরু, তিনি নিজে যাচিয়া তোমার ঘরে গিয়া 
তোমাকে দীক্ষা দিবেন। এখন ফিরিয়া যাও, লেখাপড়া শেষ 
কর। তোমাকে সংসারী হইতে হইবে কিন্তু ভয় নাই, সংসার 


( ১৬৭ ) 


তোমাকে বাধিতে পারিবেনা, সংসার হইবে তোমার মুক্তির 
সোপান ।, 

আবার ফিরিয়া চলিলাম। পথের ডাকে ধাহার কথা ভূলিয়! 
গিয়াছিলাম, ঘরের ডাকে আজ তাহার কথা মনে পড়িয়া গেল। 
ভয় হইল, তিনি না জানি কত মন্দই বলিবেন, দুঃখ হইল, লজ্জা 
হইল, কত ব্যথাই ন! জানি তাহার বুকে বাজিয়াছে! দুঃখে, ভয়ে, 
সঙ্কৌোচে, আপনার অপরাধে সচেতন অপরাধীর মত আশ্রমে প্রবেশ 
করিলাম। ন্সানীহার করিয়া বিশ্রাম করিলাম। বুক তখনও দুরু 
দুরু করিয়া কাঁপিতেছে। দেখা যখন হইল, প্রথমে চোখের দিকে 
তাকাইতে পারিলাম না। যখন পারিলাম তখন দেখিলাম, ক্ষমা- 
সুন্দর সেই চক্ষু অসীম স্নেহে ও করুণাক্স ছলছল করিতেছে, 
[নঃসংশয়ে বুঝিলীম চাহিবার পূর্ধেই ক্ষমা মিলিয়াছে! বলিলেন, 
'পডাশুনায় অনেক ক্ষতি হইয়াছে, এইবার মন দিয়া 
পড়া কর ।? 

এই আশ্রমে অবস্থান কালে আর একজন মহাপুরুষের স্পর্শ 
লাভ করিয়! ধন্য হইয়াছিলাম। পৌষের ছুরন্ত শীতে গভীর নিশীথে 
অদ্ধ পৃথিবী যখন নিদ্রায় অচেতন, তখন সেবাত্রত কালীশচন্দ্র 
কাধের উপরে কম্বলের বোঝা লইয়া বরিশাল সহরের রাস্তায় 
রাস্তায় ঘুরিয়৷ বেড়াইতেছেন, আর পথিপার্থে, শিশিরবর্ষী উন্মুক্ত 
আকাশের তলে যেখানে যে হতভাগ্য অনাবৃত শরীরে শীতে 
কাপিতেছে, নিঃশবে দেবদূতের মৃত তাহার গায়ের উপর একথানি 
কমল রাখিয়া আর একজন হতভাগ্যের সন্ধানে ছুটিয়া চলিতেছেন। 
কালীশচন্দ্র আচাধ্যদেবের কি ছিলেন ও কতখানি ছিলেন বুঝাইয়! 
বলিবার সাধ্য নাই। মহাঁধাত্রার মহা মুহূর্তে নিরশ্রুনেত্রে জগদীশ 


( ১৬১ ) 


উচ্চৈম্বরে জিজ্ঞাসা করিতেছেন--কালীশ, কি দ্রেখ? কালীশ, কি 
দেখ? মরণ জয়ী প্রেমিক সাধক স্থম্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর দিতেছেন-_ 
জগন্নাথ, জগন্নাথ ! 

আমার শৈশব ও বাল্যকাল চিরকুমার ব্রহ্মচারী তারিণী চরণ 
বস্থ মহাশয়ের ন্রেহক্রোড়ে অতিবাহিত হইয়াছে । টঠেৈশোর ও 
যৌবনের সন্ধিক্ষণে আচাধ্যদেবের চরণে আশ্রয় জুটিল। ব্রহ্মচারীর 
জীবন আমাকে আকর্ষণ করিত। একদিন আচার্য্যদেব বলিলেন, 
ত্রহ্গচধ্য বা সন্গ্যাস সাধারণ নিয়ম নহে, উহা নিয়মের ব্যতিক্রম । 
তোমরা যদি বিবাহ না করিবে, বিবাহ তবে করিবে কাহারা? 
বিবাহ করিবে, কিন্ত পণ গ্রহণ করিবে না।” বাবা পাগলচাদের 
আশ্রমে পাগলী মাও বলিয়াছিলেন, “বিবাহ করিবে । নিজে 
মেয়ে দেখিয়! পছন্দ করিবে, থে মেয়ের চোখ ছুটি দেখিবে শাস্ত 
নিশ্মল, মুখে লক্ষীপ্রী আছে, তাহাকে পছন্দ করিবে 1৮ 

সত্যকে তিনি ভালবাসিতেন কিন্তু সে ভালবাসা যে কতখানি 
তাহার আভাস পাইবার স্থযোগ একদিন ঘটিয়াছিল। বাল্যাশ্রমের 
সরস্বতী পুজা উপলক্ষে বেলুড় মঠ হইতে ্রীমৎ স্বামী প্রেমানন্দ, 
নিশ্দলানন্দ ও অশ্থিকানন্দজী আসিয়াছেন। ক্ষুদ্র সহর আনন্দের 
বন্যায় ভাসিয়া যাইতেছে । একদিন প্রশ্নোত্তর সভায় তুলসী মহারাজকে 
( নির্মলানন্দজী ) প্রশ্ন কর] হইল, “আমার জীবন বিপদাপন্ন, সত্য 
কথা বলিলে ,ম্ৃত্যু অনিবার্য, একটি মিথ্যা কথা বলিলে জীবন 
রক্ষা হইতে পারে। আমি কি মিথ্যা বলিতে পারি ?” স্বামীজি 
বলিলেন, 'পণ্ডিতেরা বলেন এ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা যাইতে 
পারে ।১ “ হৃঠাৎ আচার্ধযদেব জিজ্ঞাসা করিলেন, 'পণ্ডিতেরা কি 
বলেন তা নয়, আপনি কি বলেন? এমন অবস্থায় পড়িলে 

১১ 


(১৬২ ) 


আপনি কি করিতেন? স্বামীজি হাসিয়া! উত্তর করিলেন "আমি 
সন্ন্যাসী ফকির মানুষ, আমার জীবনের মূল্যই বা কতটুকু? আমি 
চোখ বুজিয়া সত্য কথাটাই বলিয়া ফেলিতাম। উত্তর শুনিয়া 
ঈপ্সিত ভ্রব্য প্রাপ্তিতে ক্ষুত্র শিশু যেমন আহ্লাদে নাচিয়। উঠে 
এই “সমুদ্র ইব গম্ভীর: মহাপুরুষের প্রাণও তেমনি নাচিয়া উঠিল। 
তিনি সহজ আনন্দে হাতে তালি দিতে লাগিলেন। বাতাস না৷ 
হইলে কোন জীব বাঁচিতে পারে না, সত্য ছিল আচাধ্যদেবের 
জীবনে বাতাসেরই মত প্রয়োজনীয় । 

একবার ব্রজোমোহন বিষ্ভালয়ে, যতদূর মনে পড়ে জন্মাষ্টমীর 
দিনে, শ্রীকৃষ্ণের জীবন আলোচনার জন্য এক সভা আহৃত হয়। 
সভাপতি মহাশয় বক্তৃতা প্রসঙ্গে জোরের সহিত বলিতে লাগিলেন, 
পরীর কিছুতেই হ্বয়ং ঈশ্বর নহেন, তিনি আদর্শ মন্ুয্যমীত্র--” 
আচাধ্যদেব সে সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি আর স্থির থাকিতে 
পারিলেন না। সহস। বিদ্যুতের মত দ্ীড়াইয়া উঠিয়! গদগদ কে 
অনর্গল একশ্বাসে বলিয়া ফেলিলেন, “নু 0800 ৪০০০0 0115 
18100. 1] 10105 নু) 00706 105 0900, বু 119৮6 1০1 
[লা 10. 00 110, 11026 695690 7170. (আমি একথা 
মানিতে পারি না। আমি জানি শ্রীকুষ্ণ আমার ঠাকুর। আমি 
তাহাকে আমার জীবনে অন্ভব করিয়াছি । আমি তাহাকে 
আশ্বাদ করিয়াছি!) শ্রীরুষ্ণ ছিলেন ভার ঠাকুর, আর তাহারই 
'মুখপন্মাৎ বিনিংস্থত” গীতার ধর্মই ছিল তার ধর্ম । 

আচাধ্য দেবের মুখে গীতার ব্যাখা শুনিতাম। কুরুক্ষেত্র 
শব্টার ব্যাখা করিতে যাইয়া! বলিয়াছিলেন--এই জীবনই “কুরুক্ষেত্র, 
“কুরু; “কুরু” 'কুরু'-বশ্ম *ব, কর্ম কর, কর কর--অবিরাম এই ধ্বনি 


€( ১৬৩ ) 


উঠিতেছে। জীবনের এই কুরুক্ষেত্রে কাহারও কর্ম না করিয়া 
বসিয়া থাকিবার অধিকার নাই। 


কর্শব্রতেই দীক্ষ। লইলাম। আচার্য কালীশচন্্র আদর করিয়া! 
নাম দিলেন 'কশ্মানন্দ ।, 


হে যন্ত্রি,। আমার এই জীবন যন্ত্র দিয়া তুমি তোমার কোন্‌ কাজ 
করাইয়া লইবে ? 

ফাষ্ট আর্টস্‌ পরীক্ষা দিয়! কলিকাতায় চলিলাম। সঙ্গে চলিল 
বারজন “ব্রতী ।, আচার্ধ্যদেব আশীর্বাদ করিলেন। নৃতন সমূদ্ে 
জীবনতরণী ভাসাইলাম। কাণ্ডারী, কূল মিলিবে কি? 

মহত্জীবনের সংস্পর্শে না আপিলে মন্গুষ্য জীবন যে কি অমূল্য 
সম্পদ, তাহা উপলব্ধি করা যায় না। আচাধ্যদেবের চরণতলে বসিয়া 
বুঝিলাম, অথবা বুঝিলাম বলিয়া ভাঁবিলাম, আমার জীবন কি, 
এবং এই জীবনের দায়িত্ব কতখানি । 

নং ০ সং 

প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে নৌক। ছুটিয়া চলিয়াছে। পাহাড়ের সমান 
উচু হইয়! চারিদিক হইতে তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসিতেছে কিন্তু চিত্ত 
নির্ভম়। আচার্যযদেব বলিয়াছিলেন, “জীবনের কুরুক্ষেত্রে 'নারথির' 
ধ্যান করিবে। জীবন রথের রশ্মি ধরিয়া আছেন সেই অচ্যুত 
সারথি ।” ভাবিবার চেষ্টা করি, যতটুকু ভাবিতে পারি, তাহাতেই 
হৃদয় সাহমে,পরিপূর্ণ হইয়া উঠে । 

বিবাহ করিয়াছি, পণগ্রহণ করি নাই। কর্মক্ষেত্র প্রসারিত 
হইতেছে। 'বিবাহ করিয়া মনে হয় নাই বন্ধনে জড়াইয়া পড়িয়াছি। 
সী গ্ররুত সহধর্শিণীর মত সর্ব কর্শে আশ! ও উৎসাহ দিতেছেন, 
ক্লান্ত বাহুতে শক্তি সঞ্চার করিতেছেন 


(১৬৪ ) 


১৯২৬ সালে আচাধ্যদেব কলিকাতা মহানগরীতে 'পান্নালাল শীল 
বিদ্যা মন্দিরের” ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করিলেন। যৌবনের সাথী 
'ব্রতীরা, আসিয়া জুটিলেন। কলিকাতার স্থবিখ্যাত দানশীল জমীদার 
৬মতিলাল শীল মহাশয়ের স্থযোগ্য বংশধর ৬মাঁণিকলাল শীল মহোদয় 
তদীয় পিতৃদেবের পুথ্যস্থৃতিরক্ষাকল্পে এই বিদ্যালয় স্থাপন ও 
পরিচালনের জন্য পাঁচ লক্ষ টীকা দান করিয়া গিয়াছেন । বরিশালের 
ব্রজমোহন বিদ্যালায়ের আদর্শে এই বিদ্যামন্দির পরিচালিত করিবার 
চেষ্টা করিতেছি । আচার্ধযদেবের যে শ্েহদৃষ্টি এই মন্দিরের উপর 
ছিল তাহাতে মনে হয় তাহার স্বহস্তরোপিত এই ক্ষুদ্র বৃক্ষ একদিন 
মহা মহীরুহে পরিণত হইয়া! শত শত শ্রান্ত পথিককে ফল ও ছায় 
দানে শীতল করিবে । 

বাস করিবার জন্ত মাণিকতলায় জায়গা খরিদ করিয়াছি । আচার্ধ্য- 
দেব বলিলেন, “এখানে তোমার বান কর! হইবে না। তুমি তোমার 
দ্রমদম-নারায়াণপুর বাগানে গিয়া বাস কর। নারায়ণপুর তখনও 
বাসের যোগ্য হয় নাই, ম্যালেরিয়ার ভয় আছে। সেইখানে বাদ 
করিতে হইবে! কিন্তু আচাধ্যর্দেবের সেই ধারে উচ্চারিত বাক্য 
কয়টি আজ দুলক্ব্য আদেশের মতই মনে হইতেছে । ধীরে ধীরে 
সেই পল্লী আজ “নারায়ণপুর কলোনীতে” পরিণত হইয়াছে । 
বন্ধু বান্ধবগণ আসিয়! ধীরে ধারে জুটিতেছেন। আচার্ধ্যদেব স্বয়ং 
এখানে কিছুদিন বাস করিয়া বলিগ়াছিলেন, “এই স্থানটা আমার বড় 
ভাল লাগে, ভারী জুন্দর ! 

কেন যে তিনি আমাকে এই শ্যামল পল্লীকুঞ্জে টানিয়া আনিলেন, 
এখনও তাহা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করিতে পারিতেছিনা কিন্তু একটু 
একটু আভাস পাইতেছি। নারায়ণপুরকলোনীতে “কালীশচন্দ্র স্থতি- 





( ১৬৫ ) 


মন্দিরে বসিয়া আচাধ্যদেব “অম্বৃতি সমাজের” অভিষেক করিয়া- 
ছিলেন। 'অস্বত সমাজে সকল হিন্দুর সমান অধিকার । ব্রাহ্মণ নয়, 
কায়স্থ নয়, ক্ষত্রিয় নয়, চগণ্ডাল নয়--সকলেই হিন্দুঃ ভাই ভাই। 
সকলেই দেবমন্দিরে প্রবেশ করিতে পারে । জন্মগত বৈষম্য এই সমাজ 
স্বীকার করে নাঁ। গীতার ধশ্মই ইহার ধর্ম, “যে যথা মাং গ্রপদ্যন্তে 
তাংস্তথৈব ভঙজাম্যহম” এই বাক্যই ইহার মন্ত্র। সমাজের অনুষ্ঠান- 
পত্র যখন রচিত হয়, তখন আচাধ্যদেব নিজ মুখে বলিয়াছিলেন, 
“লেখ, এই সমাজে কুলকৌলীন্যের কোনও স্থান নাই ।, 

এক অখও হিন্দু সমাজের তিনি স্বপ্র দেখিতেন। অয্ত সমাজ 
সেই স্বপ্রকে মৃত্তি দিবার প্রয়ান মাত্র। সমাজ তাহার আশীর্বাদ 
পাইয়াছে, যুগযুগান্তর এই গঠন কার্যে লাগিবে, কিন্তু আমাদের 
কাজ-__কম্ু করিয়া যাওয়া, ফলাফল তাহারই হাতে। 

জীবনে কোন দিন সাধন ভজন করিনাই। আচার্ধযদেবের 
ক্পালাভ করিবার মৃত কিছুই সম্বল আমার ছিলনা । তাহাকে ত 
ভূলিয়াই ছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে তুলেন নাই। শেষ বারে বখন 
কলিকাতা আসিলেন তখন, জন্মজন্মান্তরের সঞ্চিত পুণ্যফল, না 
তাহার অহেতুক কৃপা জানিনা, আমার গৃহেই উঠিলেন। সেব! 
করিতে কোনও দিন শিখিনাই, তাই রোগ লইয়া আসিলেন 
আমাকে স্রেবা শিখাইতে । আমার ঘরে আনন্দের মেলা বসিয়া 
গেল। দিন রাত ভক্তম্গুলীর আসা যাওয়া । কি ন্বর্গই আমার 
গৃহে নামিয়ী আমিল! রোগ শধ্যায় থাকিয়াই একদিন শোভাকে ও 
আমাত্ক রুদ্ধদ্বারগৃহমধ্যে দীক্ষা প্রদান করিলেন। পুরীধামের সাধু 
বাবার বাক্য আজ সফল হইল-_“বাবা, তোমার ধিনি গুরু, তিনি 
নিজে যাচিয়া তোমার ঘরে গিয়া তোমাকে দীক্ষা দিবেন ।, 


(॥ ১৬৬ ) 


দীক্ষা শেষ হইলে বলিলেন, "আজ হইতে তোমরা আমার পুত্র 
কন্তা হইলে। পিতার ম্বতযুর পরে সম্ভানের যে কর্তব্য, তাহ। 
তোমারা করিবে ।, 

হায়! তখন কি জানিতাম বিদায়ের দিন এত সন্পিকট হইয়া! 
আসিয়াছে? 

একদিন বেড়াইতে বাহির হইয়াছেন, সঙ্গে শোভ! ও আমি। 
তাহাকে মধ্যে রাখিয়া আমরা পাশে পাশে যাইতেছি। শোভা 
মাঝে মাঝে সরিয়া দুরে যাইতেছে । তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 
"ও কি? দূরে সরিতেছ কেন? শোভা বলিল “আপনার ছায়ায় 
পা পড়িবে যে!» ধীরে ধীরে হাসিয়া বলিলেন, “গুরুর ছায়ায়ই ত 
চলিতে হয়), 

একদিন বলিলেন, “এই পাকটা ঘুরিতে ১৮০০ 5০ লাগে, 18৩ 
এ যেতে ২৩০০ 5০1) লাগে । শশী বাবু সঙ্গে ছিলেন, বলিলেন, 
“আরত বসিয়৷ বসিয়া কাজ নাই। ততক্ষণ জপ করিলেও কাজ 
হর। তিনি ঈষৎ হাসিয়াছিলেন, আমার তখন রামপ্রসাদের 
গানের একটি চরণ মনে হইয়াছিল “নগর ফির মনে কর প্রদক্ষিণ 
হ্যামা মারে।, 

ডাক্তারদের বলিয়া দিয়াছিলাম, “দেখুন, ইহার চক্ষু, হৃৎপিণ্ড 
বা স্বাস্থ্যের কোনও খারাপ খবর ইহাকে জানাইবেন না । তাহারা 
বলিয়াছিলেন, “চিকিৎসা শাস্ত্রে -ব। দেহবিজ্ঞানে আমাদের যতটা 
অধিকার, ইহার তাহ। অপেক্ষা বেশী ছাড়া কম নয়, ইহার নিকট 
কিছু লুকাইবার চেষ্টা! বৃথা । 

আমি তখন পঞ্জিকা সংস্কারের প্রয়োজন সম্বন্ধে আলোচনা 
করিতেছিলাম। নূতন পঞ্জিকার ভূমিকায় তাহার নিজের হাতের 


( ১৬৭ ) 


স্বাক্ষর দিয়াছিলেন--তাহাতে লেখা ছিল, “ম্ঘা অঙ্কেষ। অশুভ নয়, 
ভগবানের নাম লইয়া ষে দিন আরম্ভ হয় সেই দিনই শুভ, আর 
ভগবানের নাম বিরহিত যে দিন সেই দিনই ছুদ্দিন, সেই দ্রিনই 
অস্তুভ! ফলিত জ্যোতিষের উপর অতি নির্ভর করিয়! হিন্দু জাতি 
মরণের পথে ছুটিয়! চলিয়াছে, অম্বত সমাজ হিন্দুকে মরিতে দিবেনা ।, 

তারপর একদিন আচার্ধ্যদেব বলিলেন, "একবার বরিশালে যাইব ।» 
তখনও অন্থখ সারেনাই। প্রাণ তাহাকে ছাড়িয়া দিতে চায়ন] । 
কিন্তু মনকে প্রবোধ দিলাম, এ ত আমার একার জিনিষ নয়, 
এখানে আটকাইয়। রাখিবার আমার কি অধিকার আছে? 

যাইবার দ্বিন স্থির হইল। প্রাতে গাড়ীতে বেড়াইতে বেড়াইতে 
বলিলেন, “আজকার দিনে যাত্রাকরিলে পঞ্জিকার মতে কি ফল 
হয় জান? আর ফিরিয়া আস! যায় না ।” 

আমার বুকের মধ্যে ছাৎ করিয়া উঠিল, বলিলাম, “ওরূপ কথা 
বলিলে আপনাকে কিছুতেই যাইতে দ্িবনা।' বলিলেন, “তবে ন! 
কি তুমি পঞ্জিকা মাননা? ছি: মন খারাপ করিতে নাই। 
ভগবানের নাম লইয়া যাত্র। করিলে সব অশুভ শুভ হইয়৷ যায় । 

তারপর একদিন মধ্যাহ্নে, খন মাথার উপর স্য্য জলিতেছিল, 
আমার ঘর অন্ধকার হইয়া গেল। দীনের কুটারে যে আনন্দের 
মেলা বসিয়! ছিল, তাহা ভাঙ্গিয়া গেল। আচার্যদেব বরিশালে 
চলিয়া গেলৈন। 

পূজার" ছুটিতে হঠাৎ বরিশাল হইতে তার পাইলাম, “অবস্থা 
ভালু, নয়, শীত্র এস। বিঠু আর শোভাকে সঙ্গে লইয়া যা 
করিলাম। আমাকে ও শোভাকে দেখিয়া খুসী হইলেন। দেহের 
উর্ধে অবস্থিত এই পুরুষ কোনও দিন দেহকে তুচ্ছ বা অযত্ব 


(১৬৮ ) 


করেন নাই। দেহ ছিল তাহার কাছে আরাধ্য দেবতার 
মন্দির । তাই শেষ মৃহূর্তেও যখন বুবিয়াছেন, উধধের প্রয়োগে 
কোনও ফল হইবেনা, তখনও শীস্তভাবে ওঁষধ সেবন করিম্াছেন, 
ইন্জেকসন নিবার জন্য হস্ত প্রসারিত করিয়া দিয়াছেন । 

ভীষণ রোগ যন্ত্রণার মধ্যেও তাহার ধৈর্য্য চিকিৎসক মণ্ডলীর 
বিস্ময় উত্পাদন করিয়াছে। আত্মারাম এই পুরুষ নিজের ভিতরে 
নিজেকে ডুবাইয়া। রাখিলেন। দেহ দেহের ধশ্ম পালন করিতে 
লাগিল, আত্ম৷ সাক্ষী হইয়। দেখিতে লাগিলেন । 

সেবা, ওঁষধ, পথ্য, সমস্ত ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন উঠিলেই বলিতেন, 
*ও হরিদাস জানে । এতবড় গৌরবের অধিকার আমায় দিলে, পিতা ! 

দেহের চিকিৎসা চলিতে লাগিল। কিন্তু যাহাকে দেহের 
মধ্যে ধরিয়া রাখিবার জন্য এই বিপুল প্রয়াস, তিনি কোথায়? 
দেহধন্্ী আমরা কেমন করিয়া বুঝিব? 

১৯৩২ সনের ১০ই নভেম্বরের প্রভাত আসিল। অসহ্হ রোগ 
যন্ত্রণার মধ্যেও শান্ত প্রসন্ন নেই মুত্তি। ন্েহময়ী জননীর নিরাপদ 
ক্রোড়ে নিদ্রিত শিশুর মত ই মুখ মণ্ডল নিরুদ্বেগ, নিশ্চিন্ত । 
মহা প্রস্থানের আয়োজনের ব্যস্ততার কোনও চিহ্ু সে মুখে নাই। 
সর্বদাই প্রস্তৃত রহিয়াছেন, ডাক আসিলেই হইল। অপরাহ্ন বেল৷ 
তিন ঘটিকার সময় সেই ডাক আসিল। ডাক যখন আসিল, 
যাত্রা করিতে তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব হইলনা । 

সব শেষ হইয়। গেল! যে মহা রহস্যের মাঝে, ডুব দিলে 
মানুষকে আর খুঁক্জিয়৷ পাওয়া! যায় না, আচার্যদেব সেই চিরন্তন অনাদি 
রহস্যের মাঝে লুকাইলেন। পশ্চাতে পড়িয়! রহিল ্বৃত্যু ও ধারের 
দেশ, আচাধ্যদেবের শুভ্র অমল আত্মা আজ দিব্য আলোকের দেশে 


৬৬ 


অনার 


৯ মী এ 
টু 


্ 
খা 


উঃ 
3 
টং 


৯ টং ১ টি ৬ মি 
3৬ ॥ ৬২ ৬ 


1১0 
২১) 
ট 


১১ 
) 


৬১১১১ 


২ এ 
| 8 এ 








(১৬৯ ) 


'অম্বৃতধামে যাত্রা করিল। আমাদের ক্রন্দন অশ্রজল আর তাহাকে 
স্পর্শ করিবেন]! করিবে নাকি? তাহা হইলে কি লইয়া থাকিব? 

'পাবনাৎ পূরণাচ্চ পুত্রঃ।' একদিন অহেতুক করুণায় পুত্র বলিয়। 
অঙ্গীকার করিয়াছিলে। হে পিতা, উদ্ধলোক হইতে আশীর্বাদ 
কর, আজ হউক, কাঁল হউক, লক্ষ জন্ম পরে হউক, একদিন যেন 
সত্য সত্যই বলিতে পারি-পিতা নোহপি, পিতা নোহসি )” 


আচাধ্য বাণী 


১। কোনও ধর্মাহুষ্ঠান আরম্ভ করিবার পূর্বে যে জীবন ছিল, 
তারপরেও যদি জীবনে একটু পরিবর্তন না আসে, জীবন যেখানে 
ছিল সেখান থেকে যদ্দি একটু এগিয়ে না যায়, তাহা হইলে সে 
অনুষ্ঠানের মূল্য কিছু নাই । 

২1 তাকে ভালবাসাই চরম কথ।। এই ভালবাসা হইলে সাধন! 
নিজে নিজে হইতে থাকে । শ্রবণ, কীর্তন, ধ্যান, জপ, এই সাধনারই 
অঙ্গ । যাঁকে ভালবাসি তার কথা শুনিতে ভাল লাগে, বলিতে ভাল 
লাগে, কেবল ইচ্ছা করে তার নাম ধরিয়া ডাকি, তাকে ভাবি । 

৩। আমি তাহার দিকে চলিতেছি, এই কথা ভাবিতে ভাবিতে 
চিত্ত শাস্ত হয়, শান্ত হইলে তবে উপাসনা হয় । 

৪। সংসারে দুঃখ আছেই । মানুষের কাছে ছুঃখ জানাইয়া ফল 
কি? তীাহার কাছে দুঃখ জানাও, তিনি সকল দুঃখ মুছিয়া দিবেন । 

৫। আনন্দ হইলেই ক্ষরণ-_-5০০:০0০. হয়--উহা৷ ছুর্ববলতা! 
চোখের জল এক প্রকার 10010115 ৮5021010055 1+9911118 5001)1055 
করিতে না পারিলে কন্ম কর! যায় না। এখন কন্মের যু্গ। ৮11 
০0105 করিতে হইলে £001175 591)107055 কর। 

৬। সংসার তার, সমাজ তার, কর্তা তিনি, সবই করাইয়। 
লইবেন। তুল করা মানুষের স্বভাব, ভূল সংশোধন তিনিই করিবেন | 
আমর] শুধু বলি 'ধিয়ে! যো নঃ প্রচোদয়াৎ্।, 

৭। গ্রামের সখের থিয়েটারে কেউ রাম, কেউ রাবণ নাজিবে। 
আমাকে জিজ্ঞাসা করা হইল তুমি কি সাজিবে? আমি বলিলাম, 





শবরী বনাশ্রম' 
নারায়ণপুর-কলোনী, দমদম 





( ১৭১ ) 


আমি তামাক লাজ্বো। তাহাতেই দলের হেড. হইয়া! গেলাম। বড় 
হইতে হইলে ছোট হও, পায়ের তলায় মাথা রাখ । 

৮। আমি কে একবার বুঝিতে পারিলে আর নৈরাশ্ত আসিবে 
না। 

৯। পূর্ববরূত কম্ম এখন দৈব । ইন্দ্রিয়ের সমস্ত কর্ম, অতীতের 
সমন্ত ক্রিয়৷ পুঞীভূত পিণীকৃত হইয়া এখন দৈব । দেখিনা, তাই 
দৈব। প্রবল পুরুষকার প্রতিকূল দৈবকে প্রতিহত করিতে পারে। 
স্রোতে ভেসে চলেছ-_টদব, উজানে ফিরিতেছ-_-পুরুষকার । 

১০। অহ্ল্য! পাঁষাণী মানুষ হইতে পারে। নিজে না পারি, 
রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে হইতে পারে । জগাই মাধাই চিরদিন থাকিব 
না। কিন্ত ভগবানকে ডাকিতে হইবে, ভগবানকে ডাকাই সব চেয়ে 
বড় পুরুষকার। 

১১। ভগবানের স্থান কোথায়, যদ্দি সবই কম্মফল হয়? কম্ম 
[১155 স্বাধীন ইচ্ছা--ন]1 হ'লে 0০৭15 0০2৫. 0০ 100, 

১২1 569912101) 091 /০010০0 হয় | 11001 কি সকলের 
অদৃষ্ট এক ন্যত্রে গাঁথা ছিল? ঈশ্বরের ইচ্ছা সকলের উপরে । কর্ণ 
ও তার ফল-_-কি কর্মে এই ছুর্গতি, এত খতাইয়া আমার কি লাভ? 
ঈশ্বরেচ্ছায় সব হয়, এতে আশ্বস্ত থাকা যায়। 

১৩। একটু্্রীণ সমগ্র বিশ্ব ব্যেপে রয়েছে । আমার এই ক্ষুত্র 
প্রাণ সেই মহাপ্রাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা করতে হবে। এই 
প্রাণকে যে দেখেছে তার আর বন্ধন নেই, সে মুক্ত। 

এত যে গ্রহ নক্ষত্র সর্বদা ঘুরিতেছে ফিরিতেছে তাহাতে 
পরস্প্রঝ সংঘর্ষ হয় না কেন ?_-ভগবানকে কেন্দ্র করিয়া চলে বলিয়া । 
কেহ ছুই হাত, কেহ তিন হাত ব্যাসার্ধ লইয়। বৃত্ত অঙ্কিত করিয়৷ আছি 


( ১৭২ ) 


বলিয়। পরস্পরের সংঘর্ষ হয় কিন্তু ভগবানকে কেন্দ্র করিয়া থাকিলে 
আর কাহারও সঙ্গে কাহারও সংঘর্ষ হয় না। তাহাকে কেন্দ্র করিলে 
আর বৃত্ত অঙ্কিত হয় না, সব 50818176170 হইয়া যায় । 

১৫। কাহারও ভাব নষ্ট করিতে নাই। ভাল হউক মন্দ 
হউক, যে যেভাবে আছে তাহ! নষ্ট হইলে তার প্রাণ শন্ত হইয় যায়। 

১৬। ভগবান কেবল (10 নন। তিনি 1056 2170 ৮1170 
যে যতটুকু পাপ করিয়া আসিয়াছে তাহার ফল ভোগ করিতে হইবেই। 

১৭। কাচ! পাতা গাছ হইতে ছিড়িতে গেলে ভয় হয় হাড় 
মাংসে টান লাগিবে কিন্তু পাক! পাতাট1 নিজে নিজেই পড়িয়া যায়। 
বাসনা কামন|! কেবল মনের উপর কাজ করে এমন নয়ু, হাড় মাংস 
গুলিকেও যেন পরম্পরের সঙ্গে আটুকাইয়া ফেলে । যৌবনে বৈরাগ্য 
দ্বারা এ সব শিথিল হইয়া পড়ে । তখন আর এখান হইতে যাইতে 
কষ্ট হয় না, পাকা পাতাটির মত টপ করিয়া ঝরিয়া পড়িয়া যায়! 

১৮। সহিষ্ণুতা সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ। সংদারে বল, আর ধর্মজগতে 
বল, সব জায়গায়ই সহিষ্ণুতা একান্ত আবশ্তক। 

১৯। আমরা সব বিষয় বুঝিতে পারিনা কিন্তু সর্বত্রই 
ভগবানের মঙ্গল ইচ্ছ!। 

২০। যে সহিষ্ু, নিরভিমান ও সর্বদা পরের মঙ্গল করে সেই 
যথার্থ স্ন্দর । ্‌ 

২১। প্রার্থনায় কিছু ফল হয় কিনা! তা দিয়ে কাজ কি? 
কেবল দেখবে এতে তোমার প্রাণ উন্নত হয়। তর ঠাকুর য। 
করবার তা করবেনই কিন্তু “পরের মঙ্গল চাই? এই প্রাথপ 'শ 'শাকবও 
খুব সন্তষ্ট হন। এই যে ঠাকুর সন্তষ্ট হন, এর চেয়ে আর' অধিক 
কল কিচাও? 


( ১৭৩ ) 


২২। সংঘম ও বৈবাগ্যপ্রধানদের জন্য যোগ এবং জ্ঞানপথ, 
আর চিত্ত মলিন, সংযম ও বৈরাগ্ায লাভের ইচ্ছা আছে এমন 
যারা, ভাদের জন্য ভক্তিপথ | ভক্তিপথ কলিতে সহজ | ভক্তিহীন 
নাম করায় পাপক্ষয় হয় কিন্তু পুনঃ পাপের সম্ভাবনা থাকে, 
আর ভক্তিসহ নামে পুনঃ পাপের নস্তাবনা থাকে না। ভক্তি 
ব্যতীত সংযম বৈরাগ্যও দ্রাড়ায় না । 

২৩। আমার খুব পিপাস হইয়াছে, তুমি এক গ্লাস জল 
দিলে, এখন এস্থলে যদি তোমার কৃপা মনে করি তবে প্রাণ 
শীতল হ্য, সরস হয় । কম্মফল মনে করিলে প্রাণ শুফ হইয়া! যাঁয়। 
সর্ব করপা দর্শন করিতে হয়। 

২৪1 কর্ম এবং উপাসনা ছুইই রাখিতে হইবে। শুধু কম্ম 
লইয়া থাকিলে অন্ধকার, শুধু উপাসনায় আরও অন্ধকার। চিত্তে 
অনেক কম্মের বীজ আছে অথচ কন্শ ত্যাগ করিয়া কোন 
উপাসনায় প্রবৃত্ত হইলে চিত্তের সে ম্য়ল কাটিবে কেমন করিয়া ? 
তাই কম্ম ও উপাসন। উভয়েরই দরকার । 

২৫। যাবতীয় বস্তর বুক চিরে তাকে বাহির কর। সব 
জিনিষের ভিতরে তীকে খুঁজিয়া বাহির কর। মধ্য, তোমার কিরএ 
সরাও, তাকে দেখতে দাও । আমার দেবতাকে কেন তুমি লুকিয়ে 
রেখেছ? আমার জিনিষ কেন আমাকে তুমি দ্রেখতে দিবে না ?? 
এইরূপ সব শর্জনিষের মধ্য হইতে তাকে নিঙড়িয়ে বাহির 
কর। 


২শ তালিকা! 


 ঈিিউজকড 


পিতৃবংশ 
নানিত 
টা দেবী 


লা লা 
কালীকুমার দেবহুমার ত্রজকুমার বাণীসমার 
স্শ 
প্যারী দেবী 
সৌদামিনী জগদীশ রী ক্ষীরোদবাসিনী ন্ু্ণ 


মাতামহ বংশ 


মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
এ 
রা দেবী 


রা রা দা, 
প্রস্নকুমার প্যারী দেবী কতার্থময়ী শীতমনন্দর 


আগা” 





'অমৃতের' শ্রদ্ধাঞ্জলি 


ব্রক্মষি জগদীশ 


্রন্ষষি জগদীশ আজ মরজগতে নাই। আদর্শ পণ্ডিত, আদর্শ 

শিক্ষক, আদর্শ মানব, আদর্শ ততক্ত ও খধি আজ লোক-চক্ষুর 
অন্তরালে চিরকালের জন্ত লুকাইয়াছেন। পরমহংসদেব হাহীকে 
কাচাসোণা বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন, সিদ্ধ মহাপুরুষ সোণা- 
ঠাকুর ধাহাকে একদিন না দেখিলে অস্থির হইতেন, মহাত্মা 
অশ্বিনীকুমার যাহাকে ন্সেহরসে অভিষিক্ত করিয়া চিরজীবন শক্তির 
সাধনা করিয়া গিয়াছেন, তিনি আজ অমৃতলোকের অধিবাসী । 
তাহার কথা শুধু মনে পড়ে, মনে পড়ে তাহার অফুরস্ত করুণার 
কথা, অহেতুকী ভালবাসার কাহিনী । মনে হয় যেন সেই অপার 
করুখাময় বুদ্ধ আবার জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। বিষ্যাসাগর 
মহাশয়ের উপযুক্ত ছাত্র জগদীশ বাল-বিধবার ছুঃখে চির-ত্রিয়মান 
ছিলেন, অনুন্নত জাতির ছুরবস্থার কথ! স্মরণ করিয়া সর্বদা কাতর 
হইতেন। তাহার জীবন “একং সৎ বিগ্রা বহুধা বস্তি এই 
বেদবাক্যের সম্যক ক্ষুরণস্থল ছিল। বৈরাগ্যের দিব্যজ্যোতিতে 
চির-ভাম্বর আদর্শ গুরুকে আজ আমর! আমাদের প্রাণের গভীর 
শ্রদ্ধা অর্পণ কক্তিঞ্ুছি। দক্ষিণামৃণ্তি স্তোত্রের ভাষায় বলি-_ 

মৌনব্যাখ্যা-প্রকটিত-পরব্রদ্ষতত্বং যুবানং 

বষিষ্ঠান্তেবসদূষিগণৈরাবৃতং ব্রন্মনিষ্টেঃ | 

আচাধ্যেন্্রং করকলিত চিন্মুদ্রমানন্দরূগং 

্বাত্ারামং মুদিতবদনং দক্ষিণা মৃদ্তিমীড়ে ॥ 


(১৭৬ ) 


--যিনি মৌন ব্যাখ্যা দ্বারাই ত্রহ্মতত্ব প্রব্টটত করিতে তৎপর, 
যিনি চিরযুবা, যিনি ব্রন্মনিষ্ঠ, বয়োবৃদ্ধ শিত্ত খধিগণ করুক পরিবেষ্টিত, 
যিনি আচার্য্য-শ্রেষ্ঠ, ধাহার জ্ঞান করতলগত, যিনি আনন্দন্বরূপ, 
আত্মাতেই ষিনি রমণ করেন, ধাহার মুখ সতত হ্রান্বিত এইক্প 
কূপাময় গুরুমৃত্তিকে স্তব করি । 

যিনি জীবনে অমানীকে মান দান করিয়। সর্বদা সখী হইতেন, 
ধৈর্ধ্যসম্পদদে ধরিত্রীকেও হার মানাইয়াছিলেন, ভীষণ রোগযন্ত্রণার 
ভিতরেও ধাহার সহিষ্ণুতা চিকিৎসকগণের বিস্ময় উৎপাদন করিত, 
সেই সর্বদা হরিনামকীর্তনপরায়ণ, প্রকৃত ব্রহ্মনিষ্ঠ বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠকে আজ 
অমতলোক হইতে আমাদের শ্রদ্ধা গ্রহণের জন্য আহ্বান করিতেছি । 
তিনি শান্তিধামের অধিবাসী হইয়া আমাদের শিরে মেহাশীষ বর্ষণ 
করিতে থাকুন --এই আমাদের গভীর প্রার্থনা । ও শাস্তি গু! 

--অঅহ্মতি5 অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯। 


৪